‘এটি কেবল শুরু’: আন্দোলন করে মন্ত্রীকে বিদায় জানালেন ভারতের জেন-জিরা, কিন্তু এরপর কী?
ভারতে নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে এর আগে কেবল একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন—তা-ও আবার যৌন অসদাচরণের অভিযোগে। তাই এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাজপথে তীব্র বিক্ষোভের পর গত শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। দেশের বহু তরুণ একে একটি বিরল বিজয় হিসেবে উদযাপন করছেন।
দিল্লির ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আন্দোলনকারী সখীর ভাষায়, 'প্রথমবারের মতো মনে হলো যে আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারি।'
প্রধানের পদত্যাগের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর পুরোনো একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি দম্ভ করে বলেছিলেন, 'আমাদের সরকারে কোনো পদত্যাগের ঘটনা ঘটে না'। এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বিদায় দাবি করা দেশব্যাপী যুব আন্দোলনের আত্মবিশ্বাস আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
সখী জানান, তারা পাঠ্যপুস্তকে গণতন্ত্রে ভিন্নমতের গুরুত্বের কথা পড়ে বড় হয়েছেন, 'কিন্তু মোদির শাসনকালের বছরগুলোতে আমি আমার চারপাশে তা দেখিনি।'
ইনস্টাগ্রামে সখী পুলিশের হামলা ও আটকের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার পাশাপাশি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যঙ্গ করে রিলস শেয়ার করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে অনেক ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে। সখী বলেন, সরকার এই আন্দোলনের গতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে কারণ তারা আন্দোলনের ভাষা ও প্ল্যাটফর্মগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলনা। তার ভাষায়, 'মূলধারার গণমাধ্যম, ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু তারা ইনস্টাগ্রামের ওপর নজর দিতে ভুলে গেছে।'
ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট'-এর প্রশ্ন ফাঁসের জেরে পরীক্ষাটি বাতিল হওয়ার পর গত মে মাসে প্রথম এই প্রতিবাদের সূত্রপাত ঘটে। এর ফলে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। এই কেলেঙ্কারির জেরে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন এবং তাদের পরিবার এই ঘটনার জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি যখন 'ভুয়া ও জালিয়াতি ডিগ্রিসম্পন্ন' বেকারদের ককরোচ বা তেলাপোকার সাথে তুলনা করেছিলেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হয় 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)। এই সিজেপি-ই তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে আন্দোলনের রূপ দেয়। এর প্রতিষ্ঠাতারা দিল্লিতে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
প্রথম দিকে এই বিক্ষোভ তেমন একটা নজর কাড়েনি। কিন্তু গত ১৮ জুলাই পরিস্থিতি বদলে যায় যখন দিল্লি পুলিশ অনশনরত শিক্ষক ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। এর দুই দিন পর, সিজেপি-র ডাকে হাজার হাজার তরুণ সংসদের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পেলেট গানের নির্মম হামলার ভিডিওগুলো দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্ষোভ দমন করার পরিবর্তে মানুষের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ভারতের তরুণদের এই অসন্তোষ এবং রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করার সাহস দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ে ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার জন্য অনলাইনে আহ্বান জানানোর পর ২৬ বছর বয়সী সোমায়া কোর্দেকে তার বাড়িতেই অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তিনি একাধিক বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
তিনি বলেন, প্রধানের পদত্যাগ 'কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এটি কেবল শুরু'। তিনি আরও বলেন, 'আমাদের এই প্রজন্মের অনেকের জন্যই এটি প্রথম রাজপথে নামার অভিজ্ঞতা। তবে কথা বলার মতো আরও অনেক বড় বড় বিষয় রয়েছে এবং আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলব।'
সোমায়াই তার পরিবারের প্রথম নারী যিনি আইন বিষয়ে স্নাতক হয়েছেন এবং সম্প্রতি তিনি স্থানীয় পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তিনি ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটি 'অনগ্রসর' সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি।
