যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বাদ দিয়ে’ ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার পরিকল্পনা উপসাগরীয় দেশগুলোর!
প্রথম আলোচনা হয়েছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে। তারপর ওমান আর কাতার। এরপর ইরান ও সৌদি আরব, এবং সবশেষে কাতার ও সৌদি আরব। সবগুলো আলোচনার উদ্দেশ্য—যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর আঞ্চলিক সহাবস্থানের চেহারা কেমন হবে, তা চূড়ান্ত করা।
কূটনীতির এমন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া তৎপরতা তো কেবল শুরু। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সাথে এক 'নতুন স্বাভাবিকতা'র সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত থাকায় সামনে এমন আরও বৈঠক ঘটতে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ছাড়ের বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে কী ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে, এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে আলোচনায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আগস্টের ডেডলাইনকে সামনে রেখে যে আলোচনা চলছে, তার সমান্তরালেই—তবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে—চলছে এই আঞ্চলিক তৎপরতা।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমে গেছে। ব্যাপারটা বেশ কয়েক বছর ধরেই ঘটছে।' এখনকার মূল ভাবনা হলো, 'ইরানের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব বোঝাপড়াতেই আসতে হবে—উপসাগরীয় দেশগুলো যদি শেষপর্যন্ত নিজেরাই চুক্তি করে বসে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।'
আপাতত প্রকাশ্য বার্তাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সুরের সঙ্গে মিলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আঞ্চলিক জোটের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে 'মুক্ত, নিঃশর্ত ও অবাধ নৌ-যান চলাচল'-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর 'যেকোনো ধরনের টোল, ফি বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা'কে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাটাম হাউসের আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, 'তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা একটা রেড লাইন হতে যাচ্ছে।'
তবে উপসাগরীয় কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা এ-ও বলছেন যে, ইরান তার সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড এমনি এমনি হাতছাড়া করবে না। তাই সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে দেশগুলোর বাস্তববাদী হওয়া দরকার।
দ্য টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে, 'সার্ভিস ফি' আদায়ের জন্য একটি সম্ভাব্য স্কিম নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকাশ্যে বলা হবে, এই অর্থ হরমুজ থেকে মাইন সরানো, পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস, বন্দর চার্জ কিংবা বিমা-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হবে।
তবে কোন সংস্থার এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে, কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কার হাতে এই অর্থ পৌঁছাবে, তা এখনও অস্পষ্ট।
ইরান ইতিমধ্যেই এই অভিমুখে কাজ শুরু করেছে। তাদের নবগঠিত গালফ স্ট্রেইট অথরিটি নির্দেশনা জারি করেছে—এখন থেকে হরমুজ পাড়ি দেওয়া সব জাহাজের ইরানি বিমা থাকা বাধ্যতামূলক। তেহরান ও ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য যে ৬০ দিনের সময়সীমা ঠিক করেছে, তা শেষ হওয়ার পর থেকেই এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা।
গোনুল তোল বলেন, 'ইরান এখন বুঝতে পেরেছে, পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী এক হাতিয়ার তাদের হাতে আছে—হরমুজ। এ অস্ত্র তারা যখন খুশি ব্যবহার করতে পারে। তাই এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি হতে যাচ্ছে যেখানে ইরানই শেষ কথা বলবে। নিজেদের এই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে তারা সবকিছুই করবে।'
ফি-কে যতই রংচং মাখিয়ে উপস্থাপন করা হোক না কেন, তাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্ত করা যাবে না। তিনি বারবার বলেছেন, কোনো ধরনের চার্জ আদায় করতে নেওয়া হবে না। বিশেষজ্ঞদেরও আশঙ্কা, এর ফলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হতে পারে। যদিও ট্রানজিট ফি নিষিদ্ধ করে, এমন একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চুক্তিতে বলা আছে, 'জাহাজকে নির্দিষ্ট সেবা প্রদানের' জন্য ফি ধার্য করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে সম্ভবত বিকল্প খুব সামান্যই। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ, ইরান ও ওমান আটকে পড়া জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য দুটি রুটের বিষয়ে সম্মত হওয়ার পরই হরমুজে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে হুমকি দেয় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)।
নির্ধারিত এই রুটগুলোর নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দাবি করে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, 'এসব রুটের বাইরে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।'
এর পরদিনই এক তাইওয়ানিজ শিপিং অপারেটর জানায়, প্রণালিতে তাদের একটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, জাহাজটিতে ইরান ড্রোন হামলা করেছিল।
