ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক, তদন্তের আহ্বান ইউরোপীয় নেতাদের
ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' প্রদান করেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মাঝামাঝি সময়ে, সোমবার (২৯ জুন) ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান এবং সংস্থাটির 'স্বাধীন' নীতিশাস্ত্র কমিটির কাছে একটি চিঠি পাঠান।
এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন আয়ারল্যান্ডের ব্যারি অ্যান্ড্রুজ, যিনি 'রিনিউ' রাজনৈতিক জোটের সদস্য; নেদারল্যান্ডসের লারা ওলটার্স এবং ডেনমার্কের নিলস ফুগলসাং, যারা দুজনই সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিক।
ল্য মোঁদ পত্রিকার দেখা প্রায় ৫০ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যের স্বাক্ষরযুক্ত ওই চিঠিতে আইনপ্রণেতারা ফেডারেশনের নীতিশাস্ত্র কমিটিকে 'সর্বোচ্চ দ্রুততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে' ইনফান্তিনোর ভূমিকা এবং পুরস্কার প্রদানের অত্যন্ত অস্পষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানান।
ল্য মোঁদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজে ফিফার দশজনেরও কম কর্মী যুক্ত ছিলেন, যদিও প্রকল্পটির অর্থায়ন করেছিল সংস্থাটিই।
লেবানিজ-ইতালীয়-সুইস বংশোদ্ভূত সভাপতি ইনফান্তিনো নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই উদ্যোগটি যেন সংস্থার ভেতরে গোপন রাখা হয়।
এরপর থেকে সেই নির্দেশ সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফার সদর দপ্তরের করিডোরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আমাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওয়াশিংটনে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ড্র চলাকালে অনুষ্ঠিত ওই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আগে বা পরে ইনফান্তিনো ফিফা কাউন্সিলের কোনো সদস্যকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করেননি।
চিঠিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা জানান, তারা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফেয়ারস্কয়ার ফিফার নীতিশাস্ত্র কমিটির কাছে যে অভিযোগ দায়ের করেছিল, তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
ওই অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের ২ জুন নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন সমর্থন করে।
আইনপ্রণেতারা উল্লেখ করেন, তাদের অভিযোগে বেসরকারি সংস্থাটি সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইনফান্তিনোর প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণে তিনি ফিফার নীতিশাস্ত্র বিধির ১৫ নম্বর ধারায় বর্ণিত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার দায়িত্ব চারবার লঙ্ঘন করেছেন।
এ ছাড়া একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ফিফা কাউন্সিলকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং চূড়ান্তভাবে পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
'এটি পুরো টুর্নামেন্টের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে'
এরপর থেকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই এটি নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা উল্লেখ করেন, এর মধ্যে রয়েছে 'টিকিটের অত্যধিক মূল্য' এবং 'ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা'।
তবে তাদের মতে, টুর্নামেন্টটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা সম্ভবত ফিফার পক্ষ থেকে প্রথম 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রদান করা।
তারা লিখেছেন, বিশ্বকাপের কারণে যখন 'পুরো বিশ্বের নজর ফিফার দিকে', তখন সংস্থাটির উচিত ফেয়ারস্কয়ারের নীতিশাস্ত্রবিষয়ক অভিযোগের নিষ্পত্তি করা এবং প্রমাণ করা যে তারা ন্যায্যতা, সমতা এবং মানব মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার মৌলিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখে।
তাদের ভাষায়, এই অভিযোগটি ফিফার জন্য একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে সংস্থাটি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার প্রমাণ করতে পারে।
ব্যারি অ্যান্ড্রুজ ল্য মোঁদকে বলেন, 'বিশ্বকাপ সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক আয়োজন। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পুরো বিশ্বকে একত্রিত করা।'
তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু যখন ফিফার সভাপতি ইনফান্তিনো একজন রাষ্ট্রপতিকে অন্যজনের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন, তখন তা ফিফা এবং পুরো বিশ্বকাপের সুনাম ক্ষুণ্ন করে।'
অ্যান্ড্রুজ বলেন, 'আমরা শুধু চাই ফিফার নীতিশাস্ত্র কমিটি যেন প্রথম 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেওয়ার বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করে।'
ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের উদ্বেগ প্রকাশের ঘটনা এটি প্রথম নয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, 'বিপুলসংখ্যক' ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ২০৩৪ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে সৌদি আরবকে নির্বাচিত করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ফিফা সভাপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্বেগের বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি ফিফা।
বরং, অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চিঠির কিছুদিন পরই সংস্থাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় করপোরেট দূষণকারী হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবের জাতীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে লাভজনক একটি পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে রিয়াদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।
ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের এই সর্বশেষ চিঠির জবাব দিতে ইনফান্তিনো উদ্যোগ নেবেন কি না, তা এখনো দেখা বাকি।
তবে ফিফা ও এর সভাপতির ভাবমূর্তি রক্ষা করা সংস্থাটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
এর প্রমাণ হিসেবে ল্য মোঁদের পর্যালোচনা করা একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের মার্চে ফিফা লন্ডনভিত্তিক যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'টেন টোজ মিডিয়া'র সঙ্গে স্বাক্ষর করেছিল।
২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত সেবা প্রদানের বিনিময়ে সংস্থাটিকে মোট প্রায় ৩০ লাখ ইউরো পরিশোধ করবে ফিফা।
এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি ফিফা এবং সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব পরিচালনা করবে।
এ বিষয়ে ল্য মোঁদকে পাঠানো এক ই-মেইলে ফিফা জানায়, 'কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মূলত একটি মাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব পরিচালনা করে—এমন দাবি মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর।'
সংস্থাটি আরও জানায়, 'কোনো ব্যক্তিগত চুক্তির তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রয়োজনবোধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ফিফা সংরক্ষণ করে।'
ফিফা আরও লিখেছে, 'বিশ্বের অন্যান্য বড় আন্তর্জাতিক সংস্থার মতোই, ব্যস্ত সময়—যেমন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে—জনবল ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অধিক নমনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য ফিফার যোগাযোগ বিভাগ বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গ্রহণ করে।'
তবে 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' কিংবা ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের পাঠানো চিঠি সম্পর্কে ল্য মোঁদের করা প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি সংস্থাটি।
