‘কার্যকারিতা ফুরিয়েছে’, তাই হরমুজে হামলা বন্ধ করার পরামর্শ মধ্যপ্রাচ্যে শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডারের
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বোমা হামলা বন্ধ করার সুপারিশ করেছেন। তার অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল দুটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছে, এই সামরিক অভিযান তার কার্যকারিতার একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে বলেই কুপারের এই পরামর্শ।
অ্যাডমিরাল কুপার মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান। সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্যান্য উপদেষ্টাদের পাশাপাশি কুপারের এই জোরালো সুপারিশ শুক্রবার ইরানে মার্কিন হামলা স্থগিত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক-বেসামরিক উভয় উপদেষ্টারাই মেনে নিয়েছেন, কেবল সামরিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে আকাশপথে হামলা চালিয়ে সব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বিমান হামলার একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা প্রবল উত্তেজনার পর এই প্রথম মার্কিন বাহিনীকে হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আপাতত কোনো হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শীর্ষ উপদেষ্টা ও সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে এক বৈঠকের পরই এ সিদ্ধান্ত আসে। ওই বৈঠকে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সেদিনের জন্য নতুন হামলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন।
ওই বৈঠকের আগের কয়েক দিন ধরে ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযানে ফিরে যাওয়ার পক্ষেই ঝুঁকছিলেন। তবে সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তার মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
শেষপর্যন্ত শুক্রবার হরমুজে বোমা হামলায় লাগাম টানার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরুতেই পেন্টাগন, জয়েন্ট চিফস ও হোয়াইট হাউসের কাছে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সুপারিশ পেশ করেছিলেন অ্যাডমিরাল কুপার।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে দুই সপ্তাহের হামলা জাহাজে আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
কুপার আরও উল্লেখ করেন, হামলার জন্য আগে থেকে নির্দিষ্ট করা লক্ষ্যবস্তুগুলোর প্রায় সবই ইতিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে।
সেন্টকম কমান্ডার বলেন, সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারত নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা। এর উদ্দেশ্য হতো অপারেশন এপিক ফিউরির সময় নির্ধারিত কিন্তু অক্ষত থাকা বাকি ২০ শতাংশ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা।
তবে তিনি সতর্ক করে দেন, যদি বড় ধরনের কোনো অভিযানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে গত দুই সপ্তাহের মতো কেবল বোমা হামলা চালিয়ে যাওয়ার অর্থ হয় না।
এ বিষয়ে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও ব্যক্তিগতভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিলে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের সুরক্ষা প্রদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস জেনারেল কেইনের এই সতর্কবার্তার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে। তবে জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফের চেয়ারম্যানের একজন মুখপাত্র এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ' প্রেসিডেন্টকে দেওয়া চেয়ারম্যানের গোপন সামরিক পরামর্শের ব্যাপারে' মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালি আবার পুরোদমে চালু করা এবং জাহাজ চলাচলে যেন কোনো হামলা না হয়, তা নিশ্চিত করতে ইরান ও ওমান এখনো নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে দেশ দুটির এই চুক্তি ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত মেনে নেবেন কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। তিনি সায় না দিলে যুদ্ধের তীব্রতা আবার বাড়তে পারে।
আপাতত অবশ্য রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি 'শান্ত থাকার বদলে শান্ত থাকা'র নীতিতেই চলছে। দুই পক্ষই সাময়িকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ রেখেছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ রোববার এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বলেন, ট্রাম্প একদিকে যেমন 'সব পথ খোলা রাখছেন', অন্যদিকে তেমনি '[ইরানের সঙ্গে] আলোচনার জন্যও কিছুটা সুযোগ দিচ্ছেন'।
ওয়াল্টজ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক 'সব পর্যায়েই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে'।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা দেওয়া ও নৌপথ থেকে মাইন সরানোর উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে এই বৈঠকের চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
