সরকারের সঙ্গে আলোচনায় রাজি নয় সিজেপি, কাল ভারতজুড়ে পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
কোটি মানুষের মহানগরী ভারতের রাজধানীতে সবার নজর এখন যন্তর মন্তরে। আলোচনা যাই হোক–পক্ষে বা বিপক্ষে–ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তরুণদের আর নেহাত হেসেখেলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দিন দিন যেন আরও দানা বাঁধছে এই আন্দোলন— এমন শঙ্কাও ছড়িয়ে পড়ছে মোদি প্রশাসনে।
এতকিছুর মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বলেছেন, সিজেপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তারা।
তবে গত বুধবার রাতে আরও একবার পুলিশি হামলার পর, ক্ষোভে ফুঁসছে তরুণ তেলাপোকারা। তাই সিজেপির প্রতিনিধিদের সরকারের আমন্ত্রণে যাওয়াকে নাকচ করে দিয়ে বলেছে, আলোচনা হতে হবে বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর অথবা কোনো নিরপেক্ষ স্থানে।
মেডিকেল পরীক্ষার লাগাতার প্রশ্নফাঁসে বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ, কারো কারো আত্মহত্যা—চলে আসছিল কয়েক বছর ধরেই। তবে সবশেষ এটাই রূপ নিয়েছে ককরোচ পার্টির এই বিক্ষোভে। শিক্ষার্থীরা চান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। কিন্তু, তাতে মান থাকে না মোদি সরকারের।
এই অবস্থায়, আজ নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিচারে দ্রুত বিচার আদালত স্থাপন করবে তার সরকার। মোদি লিখেছেন, "তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ ছাড়া অন্যকিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিতে আমরা দ্রুত বিচার আদালত স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনাও দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমাদের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে এটিও যুক্ত হলো। যারা আমাদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চায়, তাদের ক্ষমা করা হবে না।"
তবে মোদির এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি বলেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে দ্রুত বিচার আদালত, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস কেন বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাড়াল—সেটির সমাধান সরকারকেই করতে হবে।
সিজেপির বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়ে এতে যুক্ত হয়ে অনশনরত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক গতকাল বুধবার বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস পেলে তিনি তাঁর আমরণ অনশন ভাঙতে রাজি আছেন।
কিন্তু, দিল্লি পুলিশ এপর্যন্ত ১০টি এজাহার দায়ের করেছে যন্তর মন্তরে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে অজ্ঞাতনামা কিছু ব্যক্তিকে যুক্ত করে। দিল্লি পুলিশ বুধবার এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, এরমধ্যে চারটি এজাহার দায়ের করা হয়েছে সংসদ মার্গ থানায়, তিনটি কান্নট থানায়, আর একটি করে এজাহার দায়ের হয়েছে মন্দির মার্গ, কর্তব্য পথ ও বড়াখাম্বা রোড থানায়।
গতরাতে পুলিশের সাথে সংঘাতের ঘটনায় আজ নয়াদিল্লিতে জারি করা সব নতুন নিষেধাজ্ঞাকেও অমান্য করে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী। নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য এটি এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
গত রাতভর পুলিশ যন্তর মন্তরে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে ও লাঠিচার্জ চালায়—চলতি সপ্তাহে এটি পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ। এর আগে গত সোমবার হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পুলিশের বিধিনিষেধ অমান্য করে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করলে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
তবে বৃহস্পতিবার সকালে সড়ক অবরোধ উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা আবারও বিক্ষোভস্থলে জমায়েত হতে থাকেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের যাতায়াত সীমিত করতে মধ্য দিল্লির ১৬টি স্টেশনে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি দিচ্ছেন একজন পুলিশ সদস্য। কংগ্রেসের পোস্ট করা ওই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই বৃহস্পতিবার ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে মুম্বাই পুলিশ। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য পুলিশের গাড়ির চালক। তদন্ত চলাকালীন তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ওই ভিডিওতে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে পবন সাঙ্গলে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, শিক্ষার্থীরা যেন আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেন। মিথ্যা মাদকের মামলায় ফাসিয়ে তাদের জীবন নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। এমনকি জামিন না পেয়ে শিক্ষার্থীদের যে জেলে থাকতে হবে, সে কথাও বলতে শোনা যায় তাকে।
ওই পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, 'আবার যদি তোমাদের আন্দোলনে দেখি, তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। তোমাদের পকেটে ৫০ গ্রাম পাউডার (মাদক) গুঁজে দেব। জীবন বরবাদ হয়ে যাবে। এমন ব্যবস্থা করব যে কোনোদিন জামিন পাবে না।'
অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা বিক্ষোভের ভিডিও সরিয়ে ফেলতে নিজ শিক্ষার্থীদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অভ টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইআইটি মাদ্রাজের এক শিক্ষার্থী এনডিটিভিকে বলেন, 'শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সমর্থনে তৈরি ইনস্টাগ্রামের ভিডিওগুলো মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।'
ওই শিক্ষার্থী জানান, ডিনের পক্ষ থেকে এই নির্দেশ এসেছে। আইআইটি মাদ্রাজের এক শিক্ষার্থীর কাছে আসা একটি মেসেজে লেখা হয়েছে, 'যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ-সংক্রান্ত পোস্টগুলো মুছে ফেলতে ডিন আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজরকেও ডেকে পাঠানো হয়েছিল। বিক্ষোভের সমর্থনে তৈরি ভিডিওসহ এ-সংক্রান্ত সব পোস্ট আমরা সরিয়ে নিচ্ছি। যেহেতু আপনারা এই ভিডিও তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন, তাই আপনাদের বিষয়টি জানানো প্রয়োজন মনে করলাম।'
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইলা হওয়া একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে যায়, শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা—'যন্তর মন্তরের বিক্ষোভের পাশে আছি। ওয়াংচুক ও অনশনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি। ছাত্রজীবনের মূল্য রয়েছে' ইত্যাদি। ভিডিওটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে আইআইটি মাদ্রাজ।
