গাজায় নিজেদের শাসন কাঠামো ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা হামাসের
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে চলা তাদের শাসন কাঠামোর বিলুপ্তি ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ এই অঞ্চলে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি টেকনোক্র্যাট (পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত) কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম হলো।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে হামাসের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে, ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ের পর, ২০০৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহর কাছ থেকে এক লড়াইয়ের মাধ্যমে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল হামাসের প্রতিরোধ যোদ্ধারা। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তারা অঞ্চলটি শাসন করে আসছিল।
গত বছরের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে গাজায় একটি "যুদ্ধবিরতি" কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামাস বারবার বলে আসছিল, তারা গাজার দৈনন্দিন শাসনভার থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তবে গোষ্ঠীটির অস্ত্র সমর্পণ বা নিরস্ত্রীকরণের জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়টি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস থেকে সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা তার পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার এবং জরুরি কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পদক্ষেপ মূলত চলমান ব্যবস্থার প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন, পূর্ব-সম্মত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে সহজতর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।"
হামাসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত একটি পরিকল্পনার আওতায়, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন তদারকি করার জন্য গঠিত 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা' (এনসিএজি) বা গাজা প্রশাসন বিষয়ক জাতীয় কমিটির দ্রুত গাজায় প্রবেশ কামনা করছেন তারা।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, "হামাস এই নতুন পদক্ষেপটি নিয়েছে যাতে গাজা উপত্যকার দায়িত্বে তারা আর না থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো দখলদার বাহিনীর সব ধরনের অজুহাত উচ্ছেদ করা, যারা এখনো তাদের আগ্রাসন এবং (ফিলিস্তিনিদের) নির্মূলের যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে।"
তবে হামাসের আরেক কর্মকর্তা মাহমুদ জোর দিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে হামাস গাজায় তাদের রাজনৈতিক বা সামরিক ভূমিকা ত্যাগ করছে। বরং তারা মূলত "গাজার প্রত্যক্ষ বেসামরিক সরকার পরিচালনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।"
অবশ্য হামাসের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন এনসিএজি-এর প্রধান।
কমিটির প্রধান আলী শাথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "আমরা নিশ্চিত করছি যে, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই (এনসিএজি) তার জাতীয় দায়িত্ব বুঝে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।"
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত 'বোর্ড অব পিস ফর গাজা' (গাজা শান্তি বোর্ড) এনসিএজির কাজকর্ম তদারকি করবে। পিস বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, এই সিদ্ধান্তটি "ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার (রোডম্যাপ) আলোচনাকে একটি সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে।"
তিনি বলেন, "এটি হলো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্যবর্তী একটি সেতু।"
ম্লাদেনভ উল্লেখ করেন, বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বাকি শর্তাবলীর বিষয়ে একবার ঐকমত্য তৈরি হলে এনসিএজি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে।
অবরুদ্ধ গাজায় এই কমিটির প্রবেশের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আপত্তির কারণে গত কয়েক মাস ধরে এনসিএজির কার্যক্রম গাজার বাইরে থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল।
ইসরায়েল গাজায় হামাসের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা এই মুহূর্তে অধিকৃত পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সরাসরি গাজার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে।