অন্যান্য অনেক তরুণ ভারতীয়র মতো সোমায়াও শিক্ষাকেই নিজের জীবন বদলানোর একমাত্র পথ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু নিট প্রশ্ন ফাঁসের এই ঘটনাটি কঠোর পরিশ্রমের যোগ্য ফল পাওয়ার সেই পুরো ব্যবস্থার ওপর তাঁর বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সোমায়ো বলেন, 'স্কুল-কলেজগুলো বেসরকারি করা হচ্ছে, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, এমনকি পড়াশোনা শেষ করলেও পর্যাপ্ত চাকরি নেই। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এই সবকিছুই সরকারের জবাবদিহিতার ওপর বড় প্রশ্ন তোলে।'
সোমায়ার এই হতাশা মূলত ভারতের সামগ্রিক চিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার গত বছরের ১৩.৮% থেকে বেড়ে এ বছরের জুনে ১৬.২%-এ পৌঁছেছে।
এমনকি গ্র্যাজুয়েট বা ডিগ্রিধারীরাও চাকরির জন্য লড়াই করছেন। ২০২৬ সালের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ৭ শতাংশেরও কম মানুষ পড়াশোনা শেষ করার এক বছরের মধ্যে স্থায়ী বেতনের চাকরি পেয়েছেন এবং ৪ শতাংশেরও কম মানুষ তথাকথিত 'হোয়াইট কলার' বা ডেস্ক জব পেয়েছেন।
তরুণদের সব জড়তা ভেঙে ক্ষোভ প্রকাশের এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছিল এই বিক্ষোভ। তাদেরই একজন ১৮ বছর বয়সী হর্ষবর্ধন কদম। গত বছর বাবার মৃত্যুর পর মায়ের পাশে দাঁড়াতে পড়াশোনা শেষ করেই সে ল্যাপটপ বিক্রির একটি খণ্ডকালীন কাজ নেয়।
গত ২৩ জুলাই মুম্বাইয়ে এক প্রতিবাদ মিছিলের সময় হর্ষবর্ধনের ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামের ওই রিলটিতে—যা ইতিমধ্যে ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) বার দেখা হয়েছে—দেখা যাচ্ছে, পুলিশের ভ্যানে তোলার সময় এক পুলিশ সদস্য তাকে একটি ভুয়া মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। ঘটনার পর ওই কনস্টেবলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
হর্ষবর্ধন বিবিসি-কে বলেন, 'আমি তার বরখাস্ত হোক তা চাইনি। আমি কেবল একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে পুলিশ আমার সাথে কেমন আচরণ করছিল, তা নথিবদ্ধ করতে চেয়েছিলাম।' শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে সে বলে, 'এটি কেবল শুরু। এটি প্রমাণ করে যে পরবর্তীতে আমরা আওয়াজ তুললে সরকারও ভয় পাবে।'
গুয়াহাটির ২৯ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার স্বরাজ প্রিয় বলেন, মোদি সরকারের অধীনে বছরের পর বছর ধরে প্রতিবাদ করেও কোনো পরিবর্তন না আসায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই আন্দোলন তার মনে নতুন আশা জাগিয়েছে। তিনি বলেন, 'এই আন্দোলন গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা ও ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা ফিরিয়ে এনেছে এবং এটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।'
মোদি সরকার যে এখন বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভস্থলে এখন পোস্টার দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা—'প্রধান তো কেবল একটি উদাহরণ মাত্র। এবার মোদির পালা।'
তবে এই বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি কিছু শঙ্কাও কাজ করছে। পাটনার ৩০ বছর বয়সী তরুণী বরুণী পূর্বা—যিনি একজন হবু অধ্যাপক এবং প্রায় এক দশক ধরে ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত—তিনি বলেন, প্রধানের পদত্যাগ প্রমাণ করে যে মোদি সরকারকেও 'হাঁটু গেড়ে বসানো সম্ভব'।
তবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বা 'উইচ হান্ট' হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। গ্রেপ্তার এড়াতে গত সপ্তাহে তিনি আদালতে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে পুলিশ ১০০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেছে এবং ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, মোদির অধীনে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ 'নিয়মিতভাবে অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের ভুয়া আইনে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছে।'
সরকারের এই দমন-পীড়নের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও, বরুণী মনে করেন যে এই আন্দোলন যুবসমাজকে এক নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তাদের গভীর অসন্তোষগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সরকারের পক্ষে সবকিছু আবার 'স্বাভাবিক' নিয়মে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
দিল্লির একটি বিক্ষোভস্থলের দেয়ালে লেখা এক গ্রাফিতি যেন তরুণদের এই মনোভাবকেই ফুটিয়ে তুলেছে: 'আমাদের চাকরি নেই। যদি তোমরা এটি মুছেও দাও, আমরা আগামীকাল আবার ফিরে আসব।'
