শীতলক্ষ্যার ঘাট থেকে কলকাতার বরফঘর: সাম্রাজ্যের গরম, আমদানি করা শীত আর এক বিস্মৃত ইতিহাস
নারায়ণগঞ্জের খানপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে যে রাস্তাটি হাজীগঞ্জের দিকে চলে গেছে, সে পথ ধরে খানিকটা এগোলেই বাঁয়ে চোখে পড়ে ডিসির দৃষ্টিনন্দন বাংলো। কুমুদিনীর সীমানা সেখানে শেষ হয়েছে, তা পার হয়ে আরেকটু সামনে গেলেই বাঁয়ে একটি জায়গা। নাম তার বরফকল। এখানে খেয়াঘাট, নৌকার আনাগোনা, নদীর বাতাস আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু নামটি কেমন যেন অন্য সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় প্রবীণদের মুখে শুনতাম, ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকে নাকি সেখানে সত্যিই একটি বরফকল ছিল। শীতলক্ষ্যার পানি জমিয়ে তৈরি সেই বরফ জাহাজে তুলে পাঠানো হতো ব্রিটেনে। গল্পটির পক্ষে কোনো দলিল নেই। ইতিহাসও নিশ্চুপ। তবু লোকশ্রুতির নিজস্ব জীবন থাকে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ কর্তা ও নবাবদের প্রয়োজনে পূর্ববাংলা, কলকাতায় ও ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে বরফ তৈরি কারখানা তৈরি হয়েছিল। তার সঙ্গে এই বরফকলের কোনো যোগসূত্র ছিল কিনা, তা অজানাই থেকে গেছে।
আরেকটি গল্পও শোনা যেত। ইংল্যান্ড থেকে একদল নামকরা পানি বিশেষজ্ঞ নাকি এসেছিলেন শীতলক্ষ্যার পানি পরীক্ষা করতে। তারা ইংরেজ শাসিত হিন্দুস্তানের নানা অঞ্চলের পানি পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। শীতলক্ষ্যার পানিতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা দিয়ে উৎকৃষ্ট সোডা ওয়াটার তৈরি করা সম্ভব। এরপর নাকি নিয়মিত সেই পানি জাহাজে ভরে পাঠানো হতো ইংল্যান্ডে (তবে এটা সম্ভবত কলকাতাতে পাঠানো হতো, বেশিরভাগ ইংরেজ কর্মকর্তাদের বাস ছিল ওখানেই। সোডা পানির ব্যবহার ভারতে মোগল আমল থেকেই ছিল। সল্টপিটার ব্যবহার করে পানি শীতল রাখার পদ্ধতির প্রয়োগ ছিল মোগল শাসকদের মধ্যে)। আর সেই পানি দিয়েই তৈরি হতো সাহেবমেমদের তৃপ্তিদায়ক সোডা ওয়াটার।
এই লোকশ্রুতির সত্য-মিথ্যা জানা নেই। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন এক ঘটনাও আছে, যা শুনলে এই লোককথাগুলোও খুব অসম্ভব বলে মনে হয় না।
কারণ, এমন এক সময় ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের হ্রদের জমাট বরফ কেটে জাহাজে তোলা হতো। সেই বরফ চার মাস সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছাত কলকাতা বন্দরে। আর তা দিয়ে ঠান্ডা করা হতো ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের পানীয়, খাবার এবং গ্রীষ্মে ক্লান্ত শরীর। প্রকৃতির এক প্রান্তে জন্ম নেওয়া শীতলতা, বাণিজ্যের হাত ধরে পৌঁছে যেত পৃথিবীর আরেক প্রান্তের দহনজ্বলা গ্রীষ্মে।
এ এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে বরফ ছিল কারও কাছে বিলাসিতা, কারও কাছে বিপুল মুনাফার ব্যবসা, আর কারও কাছে ছিল কেবল দূর থেকে তাকিয়ে দেখার দীর্ঘশ্বাস। এক টুকরো বরফ তখন শুধু বরফ ছিল না; তা ছিল সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য, প্রযুক্তির বিস্ময় এবং ঔপনিবেশিক বৈষম্যের দৃশ্যমান প্রতীক। মেমসাহেবদের সেই বরফ-শীতল পানীয় নিয়ে মাতামাতি দেখতে দেখতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দেশি বাবাও হয়তো সেদিন সন্তানের কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, 'দেখিস, একদিন আমরাও...'।
