Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

বরফের সীমানা ছাড়িয়ে: আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় কাপড়, সুবাস আর রঙের মিশেলে যেভাবে গরমকে বশ করত মানুষ

আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে রেহাই পেতে যেসব উপাদান ও প্রযুক্তির ব্যবহার হতো, তা শুধু পারদই নামাত না। বরং দৃশ্য, গন্ধ, রং ও ত্বকের স্পর্শের মাধ্যমেও শীতলতা ছড়িয়ে দিত। তৎকালীন নানা লেখা ও ছবি থেকে প্রমাণ মেলে, গ্রীষ্মের উষ্ণতায় সেই শীতলতা খোঁজার বিষয়টি আক্ষরিক অর্থেই বহু-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা ছিল।
বরফের সীমানা ছাড়িয়ে: আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় কাপড়, সুবাস আর রঙের মিশেলে যেভাবে গরমকে বশ করত মানুষ

ইজেল

মারুফ হোসেন
23 July, 2026, 10:50 pm
Last modified: 23 July, 2026, 10:51 pm

Related News

  • ঢাকার বরফনামা—কল থেকে কুলফি মালাই
  • যশোর রোডের অ্যালেন গিন্সবার্গের ১০০
  • ম্যাজিক বুট, টোটাল ফুটবল, স্বৈরশাসকের উৎসব এবং ‘ইশ্বরের হাত’
  • পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন: ফিরছে নীল ও জলপাই রঙের শার্ট, প্যান্ট হবে খাকি
  • ৯০ মিনিটের ক্যানভাসে তুলির আঁচড়

বরফের সীমানা ছাড়িয়ে: আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় কাপড়, সুবাস আর রঙের মিশেলে যেভাবে গরমকে বশ করত মানুষ

আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে রেহাই পেতে যেসব উপাদান ও প্রযুক্তির ব্যবহার হতো, তা শুধু পারদই নামাত না। বরং দৃশ্য, গন্ধ, রং ও ত্বকের স্পর্শের মাধ্যমেও শীতলতা ছড়িয়ে দিত। তৎকালীন নানা লেখা ও ছবি থেকে প্রমাণ মেলে, গ্রীষ্মের উষ্ণতায় সেই শীতলতা খোঁজার বিষয়টি আক্ষরিক অর্থেই বহু-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা ছিল।
মারুফ হোসেন
23 July, 2026, 10:50 pm
Last modified: 23 July, 2026, 10:51 pm

১৭৪৫ সাল। দিল্লির এক স্যাঁতসেঁতে কামরায় বসে ফারসি শব্দের অভিধান লিখছেন লেখক আনন্দ রাম মুখলিস। হঠাৎ থমকে গেল কলম। নজর আটকে গেছে 'তখত-ই ইয়াখ' শব্দটার ওপর। আক্ষরিক অর্থ: বরফের চাদর। 'তখত' বলতে বোঝায় সমতল কোনো পৃষ্ঠ, আর 'ইয়াখ' মানে বরফ।

বিড়বিড় করে লিখে রাখলেন তিনি, এই বরফকে ডাকা হয় 'পারচা-ই ইয়াখি' নামেও। মানে 'বরফের কাপড়'। 'পারচা' বলতে এক টুকরো বা এক ফালি অংশকেও বোঝায়।

মুখলিস লিখলেন, এই বরফ চওড়া আর দীর্ঘ। তারপর বসালেন খটমট এক শব্দ—'শাফফাফ'। পোশাকের ক্ষেত্রে যার মানে দাঁড়ায় স্বচ্ছ, পরিষ্কার কিংবা দ্যুতিময়। এই বরফ 'আয়নার সামনের দিকের মতো'—লিখলেন তিনি।

'তখত-ই ইয়াখ'-এর বর্ণনায় বস্তুটার বুনন আর দ্যুতির কথা ফুটিয়ে তুললেন মুখলিস। চওড়া, পাতলা বরফের চাদরকে তুলনা করলেন ফুরফুরে, চকচকে একটুকরো কাপড় বা আয়নার মসৃণ পৃষ্ঠের সাথে। 

মুখলিসের এই অভিধানে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার ফারসি-বলয়ে প্রচলিত শব্দাবলির অর্থই মেলে না, সেই শব্দগুলোকে ঘিরে থাকা সাংস্কৃতিক জগতেরও সন্ধান পাওয়া যায়।

বরফের এই বর্ণনার পরই উদ্ধৃত করা হয়েছে সতেরো শতকের মোগল দরবারের কবি মীর ইয়াহিয়া কাশির একজোড়া পঙ্‌ক্তি। সেখানে বলা হলো, প্রেমিকার মুখের একচিলতে ভ্রুকুটি এতটাই শক্তিশালী যে, তা যেন আয়নাকেও বরফের পাতলা চাদরের (তখত-ই-ইয়াখ) মতো গলিয়ে দিতে পারে। 

এর পর মুখলিস প্রাসঙ্গিক একটি উপাখ্যানও জুড়েছেন। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ (১৭০৭-১২) লাহোরে থাকার সময় খুব ভোরে শিকারে যেতেন। পথে জমাট বাঁধা পানির ওপর নজর পড়তেই তিনি থমকে দাঁড়াতেন। 'বরফের চাদরে ফাটলগুলো চোখে পড়তেই দাঁড়িয়ে যেতেন তিনি, গভীর কোনো সত্য খুঁজতেন ওই ফাটলের ভেতর।'

আঠারো শতকের দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে রেহাই পেতে যেসব উপাদান ও প্রযুক্তির ব্যবহার হতো, তা শুধু পারদই নামাত না। বরং দৃশ্য, গন্ধ, রং ও ত্বকের স্পর্শের মাধ্যমেও শীতলতা ছড়িয়ে দিত। তৎকালীন নানা লেখা ও ছবি থেকে প্রমাণ মেলে, গ্রীষ্মের উষ্ণতায় সেই শীতলতা খোঁজার বিষয়টি আক্ষরিক অর্থেই বহু-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা ছিল।

আধুনিক রেফ্রিজারেটর বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) মতো নিছক গন্ধহীন, বর্ণহীন বরফের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তারা। ওই সময় তাপের সাথে সেই লড়াইয়ে হাতিয়ার হয়েছিল আরও অনেক কিছু। এর মধ্যে রয়েছে খসখস (ভেটিভার) ঘাসের বোনা মাদুর। পরিবেশ ঠান্ডা করতে ও সতেজ সুগন্ধ ছড়াতে এই মাদুর পানিতে ভিজিয়ে রাখার চল ছিল। আর রাতের বেলায় গরমের হাত থেকে বাঁচতে বিছানায় পাতা হতো রুপালি সুতোয় বোনা চাদর।

মোগলদের কাছে যে ভূখণ্ড 'হিন্দুস্তান' নামে পরিচিত ছিল, তার উত্তরাঞ্চলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই বরফ বা শীতের ছোঁয়া ছিল দুর্লভ বিলাসিতা। গুটিকয়েক মানুষেরই তা পাওয়ার সামর্থ্য ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের (১৫২৬-১৮৫৮) অভিজাতদের অনেকেরই শিকড় ছিল ইরান ও মধ্য এশিয়ার তুলনামূলক শীতল অঞ্চলে। তাই আয়েশ ও রাজকীয় বিনোদনের জন্য তাদের কাছে পাহাড়ি বরফ বা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আঙুর ও তরমুজ ছিল অপরিহার্য।

