ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে প্রায় ২ হাজার, উদ্ধার অভিযানে ৯০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন
ভেনেজুয়েলার জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ। এদিকে দেশটিতে উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযানে সহায়তা করতে ৯০০ জনের বেশি সামরিক সদস্য পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলের শীর্ষ মার্কিন জেনারেল রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভেতরে ৯০০ এবং পুয়ের্তো রিকো ও কিউরাসাও-এর মতো ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোতে আরও প্রায় ৮০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ইউএস সাউদার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ফ্রান্সিস ডনোভান জানান, মার্কিন বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর সচল করতে কাজ করছে। এছাড়া মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র
ভেনেজুয়েলা সরকার, বিরোধী দল, ইউনিসেফ এবং নাসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে অন্তত ১০ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন এবং ১৬ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫৯ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
আশার আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে
ভূমিকম্পের পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযানের গতি কমেছে। উদ্ধারকারীরা জীবিতদের খোঁজে তল্লাশি চালালেও এখন মৃতদেহ উদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার লা গুয়াইরার মাকুতো এলাকায় ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল তাদের অভিযান স্থগিত করেছে। সেখানে একটি ভবনের নিচে আটকা পড়া এক মা ও তার তিন সন্তানকে উদ্ধারের জন্য ৪০ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় আশা ছেড়ে দিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। ইকুয়েডরের উদ্ধারকারী দলের নেতা মেজর হোর্হে মোন্তানেরো বলেন, 'অনেক দিন পার হয়ে গেছে। আমরা মনে করছি এখন কেবল মৃতদেহই পাওয়া যাবে।'
তবে এমন পরিস্থিতির মাঝেও কিছু আশার আলো দেখা গেছে। মঙ্গলবার কারাকাসে একটি জর্ডানিয়ান উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উদ্ধার হওয়া হাতেগোনা কয়েক জন জীবিত ব্যক্তির মধ্যে এই শিশুটি অন্যতম।
মার্কিন সহায়তা
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পর্যবেক্ষণ করতে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় অন্তত ৪ থেকে ৫টি 'এমকিউ-৯ রিপার' ড্রোন ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। মিয়ামিতে একটি বিশেষ কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব ড্রোন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা হচ্ছে। ডনোভান বলেন, 'রাস্তাঘাট সচল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করতে আমরা ড্রোন ব্যবহার করছি। মাটির সমান্তরাল থেকে অনেক সময় এসব ক্ষয়ক্ষতি ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না।'
ভার্জিনিয়া থেকে আসা একটি উদ্ধারকারী দল এক মা ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুকে উদ্ধারের ভিডিও প্রকাশ করেছে।
ডনোভান জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা যাতে প্রবেশের মুখে জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা না থাকলে ত্রাণ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
এদিকে, সময়মতো ভারী যন্ত্রপাতি ও উদ্ধারকারী দল না পাঠানোর কারণে ভেনেজুয়েলা সরকারের সমালোচনা হচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন বাসিন্দারা হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়েই স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ডনোভান বলেন, কয়েক দশকের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ওষুধ ও হাসপাতাল কর্মীর সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই মিশন কতদিন চলবে সে বিষয়ে ডনোভান নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, 'কাজ শেষ হলেই আমরা চলে যাব।' তবে এই উদ্যোগের ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই সহযোগিতাকে এক বিস্ময়কর মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ৩ জানুয়ারি মাদক পাচারের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে মার্কিন বাহিনী। যদিও মাদুরো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর বাইরে গত মাসে ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কারাগারের অপরাধী চক্র 'ট্রেন দে আরাগুয়া'র এক নেতাকে হত্যার অভিযানেও অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রসঙ্গে ডনোভান বলেন, '৩ জানুয়ারির ঘটনা খুব বেশি দিন আগের নয়। অথচ এই অল্প সময়ের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।'