ঔপনিবেশিক ইতিহাসে আমরা সাধারণত যুদ্ধ, বিদ্রোহ, কর, বাণিজ্য কিংবা রেলপথের কথা শুনি। কিন্তু বরফের ইতিহাসও ছিল সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অংশ। শুধু অংশ নয়, এটি ছিল সাম্রাজ্যের মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি। ব্রিটিশরা হিন্দুস্তান শাসন করতে পেরেছিল। কিন্তু এই জমিনের গ্রীষ্মকে জয় করতে পারেনি।
অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশরা যখন হিন্দুস্তানে নিজেদের শাসন সুসংহত করছিল, তখন এই দেশের দীর্ঘ, আর্দ্র এবং নির্মম গ্রীষ্ম তাদের প্রায় অসহায় করে তুলেছিল। ইউরোপের মৃদু আবহাওয়ায় অভ্যস্ত মানুষের কাছে উপমহাদেশের গ্রীষ্ম ছিল প্রায় শাস্তির গরম চাবুক।
গরম শুরু হলেই অনেকেই পাহাড়ে চলে যেতেন। সিমলা, দার্জিলিং কিংবা নৈনিতাল হয়ে উঠেছিল এক অর্থে সাম্রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। কিন্তু সবাই তো আর পাহাড়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না। কলকাতা, বোম্বে কিংবা মাদ্রাজের মতো শহরে আটকে পড়া কর্মকর্তাদের কাছে গ্রীষ্ম মানে টানা দুর্ভোগ।
'প্লেইন টেলস অব দ্য রাজ'-এ রেজিনাল্ড স্যাভরি নামের এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা লিখেছিলেন, বাতাস থেমে যায়। সূর্যের তীব্রতা আরও বাড়ে। ছায়াগুলো কালো হয়ে আসে। তখনই বুঝতে পারবে সামনে পাঁচ মাসের নিখাদ শারীরিক যন্ত্রণার সময় ঘনিয়ে আসছে।
এই গরমের সাথে লড়াই করার জন্য ব্রিটিশরা নানা কৌশল বের করেছিল। তারা ভেজা কাপড় পরে ঘুমাতেন। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা কাপড় শরীরে জড়িয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করতেন। উত্তর ভারতের নদী অঞ্চল থেকে বরফ এনে সমতলে পাঠানো হতো বিপুল ব্যয়ে।
'আব-দার' নামে বিশেষ কর্মচারী রাখা হতো। আজকের দিনের ভাষায় আবদারকে পানীয়-পরিচারক বা beverage steward কিংবা cup-bearer বলা যায়। এই ধারণার শিকড় ছিল পারস্যের দরবারি সংস্কৃতিতে; মোগল আমলে তা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজদরবারে একটি প্রতিষ্ঠিত পদে পরিণত হয়।
আব-দারের দায়িত্ব ছিল সল্টপিটার অর্থাৎ পটাশিয়াম নাইট্রেট (Potassium nitrate, KNO₃) নামের একটি প্রাকৃতিক খনিজ লবণ ব্যবহার করে পানি ও ওয়াইন ঠান্ডা রাখা। গরম থেকে বাঁচতে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিরও শেষ ছিল না। আমাদের উপমহাদেশে ঘরের জানালা ও দরজায় খাসখাস ঘাসের তৈরি ভেজা পর্দা ঝুলিয়ে রাখা হতো। গরম বাতাস সেই ভেজা পর্দার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করার সময় বাষ্পীভবনের কারণে কিছুটা শীতল হয়ে ঘরে ঢুকত।
