জাপানের ইতিহাসে প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটি নিচ্ছেন একজন মেয়র; মানতে পারছেন না কিছু পুরুষ
অন্যান্য অনেক দেশে এ ধরনের ঘটনা হলে কেউ ভ্রূক্ষেপও করত না। কিন্তু জাপানের মেয়র শোকো কাওয়াতা যখন ঘোষণা দিলেন যে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নিচ্ছেন, তখন সেই সিদ্ধান্ত জাতীয় শিরোনামে উঠে এসেছে। এটি এখন জনমত জরিপের বিষয় এবং দেশজুড়ে একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আর সেই বিতর্ক এখনও জাপানে চলমান। মে মাসে তিনি তার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা থামেনি। সোমবার তিনি পশ্চিম জাপানের ইয়াওয়াতা শহরের পরিষদকে জানান, তার অনুপস্থিতিতে উপমেয়র নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
এরপর প্রকাশিত দৈনিক 'মাইনিচি' পত্রিকার একটি সম্পাদকীয়তে কাওয়াতার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, পরিবর্তনকে সমর্থন করার মতো একটি কাঠামো তৈরি করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানেরই। সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, 'জাপানে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে মানুষ স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই এ ধরনের ছুটি নিতে পারে।'
ভিডিও কলে গার্ডিয়ানকে কাওয়াতা বলেন, 'আমি কল্পনাও করিনি যে বিষয়টি এতটা বিতর্কিত হয়ে উঠবে। এখনও এমন একটি ধারণা রয়েছে যে কর্মজীবনে সফল হতে হলে মানুষকে নিজের ব্যক্তিগত জীবন ত্যাগ করে পুরোপুরি পেশার প্রতি নিবেদিত থাকতে হবে।'
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান বর্তমানে জনসংখ্যা হ্রাসের গুরুতর সংকট মোকাবিলা করছে। দেশটিতে কর্মজীবী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ থাকলেও সেই আইন নগরের মেয়রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
৩৫ বছর বয়সী কাওয়াতাই দায়িত্বে থাকা প্রথম মেয়র, যিনি এই ছুটি নিচ্ছেন। নিজের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমার মনে হচ্ছে, অনলাইনে অনেক মানুষ এখন ধীরে ধীরে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'পুরুষদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেওয়া তাদের শরীরে শারীরিক প্রভাব ফেলে না। তাই ব্যক্তিগত জীবনকে কিছুটা পেছনে রেখে তাদের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে শারীরিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের জন্য সেটি সম্ভব নয়।'
সাম্প্রতিকতম বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা সূচকে জাপানের অবস্থান ছিল ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১১৮তম, যা সাতটি শিল্পোন্নত দেশের মধ্যে সবচেয়ে নিচে। পুরোনো ধ্যানধারণা ও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ধারণাগুলো এই অবস্থানের অন্যতম কারণ। ফলে কাওয়াতার সিদ্ধান্ত আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে জাপানে স্থানীয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নারী। আর তাদের মধ্যে ৪০ বছরের কম বয়সীদের হার মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ।
কাওয়াতা স্বীকার করেন, 'জাপানে লিঙ্গসমতায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে নারীদের এখনও অনেক সংগ্রাম করতে হয়।'
ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
৩৩ বছর বয়সে কাওয়াতা জাপানের সর্বকনিষ্ঠ নারী মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। তার নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়ন।
যদিও তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসেননি, তবুও ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ ছিল।
তিনি বলেন, 'জাপানের অর্থনৈতিক বুদবুদ ভেঙে পড়ার পর আমার জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকে মায়ের মুখে সেই আগের ভালো সময়ের গল্প শুনতাম, অথচ আমি নিজে সেই সময় কখনও দেখিনি। তখন থেকেই আমার মনে প্রশ্ন জাগত—কেন?'
কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কিয়োটো নগরে একজন কেসকর্মী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরে তিনি একজন রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ২০২৩ সালে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন।
গত তিন বছরে কাওয়াতা জাপানের একটি বহুল আলোচিত সমস্যা—জনসংখ্যা হ্রাস—মোকাবিলায় নিজের দক্ষতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ২০০২ সালে তার নির্বাচনী এলাকার জনসংখ্যা ছিল ৭৪ হাজার ৩২৯ জন, যা প্রদেশটির সবচেয়ে ছোট এলাকাগুলোর একটি। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৮৭৬ জনে।
কাওয়াতা বলেন, 'জাপানের জনসংখ্যা যে ক্রমাগত কমছে, সে বিষয়টি সম্পর্কে আমি সব সময়ই সচেতন ছিলাম। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি সত্যিকার অর্থে এই সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করতে শুরু করি।'
তার মতো পদে থাকা কেউ আগে কখনও মাতৃত্বকালীন ছুটি নেননি। তাই কাওয়াতাকে নিজের পরিকল্পনা নিজেকেই তৈরি করতে হচ্ছে। জাতীয় মানদণ্ড অনুসরণ করে তিনি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে আবার কাজে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন।
এটি তার প্রথম সন্তান হওয়ায় সামনে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি আশা করেন, তার এই সিদ্ধান্ত জাপানের আরও বেশি নারীকে রাজনীতিতে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করবে।
তিনি বলেন, 'যদি আরও বেশি নারী নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে যুক্ত হন, তাহলে কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক আরও বেশি সামাজিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।'
