ইরানে হামলা বাড়ানো নিয়ে ভ্যান্স ও জেনারেল কেইনের উদ্বেগ, বোমাবর্ষণে সাময়িক বিরতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত বা তীব্র করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার সময় তারা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত একটি সূত্র এবং মার্কিন এক কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাতভর হামলা চালানোর পর শুক্রবার রাতে ইরানে বোমাবর্ষণ অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)-এর একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, এই মুহূর্তে সামরিক অভিযানগুলো "স্থগিত রাখা হয়েছে"।
সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, শুক্রবারের বৈঠকে জেনারেল কেইন বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া এবং সংঘাত বাড়ানোর সম্ভাব্য অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তোলেন। একটি সূত্র জানায়, কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেন—মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের সামনে থাকা বিকল্প অনুযায়ী হামলা চালিয়ে সফল হতে পারবে, তবে এর ফলে যেসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন।
উভয় সূত্রই জানিয়েছে, বৈঠকে ট্রাম্পের সামনে যেসব বিষয় বা আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল, তার মধ্যে গোলাবারুদের [মূলত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র, নির্ভুল লক্ষ্যভেদে সক্ষম বোমা ইত্যাদি] মজুতজনিত উদ্বেগটি ছিল অন্যতম।
তবে এই মজুত নিয়ে উদ্বেগ কিংবা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার এ সতর্কবার্তাই টানা রাত্রিকালীন হামলা বন্ধের মূল কারণ কি না, অথবা আগামীতে এই স্থগিতাদেশ বজায় থাকবে কি না—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর স্টিভেন চেওয়াং বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময়ই বলে আসছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করেন। তবে হরমুজ প্রণালিতে বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরান যদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তাহলে আমাদের হাতে সব ধরনের সামরিক বিকল্পের পথ খোলা রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "ইরানের বারবার আগ্রাসনের জবাবে দেশটির সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টানা ১৩ দিনের হামলা এবং দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া কার্যকর নিষেধাজ্ঞার পর, এখন ইরানের জন্য আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায় কী হতে পারে, তা তারা ভালো করেই জানে।"
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের কার্যালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে সিএনএন।
সিএনএন এর আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং ইরানে হামলা অব্যাহত থাকলে এই মজুতের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
শুক্রবার মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তিনি এটাও বলেন যে, সামরিক বাহিনী চাইলে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখতে পারে কিংবা "হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে" পারে। তাঁর দাবি, চলতি আলোচনায় ইরানকে এখন "আরও গম্ভীর ও আন্তরিক" মনে হচ্ছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের মতে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভাব্য হামলা বা যুদ্ধের মাত্রা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। সূত্রটি আরও জানায়, উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথনে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে; তবে তারা এ-ও স্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে, যা ব্যবহার করে তারা চাইলে এই সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এমনকি চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার কথা বললেও, গোপনে তিনি তার সহযোগীদের "আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার" নির্দেশ দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের মতে, এটি প্রমাণ করে—মার্কিন সেনা মাঠে না নামিয়ে কীভাবে সীমিত আকারের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাস্তবে কতটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।
একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয় বা পেন্টাগনের খুব কম কর্মকর্তাই বিশ্বাস করতেন যে সংঘাত বাড়ানোর এসব বিকল্প ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারবে।
সিএনএন আগেও এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর আগেই জেনারেল কেইনসহ শীর্ষ সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, [ইরানের বিরুদ্ধে] দীর্ঘমেয়াদী কোনো সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতে টান ফেলতে পারে।
সিএনএন-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, "আমেরিকান সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী। প্রেসিডেন্টের পছন্দমতো স্থান ও সময়ে যেকোনো মিশন বাস্তবায়নে যা যা প্রয়োজন, তা সবই আমাদের রয়েছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত ও গভীর সক্ষমতা নিশ্চিত রেখেই আমরা বিভিন্ন কমব্যাটেন্ট কমান্ড জুড়ে বহু সফল অভিযান পরিচালনা করেছি।"
