যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন বিদেশি গর্ভবতী নারীরা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গর্ভবতী বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে।
গত সোমবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) বাতিলের ট্রাম্পের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করার পর হোয়াইট হাউস এ পদক্ষেপের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সব শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়।
সম্ভাব্য এ নিষেধাজ্ঞাকে 'বার্থ ট্যুরিজম' বা সন্তান জন্ম দিতে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নতুন করে কড়াকড়ির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, অনেক বিদেশি নারী গর্ভাবস্থার শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে সন্তান জন্ম দেন, যাতে তাদের সন্তান মার্কিন নাগরিকত্ব পায়।
যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা মোট জন্মের তুলনায় খুবই সামান্য।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীদের বিশেষ সুবিধা দেয়, যা নিয়ম মেনে নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের প্রতি অন্যায়।
প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বলেন, গর্ভবতী বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি হোয়াইট হাউস গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
হোয়াইট হাউসের নীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ বলেন, 'বার্থ ট্যুরিজমের সম্ভাবনার কারণে অস্থায়ী ভিত্তিতেও কাকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, তা খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'অনেকেই শুধু মার্কিন ভূখণ্ডে সন্তান জন্ম দিতে এখানে আসেন, আর সেই সন্তান আজীবনের জন্য মার্কিন নাগরিক হয়ে যায়।'
তিনি আরও বলেন, 'এ ধরনের অনেক বিষয় আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।'
নির্বাহী আদেশ প্রত্যাখ্যান সুপ্রিম কোর্টের
ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন জারি করা নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, যেসব শিশুর বাবা-মা অবৈধভাবে বা অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাদের সন্তানরা মার্কিন নাগরিক হবে না।
সুপ্রিম কোর্ট ওই আদেশ বাতিল করার পর স্টিফেন মিলার এসব কথা বলেন।
৬-৩ ভোটের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব অস্বীকার করা অসাংবিধানিক এবং এটি সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর লঙ্ঘন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর ১৪তম সংশোধনী নিয়ে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পরীক্ষা। ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকত্বের ধারণা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন।
মঙ্গলবারের রায়ের পর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, ট্রাম্প 'জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্বের মূল্য রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ'।
তিনি জানান, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসকে 'অবিলম্বে পদক্ষেপ' নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, 'বিচার বিভাগ বার্থ ট্যুরিজম–সংক্রান্ত কার্যক্রমের তদন্তকে অগ্রাধিকার দেবে। মার্কিন নাগরিকত্ব সুরক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে অনেক উপায় রয়েছে।'
বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার
যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিদেশি দর্শনার্থীদের ঘরে কত শিশু জন্মায় তার আনুষ্ঠানিক হিসাব রাখে না। তবে বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, প্রতি বছর এ সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান মার্কওয়েইন মুলিনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, গর্ভবতী বিদেশি দর্শনার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
মার্কওয়েইন মুলিন 'ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস' অনুষ্ঠানে বলেন, 'তারা পর্যটক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা আমাদের কোনো অঞ্চলে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসেন। গর্ভাবস্থার অষ্টম মাসে আসেন, বা হয়তো প্রসবের এক, দুই বা তিন সপ্তাহ বাকি থাকতে আমাদের দেশে আসেন, তারপর এখানে সন্তান জন্ম দেন।'
তিনি বলেন, 'এখানে তাদের একটি সন্তান হয়, যে হয়তো পরে চীনে ফিরে যায় এবং একটি কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় বড় হয়—যদিও সে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পরে তারা আবার এখানে ফিরে আসে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করে। এটি নিঃসন্দেহে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
মুলিন আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসে 'দীর্ঘ আলোচনা' হয়েছে।
বুধবার রাতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে পরে লাল কার্ড পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগুন জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন।
নাইজেরীয় বাবা-মায়ের ঘরে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া এই স্ট্রাইকারের পরিবার লন্ডনে বসবাস করতো। তার মা সাত মাসের গর্ভবতী অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। গর্ভাবস্থার অগ্রসর অবস্থার কারণে বিমানকর্মীরা তাকে যুক্তরাজ্যে ফেরার অনুমতি দেননি।
বালোগুন দুই মাস বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলেও তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছেন, ফলে যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র দলের আরেক খেলোয়াড় ইউনুস মুসাহসহ আরও কয়েকজনও জন্মসূত্রে দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন।