একই নীতির আরও উন্নত ব্যবহার আজও দেখা যায় ইরানে। দেশটির শুষ্ক আবহাওয়ায় বহু বাড়িতে ব্যবহৃত হয় বাষ্পীভবনভিত্তিক কুলার (Evaporative Cooler)। ধাতব কাঠামোর চার পাশে পুশাল অর্থাৎ খড়, তৃণ বা কাঠের সরু সরু তন্তু দিয়ে তৈরি প্যাড বসানো হয়। তার ওপর অবিরাম পানি পড়তে থাকে। বাইরে থেকে আসা গরম বাতাস সেই ভেজা পুশালের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় পানির বাষ্পীভবনের কারণে ঠান্ডা হয়ে যায়।
এরপর একটি পাখা সেই শীতল বাতাস ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়। অনুভূতিটা অনেকটা বৃষ্টির পর বয়ে আসা শীতল হাওয়ার মতো। তবে বাংলাদেশের মতো আর্দ্র দেশে এই প্রযুক্তি কাজ করবে না। কারণ, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় পানি সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না; ফলে বাতাস খুব একটা ঠান্ডা না হয়ে বরং ঘরের ভেতর ভেজা ভেজা ভাব বাড়িয়ে দেয়।
অতীতের ইংরেজ শাসনের দিনগুলোতে উত্তর ভারতের দিল্লি, আগ্রা ও আশপাশের কয়েকটি অঞ্চলে শীতকালে কৃত্রিমভাবে বরফ তৈরির চেষ্টা করা হতো। এ জন্য মাটির নিচে বিশেষ বরফগর্ত বা বরফখানা নির্মাণ করা হতো। শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে অগভীর মাটির পাত্রে পানি রেখে দেওয়া হতো। ভোরের আগে তাতে জমে ওঠা পাতলা বরফের স্তর সাবধানে তুলে সেই বরফগর্তে জমা করা হতো। তবে এভাবে তৈরি বরফ ছিল পাতলা, অস্বচ্ছ ও তুলনামূলকভাবে অপরিষ্কার। মানের দিক থেকে তা পরবর্তীকালে ম্যাসাচুসেটসের হ্রদ থেকে আমদানি করা স্বচ্ছ ও শক্ত বরফের ধারেকাছেও ছিল না।
ঠিক এমন সময় আবির্ভাব ঘটে বোস্টনের তরুণ উদ্যোক্তা ফ্রেডেরিক টিউডরের। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যরা যেখানে অসম্ভব দেখতেন, সেখানে ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে পেতেন। তার স্বপ্ন ছিল নিউ ইংল্যান্ডের হ্রদ থেকে জমাট বরফ কেটে হাজার হাজার মাইল দূরের উষ্ণ দেশগুলোতে বিক্রি করা। আজকের দিনে কথাটি শুনে খুব একটা বিস্ময় জাগে না। কারণ, আমাদের ঘরে ঘরেই ফ্রিজ। কিন্তু উনিশ শতকের গোড়ার দিকে, যখন কৃত্রিমভাবে বরফ তৈরির প্রযুক্তিই ছিল না, তখন তার এই পরিকল্পনা অধিকাংশ মানুষের কাছে নিছক কল্পনা কিংবা পাগলামি বলে মনে হয়েছিল।
মানুষ বিশ্বাসই করত না যে মাসের পর মাস সমুদ্রযাত্রার পরও বরফ টিকে থাকতে পারে। টিউডরকে নিয়ে হাসাহাসি হয়েছিল বিস্তর। তিনি দেউলিয়াও হয়েছিলেন। আবহাওয়ার কারণে লোকসান হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বন্ধুরা তাকে ব্যর্থ স্বপ্নবাজ বলেছেন। তবুও তিনি থামেননি।
তার প্রথম বরফবাহী জাহাজ যখন ক্যারিবীয় সাগরের ফরাসি উপনিবেশ মার্টিনিকের উদ্দেশে রওনা দেয়, তখন অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করত না যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এক দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই সব বরফ গলে যাবে না। বোস্টনের বোস্টন গেজেট তাই ব্যঙ্গ করে লিখেছিল, 'রসিকতা নয়, রসিকতা নয়। আশি টন বরফ নিয়ে একটি জাহাজ যাত্রা করেছে। আমরা আশা করি, এই বিনিয়োগ খুব বেশি পিচ্ছিল প্রমাণিত হবে না।'
