রূপপুর গ্রিন সিটি: সাব-স্টেশনের সরঞ্জাম কেনায় ৮গুণ বেশি ব্যয়ের তথ্য পেল মহা হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের গ্রিন সিটি আবাসনে সাব-স্টেশনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রায় আটগুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে বলে এক বিশেষ নিরীক্ষায় পেয়েছে বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বা সিএজি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৬৬০ কেভি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন স্থাপনের সরঞ্জাম ও জেনারেটর, ১১টি ভবনের লিফট, এয়ার কুলার, সোলার প্যানেল, সিসি ক্যামেরা, ফায়ার হাইড্র্যান্ট, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প স্থাপনে বেশি দামে সরঞ্জাম কেনা হয়েছে।
তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, মেসার্স সাজিন এন্টারপ্রাইজ এবং এমএসসিএল-জিকেবিপিএল (জেভি)—এসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে বৈদ্যুতিক পণ্য সরবরাহ করেছে, তার প্রকৃত মূল্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা। তবে পিডব্লিউডি সিডিউল অব রেটস-২০১৮ অনুসরণ না করে যোগসাজশের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২১৩ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনায় ঠিকাদারদের ৭ দশমিক ৯২ গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ১৮৬ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএজি।
নিরীক্ষা মন্তব্যে বলা হয়েছে, এস্টিমেট কমিটি গঠন না করে বাজারদর ও সিডিউল অব রেটসের চেয়ে বেশি দরে ব্যয় প্রাক্কলন তৈরি করে ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
নিরীক্ষা সুপারিশে বলা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য, বিল অনুমোদনকারী এবং বিল পরিশোধকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তিকৃত অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া প্রয়োজন।
সিএজির নিরীক্ষা দল শুধু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনায় নয়, সরকারি কেনাকাটার আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে অনিয়ম পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ দামে বালিশ ও ড্রেসিং টেবিল কেনা, নির্ধারিত পণ্য সরবরাহ না করলেও ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ, নকশার নির্দেশনা অনুসরণ না করে রডের ল্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ অতিরিক্ত পরিমাপ দেখিয়ে বিল পরিশোধ, ঠিকাদারের বিল থেকে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করা এবং অস্বাভাবিক নিম্নদরের কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই চুক্তি সম্পাদন ও সরবরাহকৃত পণ্যের বাড়তি চুক্তিমূল্য পরিশোধ।
মোট ১০টি বিষয়ে অডিট আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ২৯৪ কোটি টাকা। এ অর্থ সরকারের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সিএজি।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আবাসন ভবন, অর্থাৎ গ্রিন সিটির ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাবের ওপর কমপ্লায়েন্স অডিটে এসব অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ' শীর্ষক প্রকল্পের আবাসন ভবন বা গ্রিন সিটি নির্মাণকাজে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাজেট ছিল ২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২২৮ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা।
অনিয়মের বিষয়গুলো তুলে ধরে সিএজি নিরীক্ষা প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএজির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, "নিরীক্ষায় যেসব অনিয়ম পাওয়া গেছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।"
কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারা এখনো কিছু জানেন না।
বালিশ কেনায় ক্ষতি ৩.৯২ কোটি টাকা
সিএজির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বালিশ কেনায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক ৯২ কোটি টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাজিন কনস্ট্রাকশন ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কাছ থেকে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনার জন্য ৫ দশমিক ৪১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। সেই হিসাবে প্রতিটি বালিশের গড় দাম পড়ে ১১ হাজার ৫০৩ টাকা।
তবে নিরীক্ষা দল একই ধরনের বালিশ কিনে দেখেছে, কভারসহ প্রতিটি বালিশের বাজারদর ৩ হাজার ১৫৪ টাকা। এর মধ্যে পরিবহন ব্যয়, ওভারহেড ও মুনাফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই হিসাবে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনায় ব্যয় হওয়ার কথা ১ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে গণপূর্ত বিভাগ, পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় বাজারদরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ধরে প্রতিটি বালিশের প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করে ৯ হাজার ৩০৭ টাকা।
এর মধ্যে ৭৩টি বালিশ কেনা হয়েছে প্রতিটি ২৯ হাজার ৮৪৭ টাকায় এবং ৬০টি বালিশ কেনা হয়েছে প্রতিটি ৮৯ হাজার ৯০০ টাকায়। ফলে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনায় সরকারের ৩ দশমিক ৯২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
ড্রেসিং টেবিল কেনায় ক্ষতি ৩.৩৩ কোটি টাকা
সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিন সিটি প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়। এতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭ দশমিক ৪৩ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৬৬৯টি ড্রেসিং টেবিল সরবরাহের বিপরীতে সাজিন কনস্ট্রাকশনকে ৩ দশমিক ০২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। আর ৬৭৩টি ড্রেসিং টেবিলের জন্য আরেক ঠিকাদারকে ৩ দশমিক ২৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।
সেই হিসাবে প্রতিটি ড্রেসিং টেবিলের গড় দাম পড়ে ৫৫ হাজার ৩৭৯ টাকা।
সিএজির নিরীক্ষা দল একই ধরনের ড্রেসিং টেবিল কিনে দেখেছে, প্রতিটির বাজারমূল্য ৩০ হাজার ৫০৩ টাকা। এর মধ্যে পরিবহন ব্যয়, ওভারহেড ও মুনাফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই হিসাবে ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনায় ব্যয় হওয়ার কথা ৪ দশমিক ০৯ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী দরপত্র মূল্য ভারসাম্যপূর্ণ না হলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দরপত্রদাতাকে দরপত্র মূল্যের পূর্ণাঙ্গ বিভাজন দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারত। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিধি অনুসরণ না করে ৩ থেকে ১৬ গুণ অতিরিক্ত উদ্ধৃত একক দর মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করে।