দীর্ঘ, রুক্ষ আর গনগনে গরমে উত্তর হিন্দুস্তানের বিশাল ইমারতগুলো চারপাশ ঠান্ডা রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখত। এসব ইমারতে ছিল গভীর ধাপকুয়ো (বাউলি) আর বেলেপাথরের চওড়া দেয়াল। এই দেয়াল দিনের বেলার তাপ শুষে নিয়ে অন্দরমহলকে ঠান্ডা রাখত। ছায়া দিতে ছাদের ওপর মাথা উঁচিয়ে থাকত ছোট ছোট গম্বুজওয়ালা ছত্রী। জালিকাটা দেয়ালের ফুটো গলে বাতাস ঢুকত, কিন্তু আটকে যেত রোদের চোখরাঙানি। ছায়াঘেরা বাগানে বইত অজস্র ফোয়ারা আর জলধারা। মর্মর পাথরের মেঝে ঠান্ডা রাখতে প্রাসাদের নিচ দিয়ে ছুটত পানির পাইপ। 

যাদের দূর থেকে বরফ আনিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, শ্বেতপাথরের প্রাসাদে বাস করতেন না বা গ্রীষ্মে কাশ্মীরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, দাবদাহের সময় তাদের স্বস্তি দিত ঘাসের মাদুর আর ফুরফুরে পাতলা কাপড়। সঙ্গী হতো গানবাজনা, নানা ফল ও চিত্রকলা। স্পর্শ, দৃষ্টি, স্বাদ, শব্দ ও গন্ধের মাধ্যমে এসব উপাদান গরমের মধ্যেও সতেজতার অনুভূতি দিত।

খড়ের ঘর। গরমে ঠাণ্ডা চিত্র: সাওয়ান্ত সারঙ্গী রাগিণী (মেঘ রাগের অন্তর্গত), বোস্টন রাগমাল সিরিজ। রাজস্থানের বুন্দি অথবা কোটায় আনুমানিক ১৭৭০ সালে চিত্রিত।

যুগের পর যুগ ধরে শীতকে কেবল উষ্ণতার অভাব ও ইন্দ্রিয়সুখের মৃত্যু হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু আঠারো শতকের হিন্দুস্তানে এই শীতলতার পরশ ছিল একাধারে প্রাচুর্য, স্বস্তি এবং উপভোগের অভিজ্ঞতা।

শীতলতা বোঝাতে যেসব ফারসি শব্দ ব্যবহার হয়, তা তাপমাত্রার এই অবস্থার নানা অনুষঙ্গ বহন করে। ফারসিতে 'ঠান্ডা' বোঝাতে সাধারণত 'সর্দ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বা অবস্থাকে (যেমন শীতল আবহাওয়া) বোঝায়। তবে ইংরেজির মতোই 'সর্দ' শব্দটির সঙ্গে আবেগগত অনুষঙ্গও জড়িয়ে রয়েছে। শব্দটি উত্তাপ বা আবেগের অভাব, এমনকি জীবনের অবসানকেও নির্দেশ করে। ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার (সর্দ শুদান) অর্থ মৃত্যু বা নিভে যাওয়াও হতে পারে। আবার 'শীতল হৃদয়' (দিল সর্দ) বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যিনি হতোদ্যম, যার বেঁচে থাকার স্পৃহা নিভে গেছে। 

'খুনুক' শব্দটি ব্যবহার হয় মৃদু শীতলতা বোঝাতে। যেমন 'হাওয়া-ই খুনুক' বলতে বোঝায় স্নিগ্ধ, সতেজ দমকা হাওয়া। আধুনিক যুগে 'খুনুক' শব্দের অর্থ নীরস হতে পারে। কিন্তু উনিশ শতকের শেষের দিকে এই শব্দটির সঙ্গে শীতলতা ও আরামের পাশাপাশি সুখ ও সৌভাগ্যের ধারণাও যুক্ত ছিল। 'খুনুক কারদান' ক্রিয়াপদটির অর্থ যেমন 'শীতল করা', তেমনই 'আনন্দিত করা'। সেকালের দলিলে প্রায় সমার্থক হিসেবেই ঘুরেফিরে এসেছে 'সর্দ' আর 'খুনুক'। মোগল আমলের 'আইন-ই-আকবরী'তে জমাট বাঁধা ঠান্ডা পানি বোঝাতে ব্যবহার হয়েছে 'সর্দ', কিন্তু খসখসের মাদুরের শীতল, সতেজ পরশ বোঝাতে গিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে 'খুনুক'। 

সেকালের খুব কম নিদর্শনই টিকে আছে। তবে এই লেখায় পরিবেশ ঠান্ডা রাখার যেসব পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তার প্রমাণ মেলে মূলত রাজস্থান এবং দিল্লি ও আগ্রাসংলগ্ন অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাচীন নথি ও চিত্রকলায়। এসব অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল ছিল অত্যন্ত শুষ্ক ও রুক্ষ। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পূর্ব বাংলা বা দক্ষিণ ভারতের মতো আর্দ্রতা সেখানে ছিল না।

ঠান্ডা আর গরমকে সাধারণত শুধু স্পর্শের সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। কিন্তু তাপমাত্রার পরিধি স্পর্শের বাইরেও বিস্তৃত। বাতাসের তাপমাত্রার ওঠা-নামা, স্নিগ্ধ একপশলা দমকা হাওয়ার উপস্থিতি বা শরীর থেকে তাপ শুষে নেওয়ার সূক্ষ্ম, অদৃশ্য বার্তা বয়ে আনে এই তাপীয় বোধ। স্থাপত্যের প্রেক্ষাপটে লিসা হেশংয়ের যুক্তি হলো, তাপমাত্রার পরিবর্তনের এই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাকে স্থাপত্যের নকশাতেও নিয়ে আসা সম্ভব। তিনি একে 'থার্মাল ডিলাইট' বা 'তাপীয় আনন্দ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আলো-ছায়ার খেলার মতোই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এই বিষয়টি স্থাপত্যে ফুটিয়ে তোলা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় দাবদাহ থেকে বাঁচার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পাতায় পাতায় কেবল উত্তর ইউরোপীয় পর্যটক, সেনা আর ঔপনিবেশিক প্রভুদের ঘ্যানঘ্যানানি। উত্তরের রুক্ষ গ্রীষ্ম কিংবা ক্রান্তীয় অঞ্চলের ভ্যাপসা গরমে তারা একেবারেই অভ্যস্ত ছিলেন না। গরম থেকে বাঁচতে তারা প্রথমে বরফ উৎপাদন ও আমদানি করেন, পরে ভরসা রাখেন বৈদ্যুতিক এসির ওপর। 

কিন্তু ব্রিটিশদের নথিপত্র আর মোগলদের দস্তাবেজ বলছে, ইউরোপীয়দের আগমনের বহু আগেই হিন্দুস্তানের শাসক ও অভিজাতরা চারপাশ শীতল রাখার কিছু কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। তারপরও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজি পত্রপত্রিকায় আমেরিকা থেকে আমদানি করা বরফ নিয়ে ব্রিটিশদের উন্মাদনাই প্রাধান্য পেতে শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব শীতলীকরণ পদ্ধতিগুলোকে সেকেলে আর অকেজো বলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

