১০ হাজার কোটির বাজার! ঢাকায় যেভাবে ডালপালা মেলছে বোটক্স ও ফিলারের ‘অ্যাস্থেটিক অর্থনীতি’
ঢাকার রাস্তায় হাঁটলে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাণিজ্যিক ভবন। প্রতিটি ভবনের একাধিক তলাজুড়ে রয়েছে নানা ধরনের রেস্তোরাঁ। গত দুই দশক ধরে এ দৃশ্যই রাজধানীর নগরচিত্রের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি ধরনের ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। রেস্তোরাঁগুলোর পাশাপাশি সুচারুভাবে সাজানো আধুনিক ইন্টিরিয়র ডিজাইনের বিউটি স্যালনও এসব ভবনে নীরবে জায়গা করে নিয়েছে। আর সাম্প্রতিককালে, রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে লেজার ও অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকগুলোও দ্রুত বাড়ছে।
এখন, কোনো একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো ভবনে প্রবেশ করার পর, অসাবধানতাবশত লিফটের ভুল বোতাম টিপে নিজেকে একটি লেজার ও অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকের অভ্যর্থনা কক্ষে আবিষ্কার করা এখন মোটেও অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।
গত দুই দশকে ঢাকা এক অসাধারণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। শহরের প্রায় প্রতিটি কোণে বাণিজ্যিক ভবনগুলো ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে, যা শহরের আকাশরেখা ও নগরচিত্রকে নতুন রূপ দিয়েছে। বাইরে খাওয়া ও আড্ডা দেওয়া যেমন নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তেমনি অ্যাস্থেটিক চিকিৎসাও ধীরে ধীরে মূলধারায় চলে এসেছে। একসময় এগুলো ছিল অল্প কয়েকজনের বিলাসিতা, এখন তা ক্রমেই নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশে পরিণত হচ্ছে।
সৌন্দর্য এখন আর বিলাসিতা নয়, নিয়মিত পরিচর্যার অংশ
অনেকেই বলেন, সৌন্দর্য আপেক্ষিক। তবে নীলিমা (ছদ্মনাম) এ কথায় পুরোপুরি একমত নন।
ঢাকায় বসবাসকারী ৩৫ বছর বয়সী এই বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, 'সৌন্দর্যের সঙ্গে সব সময়ই একটি বিশেষ সুবিধার সম্পর্ক ছিল। যদি নিজের সৌন্দর্য আরও বাড়ানোর সামর্থ্য থাকে, তাহলে তা কেন করব না?'
গত কয়েক বছর ধরে তিনি নিয়মিত বোটক্স এবং সূক্ষ্ম সূচের মাধ্যমে ত্বকের পুনরুজ্জীবন চিকিৎসা করিয়ে আসছেন। তবে তিনি এগুলোকে অহেতুক বাহুল্য বা আত্মপ্রদর্শনের বিষয় বলে মনে করেন না। তার কাছে এগুলো জিমে সদস্যপদ নেওয়া বা ত্বকের নিয়মিত পরিচর্যার মতোই—নিজেকে বদলে ফেলার নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়ার একটি বিনিয়োগ। প্রথমবার তিনি বন্ধুদের বিষয়টি জানালে কয়েকজন অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাদের বেশির ভাগই সেই চিকিৎসাকেন্দ্রের ঠিকানা বা যোগাযোগ নম্বর জানতে চেয়েছিলেন।
তার অভিজ্ঞতা আসলে আরও বড় একটি পরিবর্তনের প্রতিফলন। একসময় যে বিউটি স্যালনগুলো ভ্রু পরিচর্যা, মুখের ত্বকের পরিচর্যা, চুলের চিকিৎসা এবং কনের সাজের মতো সেবার মাধ্যমে শহরের আত্মপরিচর্যার সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করত, এখন সেগুলোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকগুলোও সমানভাবে জায়গা করে নিচ্ছে।
ধানমন্ডি, গুলশান, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন কাচে ঘেরা আধুনিক ক্লিনিক দেখা যায়, যেখানে মুখের বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশে ভরাট করার চিকিৎসা, লেজার চিকিৎসা এবং রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহার করে ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করার চিকিৎসাসহ নানা ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
বলিরেখা কমানোর এই চিকিৎসায় মুখের পেশি সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়। মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশে ভরাট করার চিকিৎসার মাধ্যমে ঠোঁট, গাল ও চোয়ালের হারিয়ে যাওয়া ভরাট ভাব ফিরিয়ে আনা হয়। আর রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহার করে করা চিকিৎসায় তার রক্ত থেকে বিশেষ উপাদান সংগ্রহ করে আবার ত্বকে প্রয়োগ করা হয়, যাতে কোলাজেন উৎপাদন বাড়ে এবং ভেতর থেকে ত্বকের গঠন ও মান উন্নত হয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও বিপণনে প্রায়ই ইংরেজির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ধাঁচের উপস্থাপনা এবং বিশেষ করে কোরীয় সৌন্দর্যচর্চার প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যেও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত একটি বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং চিকিৎসাসেবাও ক্রমশ আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে। একসময় যে চিকিৎসাগুলো কেবল ধনী ও অভিজাতদের নাগালের মধ্যে ছিল, এখন সেগুলো মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই এখন সময় ও সামর্থ্য—দুই দিক থেকেই নিয়মিত এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার পক্ষে রয়েছেন।
এই পরিবর্তন শুধু একটি শিল্পের প্রসার নয়; এটি ভোক্তাদের আচরণ, সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা এবং আত্মপরিচর্যার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিরও বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন।
কারা ভিড় করছেন এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে?