ব্যঙ্গের আড়ালে ছিল অবিশ্বাস। সেই অবিশ্বাসকেই কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসায়িক সাফল্যে পরিণত করেছিলেন ফ্রেডেরিক টিউডর। কিন্তু ইতিহাসের মজা হলো, অনেক সময় বিদ্রুপের লক্ষ্যই পরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে।
ফ্রেডেরিক টিউডর ধীরে ধীরে বরফ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের কৌশল আয়ত্ত করেন। শীতকালে ম্যাসাচুসেটসের হ্রদ থেকে বিশাল বিশাল বরফের চাক কেটে আনা হতো। সেগুলো কাঠের গুঁড়োর মধ্যে সংরক্ষণ করা হতো, কারণ, কাঠের গুঁড়ো তাপ নিরোধক হিসেবে অসাধারণ। এরপর দুই স্তরের কাঠের পাত্রে ভরে জাহাজের গহ্বরে রাখা হতো।
ইংরেজ শাসনাধীন হিন্দুস্তানের দিকে নজর দেওয়ার আগেই তিনি নিউ অরলিন্স এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে সফল বাজার তৈরি করেছিলেন। এরপর তার দৃষ্টি গেল উপমহাদেশটির দিকে।
১৮৩৩ সালে তিনি কলকাতার উদ্দেশে পাঠালেন তার প্রথম জাহাজ। ম্যাসাচুসেটসের হ্রদ থেকে কেটে আনা ১৮০ টন বিশুদ্ধ বরফ সেই জাহাজে তোলা হয়েছিল। বরফের চারপাশ মোটা করে ভরে দেওয়া হয়েছিল করাতকলের কাঠের গুঁড়া। একই সঙ্গে জাহাজে তোলা হয়েছিল নিউ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বাল্ডউইন আপেলের একাধিক ব্যারেল। শক্ত শাঁস আর দীর্ঘদিন ভালো থাকার ক্ষমতার কারণে এই আপেল ছিল সে সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য রপ্তানি পণ্য। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস ছিল, বরফ গলে গেলেও আপেল অন্তত খদ্দের পাবে। তাই সেই জাহাজে পাশাপাশি যাত্রা করছিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বপ্ন—একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যের, অন্যটি ইতিহাস বদলে দেওয়ার।
চার মাসের সমুদ্রযাত্রার পর ১৮৩৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর টাসকানি নামের জাহাজ কলকাতা বন্দরে এসে ভিড়ল।
কলকাতা তখন বিস্ময়ে অভিভূত। মানুষ ভিড় করল ঘাটে। এই অদ্ভুত বিদেশি জিনিস দেখতে সবাই ছুটে এল। শোনা যায়, একজন কলকাতাবাসী জানতে চেয়েছিলেন, মার্কিন মুলুকে কি গাছে গাছে বরফ-ফল ধরে? আরেকজন বরফের ওপর কয়েক মিনিট হাত রেখে পরে হাতে ফোসকা পড়ে গেলে চিৎকার করে বলেছিলেন, আগুনের মতো এটি তাকে পুড়িয়ে দিয়েছে।
দ্য ইংলিশম্যান পত্রিকার সম্পাদক জে এইচ স্টকুয়েলার ঘুমিয়ে ছিলেন। তার এক কর্মী দৌড়ে গিয়ে খবর দিলেন, বিস্ময়কর এক জিনিস এসেছে বন্দরে। পরে তিনি বরফের একটি টুকরা নিয়ে ফিরছিলেন, কিন্তু কাপড়ে মুড়ে না রাখায় বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেটি প্রায় পেরেকের মতো সরু হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে কিছু ভারতীয় ক্রেতা বরফ দ্রুত গলে যেতে দেখে টাকা ফেরতও চেয়েছিলেন।
তবুও ব্যবসা থামেনি। বরং বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছিল। খুব দ্রুত কলকাতার বাইরে মাদ্রাজ এবং বোম্বেতেও বরফের বাজার ছড়িয়ে পড়ে। বরফের সাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নিউ ইংল্যান্ডের আপেল। মার্কিন মাখন এবং আরও নানা পণ্য। সরকারি করছাড় এবং একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা ফ্রেডেরিক টিউডরের ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজের রাস্তায় একের পর এক বিশাল বরফঘর গড়ে উঠতে থাকে।