আঠারো শতকের হিন্দুস্তানের মানুষদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার ওপর আলোকপাত করলে মনে হতে পারে, 'প্রাচ্যের' ভোগবিলাস আ শারীরিক অবক্ষয় নিয়ে ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয়দের চিরাচরিত ধারণাই বুঝি সত্যি। কিন্তু এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতার শেকড় আসলে প্রোথিত আর গরম নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের ধারণার মধ্যে। এই 'জলবায়ুগত নিয়তিবাদ' দীর্ঘদিন ধরেই বাতিল ও ভিত্তিহীন তত্ত্ব। এই তত্ত্বমতে, একটি অঞ্চলের জলবায়ুই (তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাসমেত) সেখানকার অধিবাসীদের শারীরিক, চিকিৎসাগত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। উনিশ শতকে এ ধরনের তত্ত্বগুলো ক্রমে বর্ণবাদী চেহারা নিতে শুরু করে। ব্রিটিশ লেখকেরা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দাদের 'দুর্বল' ও 'অলস' আখ্যা দিতেন। তাদের দাবি ছিল, এ অঞ্চলের চরম জলবায়ুই মানুষের এই স্বভাবের জন্য দায়ী। পরিবেশ ঠান্ডা রাখার স্থানীয় প্রাচীন প্রযুক্তিগুলোকে অস্বীকার করেছিল এসব ধ্যানধারণা। 

ইউরোপীয় ও আমেরিকান উপনিবেশবাদীদের চাপিয়ে দেওয়া রেফ্রিজারেশন আর এসির বিশাল নেটওয়ার্ককে বর্ণনা করতে অনেক গবেষক 'থার্মাল কলোনিয়ালিজম' বা 'তাপীয় উপনিবেশবাদ'-এর ধারণা তুলে ধরেছেন। উনিশ ও বিশ শতকের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের প্রেক্ষাপটে লিখতে গিয়ে হোবার্ট সমকালীন আমেরিকানদের ইতিহাস-বিমুখ মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। আমেরিকানরা মনে করতেন, ঠান্ডা পাওয়ার এই আকাক্সক্ষা মানুষের সর্বজনীন জৈবিক চাহিদামাত্র। উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকানরা কাক্সিক্ষত শৈত্য ও আরামের সংজ্ঞাকে নিজেদের মতো করে গায়ের জোরে বদলে দিয়েছিলেন। 

জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের বিকল্প হিসেবে সাধারণত বড় পরিসরের স্থাপত্য, অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত প্রকল্পের কথাই ভাবা হয়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট ও ব্যক্তিগত পরিসরেও গরম থেকে রেহাই পাওয়ার কৌশলগুলো কাজ করত। এর মধ্যে রয়েছে হাতের মুঠোয় এঁটে যাওয়া নানা সামগ্রী কিংবা সরাসরি শরীর ঠান্ডা রাখার মতো আরামদায়ক পোশাক। বড় বড় স্থাপত্যের মাধ্যমে যে বিলাসবহুল শীতলতা পাওয়া যেত, তার চেয়ে এই সাধারণ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রীগুলি মানুষের অনেক বেশি সাধ্যের মধ্যে ছিল। উষ্ণায়নের এই আধুনিক বিশ্বে পরিবেশ শীতল করার বহু-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদ্ধতিগুলোর উপযোগিতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব ক্রমেই আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে খরতাপের দিনে স্বস্তি পেতে দীর্ঘকাল ধরেই ঠান্ডা পানি ও বরফের ব্যবহার ছিল। এসব অঞ্চলে পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রাকৃতিক বরফ কেটে আনা হতো। তারপর দুর্গম পথ পেরিয়ে নামানো হতো সমতলের তপ্ত জনপদে। বিশেষ কায়দায় প্যাক করে রাখা হতো সেগুলো, গলন ঠেকাতে ঢোকানো হতো বিশেষভাবে তৈরি প্রকোষ্ঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দেই ইরানে বরফ জমিয়ে রাখার এরকম নানা কৌশল আবিষ্কার হয়েছিল বলে ধারণা গবেষকদের। সবচেয়ে টেকসই পদ্ধতি ছিল 'ইয়াখচাল'—আক্ষরিক অর্থে 'বরফের গর্ত'। মোচাকৃতির এই কাঠামোর দেয়াল হতো পুরু ও নিরেট। দেয়ালের ভেতর মরুভূমির শুষ্ক, গনগনে গরমের দিনেও জমাট বেঁধে থাকত ঠান্ডা পানি, এমনকি বরফও সংরক্ষণ করা যেত। 

ইরান ও হিন্দুস্তান উভয় স্থানেই পাহাড়ি বরফের পাশাপাশি আরও একধরনের বরফের চল ছিল। শীতের ভোরে অগভীর জলাশয় আর পাত্রে জমে ওঠা পাতলা বরফের আস্তরণও কাজে লাগানো হতো। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে না নামলেও এ পদ্ধতিতে বরফ জমানো যেত। পরে এই ভঙ্গুর বরফ তুলে এনে একসঙ্গে পিটিয়ে পুরু চাঁই বানিয়ে সংরক্ষণ করা হতো।

দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও ঐতিহাসিক নথিতে গ্রীষ্মের তাপ থেকে মুক্তির খোঁজের উল্লেখ রয়েছে। তবে বরফ ব্যবহারের বিষয়টি সবচেয়ে বিশদে পাওয়া যায় মোগল আমলের নথিপত্রে। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকাহিনির সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। মধ্য এশিয়ার শাসক তৈমুরের বংশধর ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর। ১৫২৬ সালে পানিপাতের যুদ্ধে জয়লাভ করে উত্তর হিন্দুস্তানে পদার্পণের পর সেখানকার তীব্র গরম দেখে বাবর রীতিমতো হতাশ হন।

বাবরের বেড়ে ওঠা মধ্য এশিয়ার স্নিগ্ধ, শীতল আবহাওয়ায়। তার আত্মজীবনী 'বাবুরনামা'-তেও শীত ও বরফের নানা স্মৃতিকথা রয়েছে। বাবুরের সমসাময়িক সাফাভি সাম্রাজ্যের শাসক শাহ তামাস্পের রাজসভার জন্য আঁকা একটি চিত্রেও এর প্রমাণ মেলে। রাজাদের পৌরাণিক কাহিনি 'শাহনামা'র একটি দৃশ্য সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল। ওই চিত্রে দেখা যায়, প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে ইসফন্দিয়ার তার সেনাবাহিনী নিয়ে তাঁবু খাটানোর জন্য হিমশিম খাচ্ছেন। 

মধ্য এশিয়া পেরিয়ে বাবুর ও তার সেনাবাহিনী যখন হিন্দুস্তানে প্রবেশ করলেন, তখন চারপাশের ভৌগোলিক পরিবেশ বদলে গেল। আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন, 'এর আগে আমি কখনো হিন্দুস্তান বা এখানকার এমন উষ্ণ আবহাওয়া দেখিনি...সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভিন্ন গাছপালা, নতুন সব পশুপাখি, ভিন্ন উপজাতি ও মানুষজন, এমনকি তাদের আচার-আচরণ ও রীতিনীতিও সম্পূর্ণ আলাদা। এটি ছিল এক বিস্ময়কর, আক্ষরিক অর্থেই অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।'

বাবুর প্রায়ই এই তীব্র গরমের নিন্দামন্দ করতেন। এখনকার আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার নানা শহরের ঋতুবৈচিত্র্যের কথা তিনি 'বাবুরনামা'য় তুলে ধরেছেন। সেখানে উঠে এসেছে তুষারপাত, পাহাড়ের স্বচ্ছ ও শীতল জল, সতেজ হাওয়া ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় ফলানো নানা ফলের কথা। হিন্দুস্তানের গরমে বসে বাবুর 'আঙুর, খরমুজ বা উন্নত মানের ফলমূল'-এর পাশাপাশি বরফ ও ঠান্ডা পানির জন্য আক্ষেপ করতেন। 

