জুনে বড় উল্লম্ফন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ০.৫৮% কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলার
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক উল্লম্ফন দেখা গেলেও তা পুরো বছরের ঘাটতি কাটিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যথেষ্ট ছিল না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ সাময়িক তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বাংলাদেশ ৪.২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই আয় গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। জুনের এই শক্তিশালী উল্লম্ফন সত্ত্বেও অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক রয়ে গেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রপ্তানি পরিস্থিতি বেশ মন্থর ছিল। এই সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছিল ৪৩.৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৫ শতাংশ কম। বিশ্ববাজারে চাহিদার মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কারণে বছরের বড় একটি সময় রপ্তানি খাত চাপের মুখে ছিল।
সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বছর শেষে প্রকৃত আয় এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া এবং সামগ্রিক আয় কিছুটা কমলেও জুনের প্রবৃদ্ধি রপ্তানিকারকদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। জুনের এই গতি ২০২৬-২৭ নতুন অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানিকারকদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে এবং একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেবে।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত গত জুন মাসে ২১.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ মাসে এ খাত থেকে ৩.৩৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২.৭৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে ১৯.৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ২৪.০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে।
এদিকে, গত জুন মাসে নিটওয়্যার খাতে ১৯.৪৯ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ২১.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাকে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বলতে নারাজ নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
তিনি জানান, এই প্রবৃদ্ধি মূলত ঈদুল আযহার ছুটির সময়ের পার্থক্যের কারণে হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় এ বছর জুনে কারখানাসমূহ ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কর্মদিবস পেয়েছে। অর্থাৎ, এই প্রবৃদ্ধি রপ্তানি আদেশ বাড়ার কারণে নয়, বরং বেশি দিন কাজ করার ফলে হয়েছে।
জুনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিটওয়্যার রপ্তানি ২.৫৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিকেএমইএ সভাপতির মতে, বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়াই এই ধসের প্রধান কারণ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি ৯ শতাংশ, সুতার দাম ১০ শতাংশ, রং ও রাসায়নিকের দাম ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ এবং জ্বালানিসহ অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে না।
ফজলে শামীম এহসান আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং লোকসানের ভার সইতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত জুন মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪৭.৬৮ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে আয় ১.২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বার্ষিক ৭.০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে জুন মাসে ৭৬.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। বছর শেষে এ খাতে মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮৩.৬৯ মিলিয়ন ডলারে। এছাড়া হোম টেক্সটাইল খাতে জুনে ৫৯.৯৫ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্যে ৪৪.৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় জুন মাসে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ৪৬.৭৭ শতাংশ।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে ৯.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪.০৯ শতাংশ বেশি। জুন মাসেও দেশটিতে রপ্তানির ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রপ্তানি গন্তব্যের প্রতিটিতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এটি বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশের বাজার বহুমুখীকরণের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইপিবি আশা প্রকাশ করেছে যে, জুন মাসের এই ইতিবাচক ধারা এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে, যা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
