যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন দূতদের বৈঠক, শর্তে অনড় তেহরান
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি দোহায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান আলোচনা এগিয়ে নেওয়াই ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।
মঙ্গলবারের এ বৈঠকের পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় চলমান আলোচনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, কাতারের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় চলমান আলোচনায় কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'বৈঠকে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ লেবাননের যুদ্ধবিরতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।'
পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি প্রতিনিধি দলের বৈঠক এখনও চলছে। মধ্যস্থতাকারীদের অংশগ্রহণে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যাতে দোহা বা অন্য যেকোনো স্থানে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাবে না। এর মধ্যে লেবাননের যুদ্ধের অবসান এবং সমঝোতা বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপও রয়েছে।
গালিবাফ বলেন, 'আমরা আলোচনাও করছি। কিন্তু তারা যদি আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না চায়, তাহলে আমরাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।'
তিনি জানান, সমঝোতা স্মারকের লেবানন-সংক্রান্ত ধারাগুলোর বাস্তবায়ন তদারকিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, সমঝোতা স্মারকের ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলবে। এসব ধারার মধ্যে রয়েছে— লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের তেল রপ্তানি নিশ্চিত করা এবং দেশটির অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করা।
গালিবাফ জানান, লেবানন পরিস্থিতিতে সংঘাত এড়াতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন একটি যৌথ 'ডি-কনফ্লিকশন সেল' গঠনে একমত হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছে। সেলটি চালু হওয়ার আগে লেবাননও প্রতিনিধি নিয়োগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্কট উহলিঙ্গার বলেছেন, দোহায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না হলেও পরোক্ষ কারিগরি বৈঠকের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, আগে থেকেই নির্ধারিত কারিগরি বৈঠকগুলো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে এমন জটিলতা এড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করা ইরানের 'পারস্য আলোচনা কৌশল'। তার দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, 'আগের আলোচনার ধারাবাহিকতায় কিছু কারিগরি বৈঠক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। সেগুলো অবশ্যই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।'
তিনি বলেন, ইরানের বক্তব্য তার কাছে 'বিস্ময়কর ও হতাশাজনক' মনে হয়েছে। কারণ, ইরানি কর্মকর্তারা একদিকে শান্তি আলোচনার কথা অস্বীকার করছেন, অন্যদিকে কারিগরি আলোচনার কথা স্বীকার করছেন। তিনি আরও বলেন, 'তারা বলছে শান্তি আলোচনা চলছে না। আবার বলছে, শান্তিচুক্তি নিয়ে কারিগরি আলোচনা চলছে। এটি এমন এক পারস্য আলোচনা কৌশল, যা আমি বুঝতে পারি না।'
এর আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান দোহায় বৈঠকের অনুরোধ করেছে। এরপর হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার কাতারে যান। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছে। তেহরানের দাবি, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা ও পরামর্শের প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