তবে হিন্দুস্তানের বর্ষাকাল বাবুরের বেশ পছন্দের ছিল। তিনি লিখেছেন: 'বৃষ্টির সময় এবং বর্ষায় এখানকার বাতাস চমৎকার থাকে। স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের দিক থেকে এর কোনো তুলনা হয় না।' নিজের রাজত্বকালেই চারপাশের পরিবেশ কৃত্রিমভাবে শীতল করার চেষ্টা করেছিলেন বাবুর। দূরদূরান্ত থেকে আনিয়েছিলেন তরমুজ, খরমুজ, কমলা আর আঙুর।  চার খণ্ডে বিভক্ত বাগান নির্মাণ করেন; 'ওয়াটার হুইল'-এর সাহায্যে সেচের ব্যবস্থা করেন সেখানে। দূরদূরান্ত থেকে আনা ফলের চাষ করে হিন্দুস্তানের মাটিতেই নিজের আরাম-আয়েশের জন্য নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি।

বাবরের পৌত্র আকবর সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন। শীতলতার অনুভূতি পেতে তিনিও দূরদূরান্ত থেকে বরফ, পানি, ফলমূল ও সুগন্ধি দ্রব্য আনার ওপর বিশেষ জোর দিতেন। মোগল সাম্রাজ্যের উত্থান এমন সময়ে হয়েছিল, যাকে বলা যায় 'লিটল আইস এজ' বা খুদে বরফযুগ। এটি ছিল চরম আবহাওয়ার এক অদ্ভুত সময়। বিশ্বের অনেক জায়গাতেই তখন নেমে এসেছে হাড়কাঁপানো শীত। তবে বিভিন্ন নথি, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিত্র থেকে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ওই সময়টি ছিল চরমভাবাপন্ন। সে সময় কখনো দেখা যেত বিধ্বংসী বন্যা, কখনো বা চরম খরা।

ইয়খচাল, প্রাচীন বরফঘরের বহির্ভাগ। কালাহ-ই-জালালি দূর্গ, কাশান, ইরান, সপ্তদশ শতাব্দী।

ষোলো ও সতেরো শতকের দিকে মোগল হিন্দুস্তানের কিছু অঞ্চলে, বিশেষত গুজরাট ও দাক্ষিণাত্যে টানা খরা দেখা দেয়। ফসল নষ্ট হওয়ায় নেমে এল দুর্ভিক্ষ। এর উল্টো চিত্র সেচবিধৌত লাহোর শহর কিংবা কাশ্মীরের হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের ধারের বাগানগুলোতে; ওই সব জায়গায় অভিজাতদের জন্য সব রকম প্রমোদের ব্যবস্থা মজুত ছিল।

রাজত্বের শুরুর দিকে আগ্রা থেকে চল্লিশ মাইল দূরে ফতেহপুর সিক্রিতে স্বল্পস্থায়ী রাজধানী গড়ে তুলেছিলেন আকবর। সেখানকার প্রাসাদের চত্বরে ছিল 'আব-দার খানা'—রাজকীয় পানীয় বিভাগ। 'আব' অর্থ পানি। বেলেপাথরের তৈরি সেই স্থাপত্য আজও টিকে রয়েছে। ওখানে পানি ঠান্ডা রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল গভীর জলাধার। এখানে ফল ও পানি সংরক্ষণ করে রাখা হতো। আব-দার খানার দায়িত্বে থাকতেন উচ্চপদস্থ সেনা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সেই সঙ্গে তিনি হতেন সম্রাটের অত্যন্ত আস্থাভাজন।

'আইন-ই আকবরি'তে এই আব-দার খানার বিশদ বিবরণ আছে। রাজপরিবারের অন্দরমহল থেকে করযোগ্য জমির প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর খুঁটিনাটি—সবই স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে। ১৫৯০-এর দশকে 'আইন-ই আকবরি'র কাজ সম্পন্ন হয়। আকবর তখন রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি থেকে সরিয়ে উত্তর-পশ্চিমের লাহোরে নিয়ে গিয়েছেন। কারণ, ফতেহপুর সিক্রিতে পানির অভাব দেখা দিয়েছিল। তুলনায় লাহোর ছিল শীতল ও পার্বত্য অঞ্চলের কাছাকাছি। 

'আইন-ই আকবরি'র আব-দার খানা-সংক্রান্ত অধ্যায়ে বলা হয়েছে, রাজদরবার যখন আগ্রা ও ফতেহপুর সিক্রিতে ছিল, তখন গঙ্গার পানি আনা হতো 'সারুন জেলা থেকে। কিন্তু মহামান্য সম্রাট এখন পাঞ্জাবে থাকায়, জল আনা হচ্ছে হরিদ্বার থেকে।'

রাজদরবার লাহোরে স্থানান্তরিত হওয়ার পর বরফ ও তুষারের ব্যবহার যে বেড়েছিল, 'আইন-ই আকবরি'তে তারও উল্লেখ রয়েছে। মোগল দরবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও বরফ পাওয়াটা নির্ভর করত তাদের অবস্থান ঠিক কোথায়, তার ওপর। আবুল ফজল লিখছেন, '১৫৮৬ সালের পর থেকে তুষার ও বরফের ব্যবহার শুরু হয়। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের পানহান জেলা থেকে জল ও স্থলপথে—ঘোড়ার গাড়ি অথবা বাহকদের মাধ্যমে বরফ নিয়ে আসা হত।' লাহোর ছিল থেকে ৪৫ ক্রোশ (প্রায় ৮১ মাইল) দূরে। 

বরফ ব্যবসায়ীরা এই ব্যবসায় প্রচুর লাভ করতেন, বিশেষ করে যখন নৌপথে বরফ আনা হতো। স্থলপথে বরফ আনতে প্রচুর শ্রমিক লাগত। একটানা চোদ্দোটা ঘোড়ার ডাক পেরোতে হতো, ব্যবহার করা হতো একটি হাতি। 

বরফের দামের হেরফের ঘটত। তবে আবুল ফজল জানিয়েছেন, বিক্রেতারা এক রুপিতে প্রায় দুই থেকে তিন সের বরফ বেচতেন। যত দূর থেকে আসত, তত চড়ত দাম। বর্ষাকালে বরফের দাম হতো আকাশছোঁয়া। আবুল ফজল লিখেছেন: 'গ্রীষ্মকালে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই বরফ ব্যবহার করেন, তবে অভিজাতরা ব্যবহার করেন সারা বছরজুড়েই।'

'আইন-ই আকবরি'র একই অধ্যায়ে পানীয় ঠান্ডা করার জন্য সল্টপিটার ব্যবহারের বিশদ বিবরণ রয়েছে। সল্টপিটার (পটাশিয়াম নাইট্রেট) প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সোডিয়ামের খনিজ। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি প্রচুর পাওয়া যেত। বারুদ তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদানও ছিল এটি। সতেরো শতক নাগাদ ব্রিটেনের কাছে সল্টপিটারের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়া। বারুদ তৈরিতে এটি 'অক্সিডাইজিং এজেন্ট' হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া আরেকটা দারুণ ক্ষমতা আছে এই জিনিসের। সল্টপিটার পানিতে দ্রবীভূত হলেই শুরু হয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া। নিমেষে শুষে নেয় সমস্ত তাপ, ঠান্ডা করে তোলে পানি। 

সল্টপিটার বা শোরা সংগ্রহ করে, ছেঁকে, নিখুঁতভাবে পরিশোধন করে বানানো হতো মিহি পাউডার। তারপর মিশিয়ে দেওয়া হতো পানির সাথে। 

আবুল ফজল লিখছেন, 'দশটা, রুপা বা ওই জাতীয় কোনো ধাতুর তৈরি বোতলে এক সের পানি ভরে তার মুখ ভালোমতো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরেকটি পাত্রে আড়াই সের সল্টপিটার পাঁচ সের পানির সঙ্গে মেশানো হয়। এবার মুখবন্ধ পানির পাত্রটিকে ওই মিশ্রণের মধ্যে আধ-ঘড়ি (১২ মিনিট) ধরে ঘোরাতে থাকলে ভেতরের পানি প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়ে যায়।' 