এই সাফল্যের কথা পৌঁছে যায় যুক্তরাষ্ট্রেও। লেখক হেনরি ডেভিড থোরো তার 'ওয়ালডেন' গ্রন্থে লিখেছিলেন, ফলে আজ চার্লসটন, নিউ অরলিন্স, মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতার প্রচণ্ড গরমে বসবাসকারী মানুষেরাও আমার সৃষ্টি করা উৎস থেকেই শীতল পানীয়ের সুবিধা পাচ্ছে।
ফ্রেডেরিক টিউডর হয়ে উঠলেন 'বরফ রাজ' বা 'আইস কিং'। পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি উনিশ বছরের এক তরুণীকে বিয়ে করেন এবং পরে ছয় সন্তানের জনক হন।
কিন্তু এই বরফের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ব্রিটিশদের ব্যক্তিগত ক্লাবগুলো। এসব ক্লাব ছিল উপনিবেশের মধ্যে ছোট ছোট ব্রিটেন। ইউনিফর্ম পরা পরিবেশকেরা সেখানে রোস্ট গরুর এবং সেদ্ধ খাসির গোশত পরিবেশন করতেন। বরফঘর নির্মাণে এসব ক্লাব বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। ফলে তাদের খাবার টেবিলে ঠান্ডা পানীয়, সংরক্ষিত গোশত এবং ইউরোপীয় স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিল না।
১৮৪০ সালের গরম শুরুর আগেই বোম্বের বাইকুলা ক্লাব চল্লিশ টন বরফ সরবরাহের অর্ডার দিয়েছিল।
বরফ তখন শুধু বিলাসিতা নয়, ওষুধও। জ্বর, পেটের রোগ, এমনকি কিডনির সমস্যার চিকিৎসাতেও বরফ ব্যবহার করা হতো। জাহাজ দেরি করলে দেখা দিত তথাকথিত বরফ দুর্ভিক্ষ। তখন সীমিত পরিমাণ বরফ বিক্রি করা হতো। অতিরিক্ত বরফ কিনতে হলে চিকিৎসকের সনদ লাগত। ১৮৫০ সালের এক বরফ সংকট বোম্বেতে এতটাই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল যে টেলিগ্রাফ অ্যান্ড কুরিয়ার পত্রিকা আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছিল।
তবে এই গল্পের অন্য দিকও ছিল। নিউ ইংল্যান্ডের বরফ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের জন্য আশীর্বাদ হলেও অধিকাংশ হিন্দুস্তানিদের জন্য সে ছিল আরেকটি বোঝা। অধিকাংশ মানুষের পক্ষে এই শীতল বিলাসিতা কেনা সম্ভব ছিল না। অথচ বরফঘর নির্মাণ ও সম্প্রসারণের টাকাকড়ির একটি অংশ আসত কর থেকে। শেষ পর্যন্ত যার বোঝা বইতে হতো ভারতীয়দেরই। একই সাথে বরফ ব্যবসা আব-দারদের কাজও কমিয়ে দিয়েছিল। যারা বছরের পর বছর পানি ঠান্ডা রাখার কাজ করতেন, তারা ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন।
ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল। প্রথম বরফের চালান দেওয়া হয়েছিল পারসি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেহাঙ্গির নুসেরওয়ানজি ওয়াদিয়ার কাছে। তারাই পরে ব্রিটিশদের মধ্যে সেই বরফ বিতরণ করেছিল। স্যার জামসেতজি জিজিভয় ছিলেন আরেকজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। এই ধনী পারসি ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবীই প্রথম বিশাল জনসমাবেশে আইসক্রিম পরিবেশন করেছিলেন। অতিথিরা আনন্দ করে তা খেয়েছিলেন।