এসব চিকিৎসাকেন্দ্রের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বইয়ে নাম লেখাচ্ছেন কারা? তারা কত টাকা খরচ করছেন? আর কী কারণে তারা এসব চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু সৌন্দর্যচর্চার গল্প বলে না। এটি বদলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, বার্ধক্যকে দেখার পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্রুত বিকাশমান এমন একটি শিল্পের গল্প, যা নীরবে ঢাকার মানুষের চেহারা, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মউন্নয়ন সম্পর্কে ধারণাকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে।
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার অর্থনীতি
দেশের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের বাজারের বর্তমান মূল্য আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১২৯ কোটি মার্কিন ডলার)। এর মধ্যেই অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা খাত দ্রুত বিকাশমান অন্যতম একটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশে বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশে ভরাট করার চিকিৎসা কিংবা উন্নত লেজার চিকিৎসার মতো সেবা পাওয়া ছিল কঠিন। অথচ আজ এগুলোকে এমন নিয়মিত পরিচর্যা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা অফিসের দুটি বৈঠকের মাঝখানে কিংবা দুপুরের বিরতিতেই সেরে নেওয়া যায়।
এ খাতের চিকিৎসকদের ভাষ্য, এর অন্যতম আকর্ষণ হলো সময়ের সাশ্রয়। 'এস্তে মেডিকেল বাংলাদেশ'-এর অ্যাস্থেটিক চিকিৎসক তাসনিম অর্পা বলেন, অস্ত্রোপচার ছাড়া করা অনেক চিকিৎসা—যেমন বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন বা মুখমণ্ডল ভরাটের চিকিৎসা—সাধারণত দুই ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে কর্মজীবীরা খুব বেশি সময় নষ্ট না করেই কর্মদিবসের মধ্যেই এসব সেবা নিতে পারেন।
বাংলাদেশে নান্দনিক চিকিৎসা এখন দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পগুলোর একটি হলেও, জনপরিসরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।
অ্যালগরিদমের যুগে সৌন্দর্য
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যের জোয়ারের বা বুমের একটি অংশ।
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার বাজারমূল্য ছিল ৬২১ কোটি মার্কিন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩২ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১ হাজার ২৫৭ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে।
একই সময়ে কোরিয়ার সৌন্দর্যসংস্কৃতির প্রভাবও বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে। নিখুঁত ত্বক ও সুঠাম মুখাবয়বের কোরীয় নাটকের তারকারা এখন অনেকের কাছে সৌন্দর্যের আদর্শে পরিণত হয়েছেন। আগের প্রজন্মের ওপর যে বলিউডকেন্দ্রিক সৌন্দর্যধারণার প্রভাব ছিল, তার জায়গা ধীরে ধীরে দখল করছে এই নতুন প্রবণতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগে যেসব ক্লিনিকগুলো মূলত পরিচিতজনের পরামর্শের ওপর নির্ভর করত, এখন তারা শুধু চিত্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওভিত্তিক মাধ্যমের সাহায্যেই বড় গ্রাহকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারছে।
ডা. তাসনিম বলেন, 'অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব চিকিৎসা এখন আগের তুলনায় আরও জনপ্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। মধ্যবিত্ত গ্রাহকেরাও ধীরে ধীরে এসব সেবার আওতায় আসছেন।'
তার ভাষ্য, তাদের ক্লিনিকের অধিকাংশ গ্রাহকের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তবে পঞ্চাশোর্ধ্ব এবং তারও বেশি বয়সী মানুষেরাও নিয়মিত এসব চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'আমাদের বেশির ভাগ গ্রাহকই উচ্চ আয়ের মানুষ। তবে তুলনামূলক কম খরচে সেবা দেওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের কাছেও এসব চিকিৎসা পৌঁছে দিচ্ছে।'
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার প্রতি বাড়ছে আগ্রহ
গুলশানের ৪৩ বছর বয়সী অর্থ খাতের পেশাজীবী তানহা গত তিন বছর ধরে নিয়মিত বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'আমি বিষয়টিকে ঠিক চুলে রং করার মতোই দেখি। এটি নিজের নিয়মিত পরিচর্যারই একটি অংশ। শুধু পার্থক্য হলো, মানুষ এ নিয়ে খুব একটা কথা বলে না।'
চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা তরুণ চিকিৎসকদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে তাসনিম অর্পা বলেন, 'আমি সব সময়ই ত্বকের পরিচর্যা নিয়ে আগ্রহী ছিলাম। চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে, অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা একটি দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্র। তাই আমি এই খাতেই নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
নিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং জরুরি বিভাগের তুলনামূলক কম চাপ থাকায় অনেক তরুণ চিকিৎসক প্রসাধন ও অ্যাস্থেটিক চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফলে প্রতি বছরই এ খাতে নতুন চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ছে।
ঢাকায় এখন মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের কাছেও নান্দনিক চিকিৎসা ক্রমশ সহজলভ্য হয়ে উঠছে। কারণ, ক্লিনিকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্যাকেজভিত্তিক সেবার কারণে একসময় বিলাসী হিসেবে বিবেচিত এসব চিকিৎসার খরচ এখন তুলনামূলকভাবে অনেকের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে।
ঢাকার একটি মধ্যম মানের ক্লিনিকের একবার বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন নিতে সাধারণত ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আর চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ক্লিনিকগুলোতে বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, মুখমণ্ডল ভরাটের চিকিৎসা এবং সুতা ব্যবহার করে ত্বক টানটান করার চিকিৎসা—সব মিলিয়ে পুরো মুখের একটি প্যাকেজের দাম ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে।
এর চেয়েও কম দামে কিছু প্রতিষ্ঠানে এসব সেবা দেওয়া হলেও, সেসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পণ্যের মান এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়ই উদ্বেগ দেখা দেয়।
গুলশানের 'ভিটাস্কিন'-এর আনজুমান বলেন, 'আমরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রতিষ্ঠানের বলিরেখা কমানোর ওষুধ, মুখমণ্ডল ভরাটের উপকরণ এবং কোরিয়ার বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করি, যেগুলো রোগীদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়। বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, মুখমণ্ডল ভরাট এবং সুতা ব্যবহার করে ত্বক টানটান করার চিকিৎসা—সবই একবারের সেশনেই সম্পন্ন করা যায়। সাধারণত এর ফল প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এরপর আবার পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।'
নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. শারমিন আখতার সুমি বলেন, 'বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, মুখমণ্ডল ভরাটের চিকিৎসা, গ্লুটাথায়ন এবং এ ধরনের অন্যান্য ইনজেকশননির্ভর প্রসাধনমূলক চিকিৎসা 'ওষুধ ও প্রসাধনী আইন, ২০২৩' এবং সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এসব চিকিৎসা করা যায় না। তবে ইনজেকশনভিত্তিক অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার জন্য এখনো আলাদা কোনো সরকারি নিবন্ধনব্যবস্থা চালু হয়নি।'
এটি কোনো ছোটখাটো পার্থক্য নয়। বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন বা বোটক্স হলো একটি নিউরোটক্সিন বা স্নায়ুবিষ। ফিলারগুলো প্রধান রক্তনালীগুলোর কাছাকাছি ইনজেকশন বা সুঁইয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করলে রক্তনালিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, ত্বকের কোষ নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং বিরল হলেও নথিভুক্ত কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহার করে করা চিকিৎসা বা পিআরপি-এর ক্ষেত্রে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব পদ্ধতি যেমন জটিল, তেমনি বাণিজ্যিক প্রচারে এগুলোকে অনেক সময় সাধারণ ও ঝুঁকিহীন সৌন্দর্যসেবা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আর এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, কেন এ খাতে আলাদা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঔষধি উপাদানসমৃদ্ধ প্রসাধনী পণ্যের অবস্থানও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ অ্যাস্থেটিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বহু পণ্যই এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আক্তার হোসেন বলেন, আগে এসব ঔষধি প্রসাধনী বাংলাদেশ মান ও পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মাধ্যমে বাজারে এলেও সেগুলোর জন্য আলাদা কোনো নিবন্ধন ব্যবস্থা ছিল না।
তিনি বলেন, অধিকতর কার্যকর তদারকির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরবর্তীতে এসব ঔষধি প্রসাধনীকে 'ওষুধ ও প্রসাধনী আইন'-এর আওতায় এনেছে।
তবে ডা. হোসেন জানান, আইনটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা এখনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি।
তিনি বলেন, 'আইনটি ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। কিন্তু এটি কার্যকর করার জন্য যে বিধিমালা প্রয়োজন, তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিধিমালা অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত আমরা পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম শুরু করতে পারছি না।'
ফলে একজন ভোক্তার পক্ষে অনেক সময় নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—তিনি যে চিকিৎসা নিচ্ছেন তা আসল কি না, ইনজেকশন প্রয়োগকারী ব্যক্তি যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি না, কিংবা ব্যবহৃত ওষুধ বা উপাদানটি মানসম্মত কি না।
নিজেকে প্রমাণের চাপ
ঢাকার অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকগুলোতে যে আলোচনা চলছে, তার প্রতিফলন জনপরিসরেও দেখা যায়।
সম্প্রতি খ্যাতিমান অভিনেত্রী ও শিল্পী বিপাশা হায়াত পাকা চুল নিয়ে প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রত্যাশিতভাবেই মতামত বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ তাকে 'বৃদ্ধ' বলে মন্তব্য করেন, কেউ তার স্বাভাবিক উপস্থিতির প্রশংসা করেন। আবার কেউ একই প্রজন্মের অভিনেত্রী জয়া আহসানের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ওই বয়সের একজন নারীর দেখতে কেমন হওয়া উচিত—যদি তিনি নিজের চেহারার প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল হন।
বাহ্যিকভাবে এটি সৌন্দর্য নিয়ে বিতর্ক মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি ছিল আরও গভীর। এটি সেই দীর্ঘদিনের ক্লান্তিকর সামাজিক ধারণারই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে একজন নারীর চেহারা তার পরিচয়ের একটি অংশ নয়, বরং তার মূল্য নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়। অথচ এই দুই নারী কেউই এমন বিতর্কের অংশ হতে চাননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা চান না।
বিদ্রুপের বিষয় হলো, অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়লেও এখনো অনেক মানুষ নিজেদের প্রসাধনমূলক চিকিৎসার কথা প্রকাশ্যে বলতে চান না। তারা সাধারণত বিষয়টি ব্যক্তিগত রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
যখন কোনো নারী তার চুল স্বাভাবিকভাবে পেকে যেতে দেন, আর সেটিই জনসমক্ষে বিচার-বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে ওঠে—যখন তার মুখ এমন এক আলোচনায় পরিণত হয়, যার রায় দেওয়ার অধিকার মানুষ নিজেরাই নিয়ে নেয়—তখন অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকের চেয়ারে বসার সিদ্ধান্তটি আর নিছক বাহুল্য বলে মনে হয় না; বরং অনেকের কাছে তা আত্মরক্ষার একটি উপায় হয়ে ওঠে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, যখন একজন মানুষের আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় অতিরিক্তভাবে নিজের চেহারা বা অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখনই উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, 'আমরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বাস করছি। এটি আমাদের চিন্তাভাবনা এবং নিজেদের সম্পর্কে ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।'
তার মতে, অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে। কিন্তু যদি কেবল অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য বা অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকার উদ্দেশ্যে কেউ সব সময় তরুণ দেখানোর চাপ অনুভব করেন, তাহলে সেখানেই সমস্যা তৈরি হয়।
ডা. মেখলা বলেন, 'বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন নিয়ে যদি কেউ নিজের ভালো অনুভব করেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তা নিতে পারেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন এমন মানসিকতা থেকে না আসে, যেখানে নিজের সুখ পুরোপুরি অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে।'
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই অ্যাস্থেটিক চিকিৎসাকে অহেতুক বাহুল্য হিসেবে নয়; বরং নিজের যত্ন নেওয়া, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো কিংবা পেশাগত উপস্থাপনার একটি অংশ হিসেবে দেখেন। এই শিল্প মানুষের মধ্যে এসব প্রত্যাশা তৈরি করেনি, তবে সমাজে পরিবর্তিত চাহিদা ও ভোক্তাদের আগ্রহের প্রতিক্রিয়ায় এর দ্রুত বিস্তার ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লিনিকগুলোর প্রচারণা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন নতুন ক্লিনিক গড়ে উঠছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যাও। এই শহরের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষের কাছে এটি এখন কেবল একটি চিকিৎসাসেবা নয়; বরং এই সময়ে, এই শহরে, নিজের শরীরকে ঘিরে জীবনযাপনের স্বাভাবিক বাস্তবতারই অংশ।
