গ্রিন এনার্জি খাতে বিনিয়োগ পেতে পারে কম সুদে ঋণ, কর ছাড়
পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন এনার্জি খাতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি দূর করতে একটি যুগান্তকারী আর্থিক রূপরেখা তৈরি করছে সরকার। প্রস্তাবিত 'জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল (২০২৬-২০৩০)'-এর আওতায়, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দেশের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরকে বেগবান করতে—রাষ্ট্রীয় পেমেন্ট গ্যারান্টি স্কিম এবং একটি বিশেষায়িত ক্লিন এনার্জি ফান্ড বা তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ গতকাল তাদের ওয়েবসাইটে এই খসড়া কৌশলপত্রটি প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত আহ্বান করেছে। সরকারি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত তাদের মতামত জমা দিতে পারবেন। এরপর আগামী ৭ জুলাই সকাল ১১টায় বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠেয় এক সভায় এই কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত আর্থিক ও নীতিগত পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে অতীতে যেসব অর্থায়নের বাধা ছিল, সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে দূর করা। এই কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে প্যারিস চুক্তি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি-৩)-এর আওতায়—বাংলাদেশের সবুজ জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য ১২,৪৮০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে হবে। বর্তমানে দেশে সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরও ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে হবে।
দেশে বার্ষিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে, যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮,০০০ মেগাওয়াট থেকে লাফিয়ে ২৪,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। ২০ শতাংশ উৎপাদনের মাইলফলক স্পর্শ করতে হলে আনুমানিক ১,৩৬,৬৫৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টা মোট চাহিদার বিপরীতে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ২৭,৩৩১ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
প্রক্ষেপিত উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী—২০২৬ সালে ৪২০ মেগাওয়াট; ২০২৭ সালে ১,৪০০ মেগাওয়াট; ২০২৮ সালে ২,৩৯০ মেওয়াট; ২০২৯ সালে ২,৮৫০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৩,৩৯০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। এর মাধ্যমে পাঁচ বছরের এই মেয়াদে মোট ১০,৪৫০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা তৈরি হবে। এর পাশাপাশি সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াট, বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
আর্থিক বাধা দূরীকরণ
নীতিমালার এই খসড়ায় অতীতের উদ্যোগগুলোর একটি স্পষ্ট ও অকপট মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে স্বীকার করা হয়েছে যে, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেওয়া বিভিন্ন নীতিমালায় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) জন্য প্রচলিত বাস্তবায়ন চুক্তির পরিবর্তে সরকারি পেমেন্ট গ্যারান্টি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা বিনিয়োগকারীদের পরিশোধের ব্যাপারে শক্তিশালী নিরাপত্তা দেবে।
খসড়ায় প্রধান অর্থায়ন ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম হলো– 'রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তত্ত্বাবধানে এই বিশেষায়িত তহবিলটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, জলবায়ু তহবিল এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেবে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব পুনঃঅর্থায়ন (গ্রিন রিফাইন্যান্সিং) কর্মসূচি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকল্পগুলোর জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করবে।
ছাদভিত্তিক এবং বিতরণকৃত সৌর সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক ও কর কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে, যা ওপেক্স ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করবে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে চাঙ্গা করতে স্ট্যান্ডার্ড চুক্তি, সহজ নথিপত্র, দ্রুত অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, ইডকল ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঋণ সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ জোর
এই খসড়া কৌশলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুপটপ সোলারকে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সরকারি ভবনগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যেখানে নেট মিটারিং ব্যবস্থার অধীনে বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের খরচ তুলে নিতে পারবেন।
অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) শিল্পকারখানাগুলোর জন্য নেট মিটারিং বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে এই কৌশলে। নতুন আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনের ছাদের ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ এলাকায় সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) সংশোধনের পক্ষেও মত দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন সহজ করতে একটি 'রুপটপ সোলার ক্যালকুলেটর' চালু করা হবে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগ খরচের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে, এবং প্রতি ছয় মাস পর পর সরঞ্জামের মূল্য হালনাগাদ করার পাশাপাশি—উৎপাদনকারীদের জন্য একটি অভিন্ন ও উৎপাদন-ভিত্তিক প্রণোদনা দেওয়া হবে।
ভূমি-ভিত্তিক সৌর প্রকল্প ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা
বড় আকারের ভূমি–ভিত্তিক বা জমিতে স্থাপিত সৌর প্রকল্পের জন্য সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি (এমপিপি) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল ব্যবহার করতে চায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।
নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সহজ করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে উন্নয়নকারীদের আর ঋণদাতার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির চিঠি (লেটার অব কমিটমেন্ট) জমা দিতে হবে না। এর পরিবর্তে একটি প্রাথমিক 'লেটার অব সাপোর্ট' বা 'কমফোর্ট লেটার' জমা দিলেই চলবে। কারণ শুল্ক বা ট্যারিফ চূড়ান্ত হওয়ার আগে ঋণদাতাদের পক্ষে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, সেটি এই নীতিমালায় স্বীকার করা হয়েছে।
বায়ুবিদ্যুৎ ও সেচ ব্যবস্থার বিকল্প
বায়ুবিদ্যুতের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা এখনো সীমিত বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হলেও বলা হয়েছে যে, মৌসুমি বায়ুর ধরন আশাব্যঞ্জক। তাই ভবিষ্যতের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় কেন্দ্রীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি দেশের ১২ লাখ ডিজেলচালিত এবং ৪ লাখ বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে—সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরিত করা গেলে তা ডিজেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এটি গ্রিডের ওপর চাপ কমাবে ও সরকারি ভর্তুকির পরিমাণও হ্রাস করবে। একই সঙ্গে চাষিরা চাষাবাদের মৌসুমের বাইরে তাদের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করার সুযোগ পাবেন।
এই পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানির আগমনকে নিরাপদে গ্রিডে যুক্ত করতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ফ্রি গভর্নর মোড অব অপারেশন (এফজিএমও) এবং অটোমেটিক জেনারেশন কন্ট্রোল (এজিসি) প্রোটোকল গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক বা ট্রান্সমিশন লাইনের পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে একটি প্রযুক্তিগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