আব-দার খানা, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা জেলা, উত্তরপ্রদেশ। এটি লাল বেলেপাথরে তৈরী, মুঘল সাম্রাজ্য ১৫৭১-১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে পাওয়া আঠারো শতকের এক দুর্লভ ঠান্ডা পানির ফ্লাস্ক থেকে পানি ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের ধারণা পাওয়া যায়। পাত্রটির নিচের অংশ বেশ স্ফীত, ওখানে রাখা হতো। এর গলা বেশ সরু, কারুকার্যখচিত রুপা দিয়ে তৈরি। সল্টপিটারের ঠান্ডা মিশ্রণের মধ্যে পাত্রটিকে ঘোরানোর সময় এর সরু গলা ধরে রাখা হতো। ফ্লাস্কের নিচের অংশ দস্তার তৈরি। দস্তা তাপের বেশ ভালো সুপরিবাহী। তবে এরচেয়েও বড় বিষয় হলো, দস্তায় সহজে দাগ পড়ে না, আর জীবাণুকেও দূরে রাখে। ওই সময়ের অন্যান্য অনেক ফ্লাস্ক তৈরি হতো খাঁটি রুপা দিয়ে। রুপা আরও বেশি তাপ সুপরিবাহী। পাত্রটি লাল রঙের গালা-মাখানো বোনা কাপড়ে মোড়া থাকত। দেখতে সুন্দর লাগার পাশাপাশি এর ব্যবহারিক উপযোগিতাও ছিল। আরও ঠান্ডা করতে অনেক সময়েই পাত্রের গায়ে সল্টপিটার-ভেজানো কাপড় জড়িয়ে রাখা হতো। গালার প্রলেপ থাকায় কাপড়টি পানি শুষে নিত না ঠিকই, তবে আলগা বোনা কাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে ঠান্ডা পানি আটকে থাকত। ফলে ধাতব আবরণের গায়ে একটি শীতল স্তর তৈরি হতো। 

মোগল অভিজাতদের মধ্যে বরফ ও পানি ঠান্ডা করার নানা উপকরণের ব্যবহার চলতেই থাকে। আকবরের পৌত্র সম্রাট শাহজাহানের আমলের নথিতেও এর উল্লেখ রয়েছে। পাহাড় থেকে 'তুষার ও বরফ' নিয়ে আসতেন তিনি। ১৬৪৭ সালে শাহজাহানের সচিব চন্দ্রভান ব্রাহ্মণ 'চাহার চমন' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং গোটা মোগল সাম্রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে শাহজাহানের 'তাজা ও সতেজ' ফলমূল নিয়ে আসার দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে। তার পরেই এসেছে বরফের প্রসঙ্গ। 

শাহজাহানের আনা ফলের তালিকায় ছিল বলখ ও কারিসের তরমুজ, কালো ও বেগুনি রঙের হাবশি এবং সাহিবি আঙুর, সমরখন্দের নাশপাতি ও আপেল, কাশ্মীরের তরমুজ এবং নানা আকার ও আকৃতির কমলালেবু। এসব ফল যাতে শুকনো ও অক্ষত থাকে, সেজন্য খড় বা কাঠের গুঁড়োয় যত্ন করে মুড়ে আনা হতো। হাজার মাইল দূরের দুর্গম পথ পেরিয়ে এসব পচনশীল ফল আনানোটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই অসাধ্য সাধন। সোনা ও রুপার থালায় সাজিয়ে অভিজাতদের সামনে পরিবেশন করা হতো সেসব ফল। চন্দ্রভান লিখছেন, গ্রীষ্মের গনগনে দিনে প্রধান কর্মকর্তাদের মাঝে পদমর্যাদা অনুযায়ী বিতরণ করা হতো প্রচুর পরিমাণ বরফ আর তুষার। বিদেশ থেকে আনা ফলের মতোই সেই বরফ অভিজাতদের উপহার হিসেবে বিলি করতেন তিনি। 

আকাশছোঁয়া দাম আর দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বরফের ব্যবহার নির্দিষ্ট বৃত্তেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৬৬০ সালের দিকে অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের রচিত 'মির্জানামা' গ্রন্থেও আভিজাত্যের অন্যতম শর্ত হিসেবে বরফের উল্লেখ রয়েছে। সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক হয়ে ওঠার নির্দেশিকা 'মির্জানামা'য় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, গ্রীষ্মকালীন পানীয় 'পালুদা'র (অধুনা 'ফালুদা') স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে বরফ বা অন্তত সল্টপিটার দিয়ে তা ঠান্ডা করা অত্যন্ত জরুরি।

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, 'একজন মির্জার উচিত কয়েক চামচ সুস্বাদু ও সুগন্ধি পালুদা (পানি, ময়দা, ফল, মধু বা অন্যান্য উপাদানের তৈরি পানীয়) খাওয়া। সামর্থ্য থাকলে বরফ বা অন্তত সল্টপিটার দিয়ে ঠান্ডা করা পালুদাই তার পান করা উচিত। আর তা সম্ভব না হলে পালুদা খাওয়া বা তার নাম মুখে আনাও তার সাজে না। কারণ, বরফ বা সল্টপিটার দিয়ে ঠান্ডা না-করলে ওই পানীয় খেলে দাঁতে সেই শীতলতার অনুভূতি মেলে না।'

যথেষ্ট ঠান্ডা না হলে পালুদা খাওয়ার বিরুদ্ধে এই যে কড়া হুঁশিয়ারি—এ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, ঠান্ডা পানীয়র স্বাদ নেওয়ার সামর্থ্য ছিল কেবল গুটিকয়েক বিত্তবানের। তবে এর চেয়েও কৌতূহলোদ্দীপক হলো, ঠান্ডা পানীয় পানের শিরশিরে শারীরিক অনুভূতি কেমন হওয়া উচিত, তার ওপর জোর দিয়েছেন লেখক। অর্থাৎ কেবল পানীয়ের সতেজ স্বাদ উপভোগ করাই নয়, মুখের ভেতরে সেই 'শীতলতার' অনুভূতি হওয়াটাও জরুরি ছিল।

বরফ সংগ্রহ ঐতিহাসিকভাবেই শ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল ছিল। প্রাচীন নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, মূলত খাবার ও পানীয় ঠান্ডা করতেই এর কদর ছিল। তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও উৎপাদন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বরফের বিস্তারও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল। যাদের বরফ কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিংবা যারা বরফের উৎস থেকে অনেক দূরে থাকতেন, তাদের কাছে শরীর ঠান্ডা রাখার হাতিয়ার ছিল ভিন্ন। স্বাদ, সুগন্ধ ও রঙের মতো নানা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতাই ছিল তাদের শীতল হওয়ার উপায়।

হিন্দুস্তানের আয়ুর্বেদিক গ্রন্থগুলোতে বরফ ও ঠান্ডা পানীয়কে বরাবরই হজমের বাধা হিসেবে দেখা হয়েছে। এর বদলে পরিমিত তাপমাত্রার খাবার বা পানীয়ের ওপর জোর দেওয়া হতো বেশি। তবে ডমিনিক উজাসটিকের মতে, গরম ও ঠান্ডার ভারসাম্যই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মূল ভিত্তি। আয়ুর্বেদে বরফ খাওয়ার চল না থাকলেও স্বচ্ছ পানির কদর ছিল যথেষ্ট। 

