ইউক্রেন থেকে ইরান: যুদ্ধ আবারও তেলের ধাক্কা দিচ্ছে—আরেকটি মূল্যস্ফীতির ঝড়ের জন্য কি প্রস্তুত বাংলাদেশ?
চার বছর ধরে বাংলাদেশ চেষ্টা করে যাচ্ছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে। সেই সংকটই দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে পরিণত করেছিল বাংলাদেশকে।
এখন আরেকটি ভূরাজনৈতিক ধাক্কা জোরালো হয়ে উঠছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের দশম দিনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই চাপের মুখে থাকা দেশের অর্থনীতিতে এতে নতুন করে আরেকটি মূল্যস্ফীতির ঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির অস্বস্তিকর বিদ্রূপ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের এই উত্তেজনা এমন এক সময় তীব্র হয়ে উঠছে যখন নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং যখন মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমতে শুরু করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। তারপরও এটি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও, দীর্ঘদিনের মূল্যবৃদ্ধির গতি হয়তো ধীর হতে শুরু করেছে—এমন একটি ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল।
কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ তথ্য দেখাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি এখনও কতটা অস্থির। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা গত দশ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আরও উদ্বেগজনক হলো, খাদ্য মূল্যস্ফীতি—যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করে—তা বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য এই চাপ এখন কাঠামোগত রূপ নিচ্ছে। মজুরি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশে, যার অর্থ টানা ৪৮ মাস ধরে আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
আজ সোমবার (৯ মার্চ) লেনদেন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট-এর নিকটতম মেয়াদের ফিউচার ৩০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৬৭ ডলারে উঠেছে।
এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা। বিশ্বে প্রতিদিন সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইতোমধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তেল উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এমন ধাক্কা খুব কমই দূরের ভূরাজনৈতিক খবর হয়ে থাকে। তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর আগেই দেশের বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে তেল কেনার হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। এই ঘটনা দেখিয়েছে যে সরকারি আশ্বাস বা রেশনিং ব্যবস্থা জনমানুষের উদ্বেগ খুব একটা কমাতে পারেনি।
বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার—দুটোরই বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে: পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়, সার ও সেচের খরচ বাড়ে, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত এই চাপ খাদ্যবাজার ও ভোগ্যপণ্যের দামে গিয়ে পড়ে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বৈশ্বিক তেলের বাজারের ধাক্কা নীরবে মানুষের রান্নাঘর অবদি পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশ এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যায়, ফলে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায় এবং কয়েক বছর ধরে তা উচ্চ অবস্থানেই থেকে যায়। বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তখনকার চেয়েও বেশি ভঙ্গুর।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টানা সপ্তম মাসের মতো পণ্য রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ শতাংশে। এমনকি সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ-ও পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারেনি। তাদের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাসিক ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি এবং মধ্যবর্তী সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে আর্থিক চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
টাকার ওপর চাপও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তা ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২২ দশমিক ৫ টাকা। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে থাকলে টাকার আরও অবমূল্যায়ন— আমদানি বিল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে; যার প্রভাব পুরো দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
এটি মুদ্রানীতির জন্যও কঠিন দ্বিধা তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে বেশি থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে নীতি শিথিল করার খুব বেশি সুযোগ নেই। আবার আর্থিক শর্ত আরও কঠোর করা হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আরেকটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যস্ফীতির ঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন পথ কত দ্রুত স্থিতিশীল হয় তার ওপর। তবে বাজার থেকে যে প্রাথমিক সংকেত আসছে, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
বাংলাদেশ এমন একটি ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার নেই। আর আগামী কয়েক মাসে দেশের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা যেমন পরীক্ষার মুখে পড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের ধৈর্যও বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।
