খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুযোগ, আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ সরাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, "আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ব্যাংক খাতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মন্দ ঋণ পরিশোধে এক্সিট পলিসির আওতায় বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ইউক্রেন ও তুরস্কের মতো দেশে কার্যকর হয়েছে।"
গভর্নর বলেন, "অর্থঋণ আদালতের বিচার প্রক্রিয়া ৬ মাসের মধ্যে শেষ করতে আইন সংশোধন এবং ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করে ব্যাংকের টক্সিক অ্যাসেট বা খারাপ ঋণ সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।"
২০২৭ সালের মধ্যে এ ধরনের কোম্পানি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গভর্নর আরও বলেন, অহেতুক মন্দ ঋণ ব্যালান্স শিটে রেখে দেওয়া এক ধরনের 'মিসরিপ্রেজেন্টেশন'। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে মন্দ ঋণ রাইট-অফ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে রাইট-অফ করা হলেও ঋণগ্রহীতারা দায়মুক্তি পাবেন না এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। নতুন মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর বলেন, "মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পলিসি রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মুদ্রানীতি মূলত চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমাতে কাজ করে। তবে এর পূর্ণ কার্যকারিতার জন্য রাজস্বনীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।"
তিনি বলেন, "মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। এর জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সিন্ডিকেট বা বাজার কারসাজি বন্ধ করা জরুরি। মুদ্রানীতির বিভিন্ন টুল ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যান্য অংশীজনের সহায়তায় মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।"
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কিছুদিন মূল্যস্ফীতি কমলেও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে গত মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি শিগগিরই কমার কোনো লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় প্রধান নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ২৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য, বিশেষ করে কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গভর্নর বলেন, "২০২০ সালের কোভিড-১৯ সময়ের প্রণোদনা প্যাকেজের ভুলত্রুটি সংশোধন করে এবার কঠোর তদারকি করা হবে। শুধু টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা নয়, বরং জ্বালানি বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা সমাধানের শর্তে ঋণ দেওয়া হবে।"
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের সুদের হারের পার্থক্য বা স্প্রেড ৪ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে। এর ফলে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা—উভয়ই উপকৃত হবেন এবং কোনো ব্যাংক অস্বাভাবিক মুনাফা করতে পারবে না।
ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থার কারণে আগামীতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরদার হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য নীতি সুদহারও অপরিবর্তিত রেখেছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি বা এসএলএফ হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
প্রভাবশালী মহলের চাপ গ্রহণ করা হবে না
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় তিনি বলেন, সম্প্রতি ৬টি ব্যাংকে বিশেষ অডিট টিম পাঠানো হয়েছে। তারা বৈদেশিক মুদ্রা ও আইটি-সংক্রান্ত অডিট করেছে। অডিটে ২০২৫ সালের এলসি পেমেন্ট আগেই হয়ে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে এবং কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ গ্রহণ করা হবে না। হারিয়ে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরোনো তদন্তগুলো পুনরায় চালুর বিষয়েও ইঙ্গিত দেন তিনি।
গভর্নর বলেন, আওয়ামী লীগের সময় ব্যাংকগুলোকে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৫১ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত চার মাসে বিশেষ কোনো সহায়তা দিতে হয়নি; শুধু ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বিনিময় হার নিয়ে বড় ঝুঁকি দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক
গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। স্বল্প মেয়াদে বিনিময় হার নিয়ে বড় কোনো ঝুঁকি নেই বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ হওয়ায় উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে বৈদেশিক ঋণ নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি বিদেশি প্যারেন্ট কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
গভর্নর বলেন, মেঘনা গ্রুপের ৮০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে প্রাথমিক কিছু আপত্তি থাকলেও বৈদেশিক ঋণ সহজ করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বিষয়টিকে এখন ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "সিটি গ্রুপের প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার দায়ের বিষয়টি সমাধানে ২৯টি ব্যাংক মিলে একটি পথ বের করার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। আশা করি, আমরা একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারব।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের বিষয়ে সংসদে উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন গভর্নর।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি টাস্কফোর্স নিয়মিত কাজ করছে। এ কাজের জন্য বিশেষায়িত ও স্থায়ী জনবল নিয়োগে বিভিন্ন সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণখেলাপিদের বারবার রিশিডিউলের সুযোগ বন্ধ করতে নতুন এক্সিট পলিসি আনা হয়েছে। এছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ব্যাংকের দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করবে।