ইরান ও উত্তর হিন্দুস্তানের চিকিৎসা ও রন্ধন সংস্কৃতির একটা বড় অংশই দাঁড়িয়ে ছিল ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর। হিউমোরাল থিওরি বা দেহরস তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সেখানেও ভেষজ উপাদান ও খাবারের সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস ছিল। খাবারকে 'গরম' ও 'ঠান্ডা'—এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো। পাশাপাশি শুষ্ক থেকে আর্দ্র—এই বর্ণালিতেও মাপা হতো। মসলা ও সুগন্ধিরও গরম বা ঠান্ডা প্রভাব ছিল। যেমন কর্পূর ও চন্দনকে ধরা হতো শীতল উপাদান হিসেবে। 

খাবারের পাশাপাশি আরও কিছু অভিনব পদ্ধতিতে মানুষ গরম থেকে বাঁচার চেষ্টা করত। কখনো সুবাস, কখনো রং, কখনো বা স্পর্শ দিয়ে গরমকে জয় করার, কিংবা অন্তত কল্পনায় ভুলে থাকার চেষ্টা চলত। যেমন হাতের তালু আর পায়ের পাতায় মেহেদি দিত। মোগল দরবারের মসলিন বা মলমলের প্রায়-স্বচ্ছ কাপড় যে শুধু ওজনে হালকা ছিল, তা নয়। এর সুতোও ঘাম ও আর্দ্রতা শুষে নিত। মসলিন কাপড়ের নামও ছিল পানির ছোঁয়ায় স্নিগ্ধ—যেমন 'শবনম' (সন্ধ্যার শিশির) বা 'আব-ই-রওয়াঁ' (বহমান জল)। আরেক ধরনের কাপড়ের নাম ছিল 'তনসুখ'—শরীরের (তন) জন্য পরম আরাম বা সুখ।

রাতে ঘুমানোর জন্যও ছিল নানা ধরনের বোনা উপাদানের চল। রুপালি সুতা দিয়ে বোনা হতো বিছানা। উষ্ণ শরীর বা বস্তু থেকে তাপ শুষে নেওয়ার ক্ষমতা আছে রুপার। রুপার তৈরি শয্যার ওপর বিছিয়ে দেওয়া হতো সুতির চাদর। রাতের বেলা তার সংস্পর্শে এলে শরীর জুড়িয়ে যেত।

পানির পাত্র ঠাণ্ডা করছেন একজন আব-দার। বেনারস, আনুমানিক ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ।

আর বাংলার পূর্বাঞ্চলে ছিল শীতলপাটি। রুপার মতো দামি না হলেও এর কদর ছিল আকাশছোঁয়া। উনিশ শতক পেরিয়ে এই একুশ শতকেও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। মুর্তাগাছের কাণ্ড চিরে বের করা আঁশ দিয়ে বোনা হয় শীতলপাটি। বলা হতো, শীতলপাটির গা এতটাই মসৃণ যে এর ওপর দিয়ে সাপও এঁকেবেঁকে চলতে পারে না, পিছলে যায়।

মেঝে আর বিছানা ঠান্ডা রাখত মাদুর, আর চারপাশের পরিবেশকে শীতল রাখত খসখস দিয়ে তৈরি পর্দা। খস ঘাসের লম্বা, সুগন্ধি শেকড় দিয়ে বোনা হয় এই পর্দা, যা আজও সমান জনপ্রিয়। পানির ছিটে পড়তেই এই পর্দা থেকে ছড়িয়ে পড়ত আকর্ষণীয় সতেজ সুবাস আর শীতলতা।

হিন্দুস্তানের গরমে আকবরের শীতলতার খোঁজ উঠে এসেছে 'আইন-ই-আকবরী'তে। এ গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন, হিন্দুস্তানের 'উর্বর' ও 'ফলনশীল' মাটি, এখানকার 'হিরে, চুনি, সোনা ও রুপার খনি', রাজকীয় হাতি, সাম্রাজ্যের 'সুবাস আর সুরমূর্ছনা'—সবকিছু নিয়েই মুগ্ধ ছিলেন আকবর। তবে তার প্রধান বিরক্তি ছিল এখানকার 'ঠান্ডা পানির অভাব, ভ্যাপসা গরম, আর আঙুর, খরমুজ, গালিচা ও উটের আকাল' নিয়ে। তবে আকবর এসব অভাব দূর করার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। শরীর ঠান্ডা রাখতে সে সময় দেদার সল্টপিটার ব্যবহার শুরু হয়। উত্তরের পাহাড় থেকে আনা বরফ ও তুষারের কদর ছিল সমাজের উঁচু-নিচু সব মহলেই। তুর্কিস্তান ও পারস্য থেকে দক্ষ কারিগরদের ডাকিয়ে এনে তাদের দিয়ে এখানে তরমুজ ও আঙুরের চাষ শুরু করল। ওই দেশগুলোর নানা ফলমূলও নিরাপদে নিয়ে আসতে শুরু করলেন ব্যবসায়ীরা। 

সল্টপিটার, বরফ আর ফলের এই বর্ণনার মাঝেই আবুল ফজল লিখেছেন: 'একধরনের সুগন্ধি শিকড় আছে, ভীষণ ঠান্ডা (খুনুক), যাকে বলা হয় খস। জাহাঁপনার নির্দেশে বাঁশের কাঠামোর (নয়-বস্ত খানা-হা) ভেতর এই শিকড় ঠেসে কুঁড়েঘর বানানোর রীতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর গায়ে পানি ছিটিয়ে দিলে মনে হতো যেন ভর গ্রীষ্মের মাঝেই শীতকাল (জমিস্তান দিগর দর তাবিস্তান পদিদ আয়াদ) নেমে এসেছে।' 

'আইন-ই-আকবরী'র আরেক জায়গায় আবুল ফজল জানাচ্ছেন, 'খস হলো নদীর ধারে জন্ম নেওয়া একধরনের ঘাসের মিষ্টি গন্ধযুক্ত শেকড়। গ্রীষ্মকালে মানুষ এটা দিয়ে পর্দা বানায়, যা দরজার সামনে ঝুলিয়ে তাতে পানি ছিটানো হয়। এতে বাতাস হয়ে ওঠে ঠান্ডা ও সুগন্ধময়। দাম, প্রতি মণ দেড় রুপি।' বরফের দামের সঙ্গে তুলনা করলে খস ছিল রীতিমতো সস্তা। ওজনের হিসেবে খসের তুলনায় বরফের দাম ছিল প্রায় ৪০ গুণ বেশি। 

বরফ গলার সময় চারপাশের বাতাস বা তরলের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। সল্টপিটার পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার সময় শুষে নেয় উত্তাপ। তবে খসের পর্দার চারপাশ শীতল করার কৌশল এই দুই পদ্ধতির চেয়ে আলাদা। এটি দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত, ভেজা মাদুরের বুক চিরে বয়ে যাওয়ার সময় রুক্ষ, শুষ্ক বাতাস শুষে নেয় আরামদায়ক আর্দ্রতা; বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। দ্বিতীয়ত, এ পর্দা বাতাসের সুবাস বদলে দেয়। খসের সুগন্ধ মুখের ত্বকে থাকা ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। সহজ কথায়, বাতাসে খসের সুবাস ছড়িয়ে পড়লে তা সম্ভবত মানুষের মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে চারপাশ ঠান্ডা।

