ইউরোপ মহাদেশ কেন সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে?
এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে পশ্চিম ইউরোপে। এ ঘটনা এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরছে: গত তিন দশক ধরে পৃথিবীর অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে ইউরোপ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাস-এর তথ্য বলছে, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতির চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের জেরে নির্গত হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাস। আর সেই গ্যাস আটকে রাখছে তাপ। কারব-ডাই-অক্সাইড ও এসব গ্যাসের নিঃসরণই দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ। এর ফলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
তবে এই অতিরিক্ত তাপ পৃথিবীর কোথায় কীভাবে ছড়িয়ে পড়বে, তা অনেকটাই নির্ভর করে কিছু স্থানীয় প্রভাবকের ওপর। কিছু জায়গায় তাপমাত্রা কেন অন্যান্য জায়গার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে, তার উত্তরও লুকিয়ে রয়েছে সেখানেই।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইউরোপের একেবারে উত্তর প্রান্তের কথা। এই এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ একসময় সমুদ্রের বরফে ঢাকা থাকত। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সেই বরফ ক্রমশ গলে যাচ্ছে। বরফ গলার ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে সাগরের কালচে পৃষ্ঠ। আর সেই অনাবৃত জলরাশি আরও বেশি করে শুষে নিচ্ছে সূর্যের তাপ। এর ফলে পৃথিবীর উত্তর প্রান্ত ও সংলগ্ন এলাকায় উষ্ণায়ন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
ইউরোপের এই দ্রুত উষ্ণায়নের পেছনে দূষণ নিয়ন্ত্রণও একটি অন্যতম কারণ। শিল্পকারখানার কার্বন নির্গমন কমানোর উদ্যোগ ইউরোপীয়দের ফুসফুসের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তবে এর ফলে বাতাসে 'অ্যারোসল' নামক সূক্ষ্ম কণার পরিমাণ বেশ কমে গেছে। এই কণাগুলো সৌর বিকিরণকে প্রতিফলিত করে মহাকাশে ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে।
সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বরফের আস্তরও আগের চেয়ে কমেছে। কোপারনিকাসের তথ্যমতে, গত বছর ইউরোপে যখন বরফ পড়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকার কথা, তখনও তুষারপাতের হার ছিল গড়ের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। ফলে মাটি অনেক বেশি উন্মুক্ত থাকছে এবং দ্রুত তাপ শোষণ করছে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
স্থলভাগ ও সমুদ্রে এসব পরিবর্তন ইউরোপের ওপর দিয়ে বয়ে চলা বায়ুপ্রবাহের গতিপথও বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারণেই চলতি সপ্তাহের মতো ভবিষ্যতে সম্ভবত আরও ঘন ঘন এমন তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেবে।
উত্তর গোলার্ধের আবহাওয়া মূলত নির্ভর করে উদন নিরক্ষীয় অঞ্চল ও শীতল উত্তর মেরুর তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর। কিন্তু প্রতি বসন্তেই এখন ইউরোপের মাটিতে বরফের আস্তর পাতলা হচ্ছে আর গলছে সমুদ্রের বরফ। ফলে দুই মেরুর তাপমাত্রার পার্থক্য ক্রমশ কমে আসছে।
২০২০ সালের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ার কারণে 'জেট স্ট্রিম' বা আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ুর বলয়ের গতিপথ বদলে যেতে পারে। সে কারণেই ইউরোপ মহাদেশজুড়ে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, সাম্প্রতিক কয়েক দশকে ইউরোপের আকাশে এই জেট স্ট্রিম আগের চেয়ে ঘন ঘন দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এতে বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে এমন এক অঞ্চলের সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে তাপ বহু দিন ধরে আটকে থাকছে।
সাধারণত আটলান্টিক মহাসাগর থেকে বয়ে আসা শীতল সামুদ্রিক বাতাসকে ইউরোপের দিকে ঠেলে দেয় এই জেট স্ট্রিম। কিন্তু এটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলে ওই দুই শাখার মাঝে আটকা পড়া উচ্চচাপের বাতাস আবহাওয়ার স্বাভাবিক গতিপথকে ঘুরিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের যে গুমোট গরম অল্প কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যেত, এই গতিপথ বদলের কারণে তা রূপ নেয় কয়েক সপ্তাহব্যাপী প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহে।
২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও বারবার ফিরে আসার অন্যতম প্রধান কারণ এই 'ডাবল জেট' প্যাটার্ন। এই অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই 'ডাবল জেট' এত ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০০৩ সালে ইউরোপজুড়ে হওয়া তাপপ্রবাহে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেবার এই 'ডাবল জেট' একটানা ২৯ দিন অবস্থান করেছিল। চলতি সপ্তাহের তাপপ্রবাহ যদি ততটা দীর্ঘস্থায়ী না-ও হয়, তবু এটি এরইমধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে, তা-ও বিশাল ব্যবধানে।
ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় চলতি সপ্তাহের তাপমাত্রা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্লেষণ শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের ফলেই এমন ভয়াবহ তাপপ্রবাহের আশঙ্কা কতটা বেড়েছে, সেটি বোঝার চেষ্টা চলছে।
ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী লিজি কেন্ডন বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়বে এবং রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙবে, এটাই স্বাভাবিক।' তবে চলতি সপ্তাহে যে বিপুল ব্যবধানে পুরনো রেকর্ডগুলো ভাঙছে, তাকে কার্যত 'অভূতপূর্ব' বলে আখ্যা দেন তিনি।