এরপরই ওয়াশিংটন ও তেহরান পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে, যার আঁচ গিয়ে লাগে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। তবে উভয় পক্ষই আপাতত নতুন করে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা সুফান সেন্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই হুমকি ও হামলাগুলো 'সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলোর—বিশেষ করে ওমানের—জন্য প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি...ইরানকে সহযোগিতা না করলে আন্তর্জাতিক নৌ-পথে তারা হামলা চালিয়েই যাবে।'
অলাভজনক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ইয়াসমিন ফারুক বলেন, এসব হামলা না হলেও 'উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যেখানে আগের স্বাভাবিক অবস্থা হয়তো আর ফিরবে না। আঞ্চলিক আলোচনার টেবিলে তারা এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতেই তুলে নিতে যাচ্ছে।'
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায় সৌদি আরব নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি ও এককভাবে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। এর বাইরে ইরাককে নিয়ে আরেকটি জোট তৈরি হতে পারে, যাদের অর্থনীতি অনেকটাই এই প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে থাকা সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো তাদের আর্থিক সক্ষমতা—ইরানে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা। কারণ নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের জোড়া ধাক্কায় ইরানের অর্থনীতির অবসথা এখন খারাপ।
ইয়াসমিন ফারুক বলেন, 'তারা মনে করছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটাই হবে ইরানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।'
তবে প্রণালির ওপার থেকে আসা হুমকি কমাতে তারা ইরানের কাছ থেকে কিছু ছাড় আদায় করতে চাইবে। এর মানে হতে পারে, ইরানের কাছে থাকা মিসাইলের সংখ্যা সীমিত করা, কিংবা তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ কমানো। এ যুদ্ধে ইরানের ওই প্রক্সি বাহিনীগুলোও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।
তেহরান-ওয়াশিংটন বৃহত্তর আলোচনা চলছে। তবে সেইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেও একের পর এক পৃথক বৈঠক চলছে। এসব বৈঠক একটা সম্ভাবনা সামনে নিয়ে আসছে—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে এই অঞ্চল।
ইয়াসমিন ফারুক বলেন, 'আমেরিকা তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল মেরুদণ্ড হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ও অস্ত্র কেনাকাটায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু আমেরিকার ঝুলিতে যা নেই, কিংবা যা দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব নয়—অথবা ইরানি হুমকি মোকাবিলার মতো কার্যকর কোনো অস্ত্র যদি মার্কিনীদের কাছে না থাকে—তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্পের সন্ধানে অন্য কোথাও হাত বাড়াবে।'
আর সেই বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়া বা বহুমুখীকরণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। মে মাসে ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে কুয়েত। সম্প্রতি সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ড্রোন রপ্তানির জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইউক্রেনও।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আরও সুদূরপ্রসারি চিন্তা করছে। মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত নতুন এক 'কোয়াড' জোটে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিয়েছে সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমতে শুরু করেছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় থেকেই। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান, তখন থেকেই বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরে। এর ফলে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর থাকা বিধিনিষেধ মানা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয়।
এরপর ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে দুই-দুইবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর এবং ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকির পর অনেক দেশ এখন মনে করছে, ওয়াশিংটনের দেওয়া কাগুজে প্রতিশ্রুতির আসলে খুব বেশি গ্যারান্টি নেই।
তবু আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা তারা হয়তো চালাবে। হয়তো ২০২৫ সালে 'কাতারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে' ট্রাম্প যে নির্বাহী আদেশ সই করেছিলেন, সেই ধাঁচেই কোনো নতুন ব্যবস্থার জন্য চাপ দেবে তারা।
গোনুল তোল বলেন, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে, তাদের এখন এমন এক মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে থাকবে না। আর যদি থাকেও, ওয়াশিংটন বরং এমন কিছু করতে পারে যা উল্টো তাদের স্বার্থেরই পরিপন্থি হবে।
আর কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্পর্ক অব্যাহত রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত বাধলে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হবেই।
এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের হতাশা থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এখনই এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বলবে না।
তবে 'যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে সেই ধাক্কা সামলাতে তারা নিজেদের রণকৌশলে "প্ল্যান বি" ও "প্ল্যান সি" যুক্ত করে ব্যাক-আপ তৈরি রাখছে' বলে মন্তব্য করেন ইয়াসমিন ফারুক।