আঠারো শতকের রাজস্থানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রাজদরবারের চিত্রকর্মগুলোতেও খস-পর্দার দেখা মেলে। মেবার ও আমের-জয়পুরের রাজপুত দরবারের সঙ্গে মোগলদের বেশ মিল ছিল। খোলা আঙিনা সাজানো আর রক্ষণাবেক্ষণের বেলায় তারা প্রায় একই ধরনের বিলাসবহুল কায়দা-কানুন মানত। গ্রীষ্মে শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হতো সুতির চাদর। এর ওপর দিয়ে হাঁটলেও নিচ থেকে পাথরের হিমেল স্পর্শ টের পাওয়া যেত। রোদ ঠেকাতে টাঙানো হতো প্রমাণ সাইজের তাঁবু আর চিকের পর্দা। রাজপুতদের আঁকা ছবিতে 'খস খানা' নামের যে কাঠামোর দেখা মেলে, সেগুলো আবুল ফজলের বর্ণনার মতোই। বাঁশের কাঠামোর ওপর ঝোলানো থাকত খসের বোনা পর্দা বা 'খস-কি-টট্টি'।

তৎকালীন অনেক চিত্রকর্মে দেখা যায়, খসের পর্দার ভেতর দিয়ে আসা হিমেল বাতাস উপভোগ করছেন আভিজাতরা। তবে সে আমলের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায় অন্য এক রুক্ষ বাস্তবতার কথা। খসের এই কাঠামোর বাইরে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে অনবরত মাদুরে পানি ছিটানোর কাজ করতে হতো একদল শ্রমিককে।

আনন্দ রাম মুখলিসের শব্দকোষেও খসের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি জানাচ্ছেন, হিন্দুস্তানে খস থেকে এক বিশেষ ধরনের আতর বা সুগন্ধি তেল তৈরি হয়। এর সুবাস দারুণ 'ঠান্ডা'। তার বর্ণনায় খসের পরিচয়ের সঙ্গে আভিজাত্যের সরাসরি সম্পর্ক টানা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, 'এটি একধরনের ঘাস, যা থেকে সুগন্ধ বেরোয়; বিশেষ করে জলে ভেজালে। হিন্দুস্তানে গ্রীষ্মকালে ধনী ও পদস্থ ব্যক্তিরা এটি ব্যবহার করেন। ঘাসগুলোকে বিশেষ কায়দায় সাজিয়ে তাতে জল দেওয়া হয়। এতে পুরো কামরা অত্যন্ত "সর্দ" (শীতল) হয়ে ওঠে। একে বলা হয় খস খানা।' 

উনিশ শতক নাগাদ কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলো গড়ে ওঠে। ওই সময় গরম থেকে বাঁচতে দেশীয় নানা পদ্ধতির জায়গা পুরোপুরি দখল করে নিল আমদানি করা বরফ। গ্রীষ্মের হাঁসফাঁস গরম ইউরোপীয়দের কাছে বরাবরই বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল। তাই দক্ষিণ এশিয়ার প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচতে তারা আগেভাগেই স্থানীয়দের নানা পদ্ধতি আত্মস্থ করে নিয়েছিল।  

রুপার পাত দিয়ে বাঁধানো এবং বার্নিশের প্রলেপ দেওয়া কাপড়ে মোড়ানো দস্তার তৈরি পানি শীতল করার পাত্র। মুঘল সাম্রাজ্য, ১৮শ শতাব্দী।

সতেরো শতকের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডের রাজদরবার থেকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে সল্টপিটার ব্যবহার করে পানি ঠান্ডা করার পদ্ধতি শেখানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে ব্রিটিশদের সেই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ হিন্দুস্তানে এই পদ্ধতির চল আরও আগে থেকেই ছিল। আঠারো শতক আসতে আসতে দক্ষিণ এশিয়ায় থাকা ইউরোপীয়রা পানীয় ঠান্ডা রাখার জন্য 'আব-দার' বা পানি-সরবরাহকারী নিয়োগ করতে শুরু করে। ঘরের ভেতর খসখসের পর্দার ব্যবহারও শুরু হয়ে যায়। এই পর্দাকে যান্ত্রিক পাখার সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া হয়। পাখাটিকে একটানা ঘুরিয়ে যেতে হতো, যার নাম দেওয়া হয়েছিল 'থার্মান্টিডোট'। এ ছাড়া ঘরের ভেতরের বাতাস ঠান্ডা রাখতে নানা ধরনের পুলি বা কপিকল ব্যবস্থা এবং কাপড়ের তৈরি বিশাল আকারের পাখা ব্যবহার করা হতো, যা তখন 'পাংখা' নামে পরিচিত ছিল।

পাহাড় থেকে বরফ আনা ছিল ভীষণ ব্যয়বহুল। সেটা বুঝতে পেরেই ব্রিটিশরা প্রথমে দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় পদ্ধতিগুলো কাজে লাগিয়ে পানি ঠান্ডা রাখা এবং বরফ তৈরির দিকে নজর দেয়। পদ্ধতিটা ছিল বেশ চমৎকার। অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত মাটির পাত্রে কয়েক ইঞ্চি পানি ভরে সারা রাতের জন্য ফেলে রাখা হতো। সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসে, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে না নামলেও পাত্রের ওপর ও তলায় বরফের খুব পাতলা আস্তর জমতে শুরু করত। এরপর সেই পাতলা আস্তরগুলোকে একসঙ্গে পিটিয়ে তৈরি করা হতো বড়সড় বরফের চাঁই। কখনো কখনো পানি আরও দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য সল্টপিটারও মেশানো হতো। 

গ্রীষ্মের এই দাবদাহকে বশ করার যে স্বপ্ন ঔপনিবেশিক শাসকেরা দেখেছিল, অবশেষে তা সত্যি হয় ১৮৩৩ সালে। বোস্টন থেকে ১৮০ টন নিউ ইংল্যান্ডের বরফ নিয়ে প্রথম জাহাজ এসে ভেড়ে কলকাতা বন্দরে। উনিশ শতকের শুরুতে বোস্টনের ব্যবসায়ী ফ্রেডরিক টিউডর বোস্টন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও ব্রাজিলে বরফ রপ্তানি শুরু করেন। এরপর তিনি পা বাড়ান দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। টিউডর আর তার অংশীদার নাথানিয়েল ওয়ায়েথ বেশ কিছু যুগান্তকারী কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, বরফ যদি নিখুঁত আয়তাকারে কাটা হয়, তবে তা সহজে গলে না। বরফকে গলন থেকে বাঁচাতে তারা সেগুলোর ওপর কাঠের গুঁড়োর প্রলেপ দিতেন। জাহাজের ভেতর বরফ সংরক্ষণের জন্য তারা 'ডাবল-ওয়ালড ইনসুলেশন' বা দ্বি-স্তরবিশিষ্ট বিশেষ তাপ-নিরোধক প্রকোষ্ঠের নকশাও করেছিলেন। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেই বরফ যাতে দীর্ঘক্ষণ অক্ষত থাকে, সে জন্য তারা বিশেষ বরফঘরও তৈরি করেন। জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য 'ব্যালাস্ট' হিসেবে এই বরফগুলো বহন করা হতো, যার ফলে মালমাশুল লাগত খুবই কম। আর এই বরফ ভারতে এসে পৌঁছানোর পর এর ওপর আমদানি শুল্কও বসানো হতো না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বড় বড় শহরগুলোতে তখন নিউ ইংল্যান্ডের এই আমদানি করা বরফ বেশ সহজলভ্য। বরফের এই জমাট রূপ আর স্ফটিকস্বচ্ছতা দেখে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। তবে চড়া দামের কারণে এ বরফ কেবল শহরের ব্রিটিশ রাজকর্মকর্তা ও দক্ষিণ এশিয়ার ধনী ব্যবসায়ীদের মতো অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও সেরা মানের বরফটুকু ব্রিটিশরা বরাবরের মতোই নিজেদের জন্য সরিয়ে রাখত।

