রিফর্ম পার্টি নির্বাচনে জিতলে ভেঙে যেতে পারে যুক্তরাজ্য, প্রস্তুত হচ্ছে কেল্টিক দেশগুলো
যুক্তরাজ্যে রিফর্ম ইউকে দলের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সেইসঙ্গে দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ-এর উত্থান আয়ারল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মতো কেল্টিক জাতিগুলোকে এক অভূতপূর্ব ও বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—ভেঙে যেতে পারে যুক্তরাজ্য।
'একদা-অভাবনীয়' এই আশঙ্কা মাথায় রেখে দিয়ে আগাম রণকৌশল সাজাতে শুরু করেছেন এসব 'কেল্টিক' দেশের নেতারা।
আগামী নির্বাচনে যদি রিফর্ম ইউকে জয়লাভ করে—আর নাইজেল ফারাজ যদি প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা হন—তাহলে সাংবিধানিক সংকটে পড়বে দেশটি। এই আশঙ্কায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন যুক্তরাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে চাওয়া ইউনিয়পন্থি ও ভাঙনকামী জাতীয়তাবাদী উভয়পক্ষের রাজনীতিবিদরা।
উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদেরই আশঙ্কা, ফারাজের নেতৃত্বে সরকার গঠন হলে আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তড়িঘড়ি গণভোটের ডাক আসতে পারে। সেইসঙ্গে শুরু হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধাঁচে ঢালাও অভিবাসন-বিরোধী ধরপাকড়, যা কেল্টিক জাতিগুলোকে আরও দূরে ঠেলে দেবে। এমনকি রিফর্ম পার্টি যদি সরকার না-ও গঠন করতে পারে, শক্তিশালী বিরোধী দল বা জোটসঙ্গী হিসেবে তাদের আত্মপ্রকাশও সমান আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়েলসের সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এজেন্সির কথা উল্লেখ করে বলেন, সহজেই অনুমান করা যায়, 'মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আয়ারল্যান্ড দ্বীপের মানুষ আইরিশ সাগরের ওপারে এমন এক দেশকে দেখবে, যেখানে আইসের মতো স্পেশাল স্কোয়াড রাস্তাঘাট থেকে মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।'
যুক্তরাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার কথা বারবার বলে এসেছেন ড্রেকফোর্ড। কিন্তু এবার তিনি নিজেই শঙ্কিত। তার আশঙ্কা, ব্রিটেনের রাজনীতি চিরতরে বদলে গেছে। নাইজেল ফারাজ যদি ডাউনিং স্ট্রিটে পা রাখেন, অথবা রিফর্ম পার্টি তাদের বর্তমান ৮টির চেয়ে বেশিসংখ্যক সংসদীয় আসন জিতে নেয়—তাহলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেচিন্তে বিতর্ক করার মতো 'সময়টুকুও হয়তো আর পাওয়া যাবে না'।
ড্রেকফোর্ড বলেন, 'যুক্তরাজ্য মূলত চারটি দেশের স্বেচ্ছায় গড়া জোট। আর এমন যেকোনো জোটের ক্ষেত্রেই মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা থাকা উচিত—তারা চাইলে এখানে থাকতে পারে, আবার চাইলে বেরিয়েও যেতে পারে।'
গত সপ্তাহে বেলফাস্টে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যান্ড লেবার পার্টি (এসডিএলপি) আয়োজিত এক সম্মেলনে এসব কথা বলেন ওয়েলসের এই সাবেক লেবার নেতা। সম্মেলনে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতির চাপে পড়ে হয়তো শেষ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের সংযুক্তিকরণ নিয়ে বাধ্য হয়েই গণভোটের পথে হাঁটতে হবে তাদের।
আয়ারল্যান্ডের আইনমন্ত্রী জিম ও'কালাহান বলেন, ইংরেজ জাতীয়তাবাদের ভরসায় হাত গুটিয়ে বসে না থেকে ডাবলিনের উচিত এখন থেকেই একত্রীকরণের প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া।
আইরিশ নেতারা মনে করছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য যুক্তরাজ্যের বার্ষিক বরাদ্দকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে পারেন ফারাজ। এ বরাদ্দের পরিমাণ ৬ থেকে ২০ বিলিয়ন পাউন্ড। ব্রেক্সিটের সময় যেমন প্রচার করা হয়েছিল যে ইইউ-র কারণে যুক্তরাজ্যের প্রতি সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড গচ্চা যাচ্ছে—ঠিক একই কায়দায় এই বরাদ্দকে ইস্যু বানিয়ে এবারও মাঠ গরম করতে পারেন ফারাজ।