কিন্তু কয়েক দিন পর বোম্বে সমাচারের লেখায় বিদ্রুপের চাবুক দাগানো হয়। কটাক্ষ করে সেদিন লেখা হয়েছিল, বিদেশি এই খাবার খাওয়ার দুঃসাহস দেখানোর যথাযথ শাস্তি হিসেবেই সবাই সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
১৮৬০ সালের মধ্যে কলকাতায় বরফ আর কেবল ধনীদের বিলাসপণ্য ছিল না। ধীরে ধীরে তা শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল। ব্রিটিশ শিল্পী কোলসওয়ার্দি গ্রান্ট তার মাকে লেখা এক চিঠিতে লিখেছিলেন, 'অভ্যাসের কারণে বরফ এখন প্রায় বিলাসপণ্যের মর্যাদা হারিয়েছে।' তবে একটি দৃশ্য তাকে এখনো আনন্দ দিত। ছোট ছোট শিশুরা বরফকে মিষ্টির মতো চুষে খেত। প্রথমবার হাতে নিয়ে বিস্ময়ে বলত, 'এতে তো হাত পুড়ে যাচ্ছে!' শীতলতার এমন তীব্র অনুভূতি তাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বিস্ময়ও মিলিয়ে যেত। যে বরফ একসময় ছিল বিরল কৌতূহলের বস্তু, তা-ই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল নিত্যদিনের পরিচিত সাথি।
১৮৬০-এর দশক পর্যন্ত ফ্রেডেরিক টিউডরের বরফ ব্যবসার ওপর শক্ত দখল ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই দখল দুর্বল হতে শুরু করে। নতুন রেলপথের দূষণে ম্যাসাচুসেটসের হ্রদগুলোর আকর্ষণ কমে যায়। একই সময়ে বেঙ্গল আইস কোম্পানির মতো কৃত্রিম বরফ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাজার করে নেয়। রেলপথের বিস্তারও ভারতের ভেতরে বরফের চালান পাঠানোর কাজ সহজ করে দেয়।
আজ বরফের সেই সমুদ্রযাত্রার গল্প প্রায় রূপকথার মতো শোনায়। উপহাদেশের একটু সচ্ছল পরিবারের ফ্রিজে আজ কুলফি জমে থাকে, রেফ্রিজারেটরের তাকে সাজানো থাকে নানা ঠান্ডা পানীয়। কিন্তু চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছে এখনো দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো বরফঘর। একসময় সেখানে সংরক্ষিত হতো নিউ ইংল্যান্ডের বরফ। পরে সেখানে থেকেছেন একজন উচ্চ আদালতের বিচারক, কিছু দরিদ্র শিক্ষার্থী এবং স্বামী বিবেকানন্দ। আজ সেটির নাম বিবেকানন্দ হাউস।
ফ্রেডেরিক টিউডরের নাম আজ হয়তো বিস্মৃতির আড়ালে। কিন্তু তার বরফবাহী জাহাজের গল্প ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অভিযানের গল্প হয়ে বেঁচে আছে। এমন এক সময়ে, যখন বিদ্যুৎ ছিল না, রেফ্রিজারেটর ছিল না। তখন তিনি প্রমাণ করেছিলেন—দূরত্ব সব সময় বাধা নয়, কল্পনাই পারে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে। তাই এই গল্প শুধু বরফের নয়; এটি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের, বিশ্ববাণিজ্যের উত্থানের, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির এবং সেই সময়ের সামাজিক বৈষম্যেরও এক জীবন্ত দলিল।
আর সেই কারণেই নারায়ণগঞ্জের বরফকলের নাম শুনলে আজও কেমন যেন মনে হয়, লোকশ্রুতিগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো শীতলক্ষ্যার পানি কোনো দিন ইংল্যান্ডে যায়নি। কিংবা গিয়েছিল। গিয়েছিল কলকাতা বা বোম্বের ইংরেজদের ঘরে। কিন্তু পৃথিবীর এক প্রান্তের বরফ আরেক প্রান্তের মানুষের গরম কমাতে যে মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল, ইতিহাস সে কথা নিশ্চিতভাবেই জানে।