১৮৩৭ সালে জুনের এক তপ্ত দিনে কর্ন কব ছদ্মনামে এক অজ্ঞাতনামা লেখক শীতলীকরণের পুরোনো সব পদ্ধতিকে এককথায় বাতিল করে দিলেন। নতুন এই বরফের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তিনি লিখলেন:

'খসখসের পর্দা আজ আর ঠান্ডা করতে পারে না
পাংখার বাতাসও হার মেনেছে
পারদ ছুঁয়েছে ৯৫ ডিগ্রি
আর আমরা প্রায় ভাজা ভাজা হচ্ছি।
...তবু, একটু স্বস্তি হয়তো আমরা পেতে পারি,
কারণ আমাদের 'ডাল' আর ভাতের সঙ্গে, স্যার,
পানীয়গুলো বিলাসিতা হয়ে উঠেছে 
সেই ইয়াঙ্কি টিউডরের বরফের ছোঁয়ায়, স্যার।'

এ লেখায় বলা হয়েছে, আমেরিকা থেকে 'ইয়াঙ্কি টিউডরের' বরফ আসার পর খসখসের পর্দা আর 'পাংখা'র হাওয়া যেন হঠাৎ করেই কার্যকারিতা হারিয়েছে। আপাতদৃষ্টে এই পরিবর্তনকে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কারণ, এই বরফ কেবল ককটেল আর ক্ল্যারেট ওয়াইন ঠান্ডা করার কাজেই লাগত। কিন্তু আমদানি করা বরফের দাপটে দেশীয় পদ্ধতিগুলোর এই পিছু হটা এবং অবমূল্যায়ন আসলে বৃহত্তর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতারই চতুর চাল। এর মাধ্যমে তারা দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সুকৌশলে 'আদিম, অস্পষ্ট, অকার্যকর ও সেকেলে' তকমা দিয়ে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। 

এখানেই শেষ নয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি বরফের বদলে বিপুল জ্বালানি ও শক্তিনির্ভর এই আমদানি প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃহত্তর পালাবদলেরই ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এভাবেই সে সময় ব্রিটিশরা ভারতের বাজার নিজেদের কারখনার কাপড়ে ভাসিয়ে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বখ্যাত সুতিবস্ত্র শিল্পকে পথে বসিয়েছিল। 

১৮৭০-এর দশকের শেষ ও ১৮৮০-এর দশকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যান্য ঔপনিবেশিক শহরগুলোতে নিউ ইংল্যান্ডের বরফ একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু এরপর প্রাকৃতিক চক্রাকার উষ্ণায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণে ম্যাসাচুসেটসে জলবায়ুর উষ্ণতা বাড়তে থাকে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে জমাট বাঁধা এই বরফের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে নিউ ইংল্যান্ডের সেই প্রাকৃতিক বরফের জায়গা পুরোপুরি দখল করে নেয় যান্ত্রিক রেফ্রিজারেশনের মাধ্যমে তৈরি কারখানার কৃত্রিম বরফ। 

ফ্রিজ ছাড়াই মুঘল সম্রাট বাবর, আওরঙ্গজেবরা বরফ সংগ্রহ করার উপায় বের করেছিলেন।

নিউ ইংল্যান্ডের বরফ এসে পৌঁছানোর প্রাক্বালে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ কর্মকর্তা টমাস ওয়াইজ স্থানীয়ভাবে তৈরি বরফের নানা রকমফের নিয়ে লিখেছেন। তিনি 'কঠিন বরফ (পাক্কা বরফ), রাতের একটু পরের দিকে জমতে শুরু করা অপেক্ষাকৃত পাতলা বরফ (পাপড়ি) ও ভোরের ঠিক আগে জমা ফিনফিনে পাতলা বরফের (ফুল বরফ) পার্থক্য নিয়ে লিখেছিলেন। পাক্কা বরফ ছিল জমাট, আস্ত ও পরিপূর্ণভাবে তৈরি; পাপড়ি বরফ কাগজের মতো ফিনফিনে আর ফুল বরফ যেন ভোরের ঠিক আগে প্রস্ফুটিত হওয়া বরফের ফুল।

বরফের এই ধরনগুলোর স্পর্শগত অনুভূতিও একেবারেই আলাদা ছিল। ঠান্ডা করার উপাদান হিসেবে এরা ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করত। এগুলো একই সঙ্গে কাঠিন্য ও ফুলের মতো ভঙ্গুরতার এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তুলত। 

আজ যখন যান্ত্রিক শীতলীকরণ আর রাসায়নিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক পদার্থ পৃথিবীর উষ্ণায়নকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে, তখন ভবিষ্যতের পথ হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সেই পুরোনো, স্নিগ্ধ উপাদান আর কৌশলগুলোর মাঝেই—যেগুলো কৃত্রিমতা দিয়ে নয়, বরং মানুষের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে ছুঁয়ে দিয়ে শীতলতার মায়াবী অনুভূতি তৈরি করত।

 


সূত্র: জার্নাল, এইটিনথ সেঞ্চুরি আর্ট অ্যান্ড কালচার
 

Related Topics

টপ নিউজ

ইজেল / বরফ / মোগল আমল / মুঘল শাসক / বাবর / পোশাক

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • চীনা গণিতবিদ হং ওয়াং এবং ইউ দেং। ছবি: সংগৃহীত
    শতাব্দী পুরনো সমস্যার সমাধান করে গণিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতলেন দুই চীনা গণিতবিদ
  • ছবি: রয়টার্স
    ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে ডায়েট কোকের ক্যান বড় করতে বাধ্য হলো কোকা-কোলা, বাড়ল দামও 
  • ছবি: রয়টার্স
    বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনাকে ‘আজীবন’ নির্বাসনের দাবিতে ২৩ মিলিয়ন স্বাক্ষর!
  • ছবি: সংগৃহীত
    মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার মধ্যে ‘বোমা সদৃশ’ বস্তু উদ্ধার
  • দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াল সিঙ্গার বাংলাদেশ, এক বছর পর মুনাফা
    দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াল সিঙ্গার বাংলাদেশ, এক বছর পর মুনাফা
  • স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
    ‘গুজবে কান দেবেন না’: রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে মির্জা ফখরুল

Related News

  • ঢাকার বরফনামা—কল থেকে কুলফি মালাই
  • যশোর রোডের অ্যালেন গিন্সবার্গের ১০০
  • ম্যাজিক বুট, টোটাল ফুটবল, স্বৈরশাসকের উৎসব এবং ‘ইশ্বরের হাত’
  • পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন: ফিরছে নীল ও জলপাই রঙের শার্ট, প্যান্ট হবে খাকি
  • ৯০ মিনিটের ক্যানভাসে তুলির আঁচড়

Most Read

1
চীনা গণিতবিদ হং ওয়াং এবং ইউ দেং। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক

শতাব্দী পুরনো সমস্যার সমাধান করে গণিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতলেন দুই চীনা গণিতবিদ

2
ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে ডায়েট কোকের ক্যান বড় করতে বাধ্য হলো কোকা-কোলা, বাড়ল দামও 

3
ছবি: রয়টার্স
খেলা

বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনাকে ‘আজীবন’ নির্বাসনের দাবিতে ২৩ মিলিয়ন স্বাক্ষর!

4
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার মধ্যে ‘বোমা সদৃশ’ বস্তু উদ্ধার

5
দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াল সিঙ্গার বাংলাদেশ, এক বছর পর মুনাফা
বাংলাদেশ

দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াল সিঙ্গার বাংলাদেশ, এক বছর পর মুনাফা

6
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

‘গুজবে কান দেবেন না’: রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে মির্জা ফখরুল

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - [email protected]

For advertisement- [email protected]

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab