দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে ছড়াচ্ছে দাবানল, ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন হাজারো মানুষ
এবছরে গ্রীষ্মের শুরুতেই রেকর্ডভাঙা তীব্র দাবদাহের কবলে পড়েছে ইউরোপ। এরমধ্যেই দেখা দিয়েছে আরেক বিপদ–ভয়াবহ দাবানল। দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ভয়াবহ দাবানলে হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, কর্মকর্তারা এই অঞ্চলকে "বারুদের স্তূপ" হিসেবে বর্ণনা করে সতর্কবার্তা জারি করেছেন। এমনকি দাবানলের কারণে বিশ্বখ্যাত সাইক্লিং প্রতিযোগিতা 'ট্যুর ডি ফ্রান্স'-এর একটি পর্বে দর্শকদের উপস্থিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স এবং গ্রিসের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর (৪৯,৫০০ একর) জমি পুড়িয়ে ছারখার করা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন শত শত দমকলকর্মী। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তীব্র বাতাস আগুনকে আরও উসকে দিতে পারে। এছাড়া চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্পেন সীমান্তবর্তী ফ্রান্সের পিরেনিজ পর্বতমালার দুর্গম পাদদেশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রায় ৭০০ দমকলকর্মী। এই দাবানলে ইতিমধ্যেই ৫ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। সেখান থেকে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যরে নুনেজ বলেছেন, "আজ সকালে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।" তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশটির পাঁচটি বিভাগে দাবানল জ্বলছে এবং গত বছরের এই সময়ের তুলনায় চলতি মৌসুমে ফ্রান্সে দ্বিগুণ পরিমাণ ভূমি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পিরেনিজ অঞ্চলের এই দাবানল গতকাল রোববার থেকে আকারে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ট্রেভিলাচ গ্রামের বাসিন্দা প্যাট্রিস বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, "আগুন ঘরবাড়ির ৩০০ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। এটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে তা দেখে আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এটি ছিল স্তম্ভিত করার মতো। চারদিকে প্রায় আতঙ্কের এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।"
মে মাসের অসময়ের একটি তীব্র দাবদাহ এবং জুনের আরেকটি তাপপ্রবাহের পরই এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। জুনের সেই দাবদাহ পশ্চিম ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল, যার ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং বিশাল এলাকার বনভূমি দাবানলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানীদের বৈশ্বিক সংগঠন 'ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন' জানিয়েছে, জলবায়ু সংকট ছাড়া জুনে রেকর্ড করা এই চরম তাপমাত্রা "কার্যত অসম্ভব" ছিল। চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা আবারও বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা কিছু কিছু এলাকায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
পিরেনিজ-ওরিয়েন্টালস অঞ্চলের ফায়ার চিফ (দমকল প্রধান) এরিক বেলগিওনো বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাস্তব, আমরা এর পরিণতি ভোগ করছি। আর এটা তো কেবল জুলাইয়ের শুরু। আগুন নেভানোর লড়াইয়ে থাকা দমকলকর্মীদের জন্য এই মৌসুমটি বেশ দীর্ঘ হতে চলেছে। সবাইকে আমাদের সাহায্য করতে হবে।"
আঞ্চলিক প্রিফেক্ট বা প্রশাসক পিয়েরে রেনল্ট ডি লা মোথে সোমবার স্পেন থেকে ফ্রান্সে প্রবেশ করা পিরেনিজের মধ্য দিয়ে সাইক্লিং প্রতিযোগিতার তৃতীয় পর্যায়ের রুটে ট্যুর ডি ফ্রান্সের দর্শকদের "ফিনিশিং লাইনের কাছাকাছি না যাওয়ার" নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই পর্যায়টি "কেবল রাইডার এবং রেসের জন্য অত্যন্ত জরুরি যানবাহন চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।"
সীমান্তের স্পেন অংশে দাবানল প্রায় ২,২০০ হেক্টর বনভূমি পুড়িয়ে দিয়েছে, যার ৯৭ শতাংশই আবার 'লেস গাভারেস' নামক সুরক্ষিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের। কাতালান ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন প্রধান এডুয়ার্ড মার্টিনেজ জানান, এই আগুনের পরিধি প্রায় ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
দমকলকর্মীরা জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আগুনের সীমানার ভেতরে থাকা অনেক "ধোঁয়াটে হটস্পট"-এর কারণে আগুন নেভানোর কাজ জটিল হতে পারে। তবে রোববার শেষরাতের দিকে তারা ঘোষণা করেন যে, আগুন এখন কিছুটা স্থিতিশীল। তারা আশা করছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এটি পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হবে।
কাতালোনিয়ার দক্ষিণে স্পেনের পূর্বাঞ্চলীয় কাস্তেলন প্রদেশে একটি দাবানল 'সিয়েরা দে এস্পাদান' জাতীয় উদ্যানে ছড়িয়ে পড়ার পর ৫০০-রও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মধ্য পর্তুগালের ভউজিলা এলাকায় গত বৃহস্পতিবার লাগা একটি আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন ১,২০০-রও বেশি দমকলকর্মী। তাদের সহায়তায় রয়েছে প্রায় ৪০০ যানবাহন এবং ১৫টি উড়োজাহাজ। এই আগুন রোববারের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য স্পেন ও ইতালি দমকলকর্মী এবং উড়োজাহাজ পাঠিয়েছে। জরুরি সেবা বিভাগ সোমবার জানিয়েছে, কিছু বিপজ্জনক পকেট বা হটস্পট এখনও রয়ে গেলেও— আগুনের ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। পর্তুগালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুই নেভেস বর্তমান পরিস্থিতিকে "বারুদের স্তূপ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যে ক্রোয়েশিয়ার হভার দ্বীপ এবং আলবেনিয়ার তালে এলাকায় বড় ধরনের দাবানলে শত শত হেক্টর বনভূমি, আঙুর ক্ষেত ও ঝোপঝাড় ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রিস—যা গত মাসের দাবদাহ থেকে অনেকাংশে রক্ষা পেয়েছিল—সেখানে বনের আগুন থেকে সৃষ্ট শিখা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর থেসালোনিকির দুটি কারখানাকে পুড়িয়ে একেবারে ভস্মীভূত করেছে।
ওই কারখানাগুলোর একটি ছিল প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট। আগুন লাগার পর সেখান থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে গ্রিক কর্তৃপক্ষ থেসালোনিকির তিনটি শহরতলির বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য উচ্ছেদ সতর্কবার্তা জারি করেছে। পাশাপাশি শহরের একাংশের বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকতে এবং দরজা-জানালা বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া রোববার বিকেলে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের পশ্চিমে আরেকটি বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। মান্দ্রা অঞ্চলের পাইন বনে লাগা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে ২১০ জন দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যাদের সহায়তায় রয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক দল, বিশেষায়িত টিম এবং ২৯টি উড়োজাহাজ।