এসডিএলপি নেত্রী ক্লেয়ার হানা সুরে বলেন, 'ইংরেজ জাতীয়তাবাদীরা উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য দরকারি সম্পদের খতিয়ান খতিয়ে দেখলে তা নিয়ে যে রাজনৈতিক দড়িটানাটানি শুরু হবে, তা বড় প্রশাসনিক সংকট তৈরি করবে।'
হানা আরও বলেন, 'সাংবিধানিক পরিবর্তন কীভাবে করা উচিত নয়, ব্রেক্সিট তার বড় উদাহরণ। সেই ঘটনার পর থেকে ব্রিটেনের রাজনীতিতে কাঠামোগত বদল এসেছে। দুর্ভাগ্যবশত নাইজেল ফারাজের এই উত্থানকে আর ক্ষণস্থায়ী চমক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি এখন ব্রিটেনের রাজনীতির স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।'
আইরিশ জাতীয়তাবাদী দল সিন ফেন দীর্ঘদিন ধরেই দুই আয়ারল্যান্ডের সংযুক্তিকরণ নিয়ে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে দলটি চায় গণভোটের আগে যেন যথাযথ আলোচনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
সাবেক শিন ফেন অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমান আইরিশ সিনেটর কনর মারফি অনে করেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য দেওয়া বার্ষিক অনুদানের প্রকৃত পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারের কম। তবে তার আশঙ্কা, ফারাজ হয়তো ২০ বিলিয়ন পাউন্ডের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা হিসাবটাকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে পারেন।
মারফি বলেন, 'এটাই তার [নাইজেল ফারাজ] রাজনীতির ধরন। অনেকটা ট্রাম্পের মতো—আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব।'
আয়ারল্যান্ডের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক দল ফিন গেল সম্প্রতি জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরের বার্ষিক সম্মেলনে তারা সংযুক্ত আয়ারল্যান্ড-এর ব্লুপ্রিন্ট প্রকাশ করবে।
আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও ফিন গেল নেতা লিও ভারাদকার অবশ্য মনে করেন না যে ফারাজের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা খুব বেশি। তবে তেমন কিছু যদি সত্যিই ঘটে, তবে আয়ারল্যান্ড খুব দ্রুতই সীমান্ত গণভোটের মুখে পড়তে পারে।
ভারাদকার বলেন, 'রিফর্মের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সরকার ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করতে পারে। ব্রেক্সিট সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়ায় তা ব্যর্থ হয়েছে—এই যুক্তি দেখিয়ে তারা ইইউ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সেইসঙ্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের (ইসিএইচআর) প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে। এই বিষয়গুলোই গোটা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।'
ইংল্যান্ডে ছোট নৌকায় করে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ইতিমধ্যেই ইসিএইচআর থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন নাইজেল ফারাজ। এমনকি এই কনভেনশনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গুড ফ্রাইডে চুক্তি নিয়েও নতুন করে আলোচনা করতে চান তিনি।
যুক্তরাজ্য ও ইইউ নিয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডে একটি সমীক্ষা চালান কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের অধ্যাপক কেটি হেওয়ার্ড ও ডেভিড ফিনিমোর। তাদের ১৫তম সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গেছে, সামগ্রিক যুক্তরাজ্যের (২৯ শতাংশ) তুলনায় উত্তর আয়ারল্যান্ডের মানুষের মধ্যে ইসিএইচআর বাতিলের পক্ষে সমর্থন অনেকটাই বেশি (৩৬ শতাংশ)।
