যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) মেয়াদ না বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এই ঘোষণার মাধ্যমে ৩২ বছর বয়সী উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ১০ বছরের একটি ক্ষণগণনা শুরু হবে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চুক্তিতে যুক্ত করা 'সানসেট ক্লজ' (অবসান সংক্রান্ত শর্ত) অনুযায়ী, এ ঘোষনা এলে ছয় বছরের একটি পর্যালোচনা পর্ব শুরু হবে এবং কোনো পক্ষ নতুন করে নবায়নের ইচ্ছা না জানালে ১০ বছর পর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।
তবে এখনই চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। বরং গাড়ি উৎপাদনে মার্কিন উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো এবং উত্তর আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্যের প্রবেশ ঠেকানোর মতো বিষয়ে নতুন শর্ত আরোপে চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার বাণিজ্য প্রধানরা ভার্চুয়াল বৈঠকে বসবেন। সেখানে তিন দেশকে জানাতে হবে, তারা চুক্তিটি আরও ১৬ বছরের জন্য বাড়াতে চায় কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার এখনও এ বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। তবে তিনি ২০ জুলাই থেকে সপ্তাহজুড়ে মেক্সিকোর সঙ্গে তৃতীয় দফার আলোচনার সময় নির্ধারণ করেছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি চুক্তি বাতিলের পরিবর্তে এতে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার বিষয়টি অব্যাহত রাখতে চান।
সাবেক ইউএসটিআর জেনারেল কাউন্সিল গ্রেটা পিশ বলেন, 'আমরা ধারণা করছি ১ জুলাই আসবে এবং চলে যাবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটি নবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করবে না।' তবে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবিগুলো কতটা প্রকাশ্যে তুলে ধরবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে মেক্সিকোর অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্ড মঙ্গলবার বলেন, তিনি মনে করেন না যে ত্রিপক্ষীয় এই চুক্তি শেষ হয়ে যাবে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউমও চুক্তিটি আরও ১৬ বছরের জন্য বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠিতে সই করেছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তিন দেশের মধ্যে 'গঠনমূলক আলোচনার' আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমাদের অগ্রাধিকার একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানো। আমরা এই চুক্তির মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত।'
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যে একতরফাভাবে এই চুক্তির অধীনে থাকা শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আসা গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এর জবাবে কানাডাও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে।
যদি তিন দেশ চুক্তির সংশোধিত রূপ নিয়ে একমত হতে না পারে, তবে আগামী ১০ বছর ধরে প্রতি বছর এই ধরণের পর্যালোচনা বৈঠক চলবে। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান না মিললে ২০৩৬ সালের ১ জুলাই এই ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালের 'নাফটা' চুক্তি বাতিল করে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে ইউএসএমসিএ চুক্তি চালু করেছিলেন এবং একে 'সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও লাভজনক' চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু মেক্সিকোর সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকায় দ্রুতই এই চুক্তি নিয়ে তার আগ্রহ কমতে থাকে। বর্তমানে তিনি এই চুক্তি নবায়নের চেয়ে মেক্সিকো ও কানাডার ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করতেই বেশি আগ্রহী।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কেবল মেক্সিকোর সঙ্গেই আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনা চালাচ্ছে। দুগ্ধবাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্য বিরোধের কারণে কানাডার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি, যদিও দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
উত্তর আমেরিকার গাড়ি নির্মাতারা ইউএসএমসিএকে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হিসেবেই বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি গাড়ি তৈরির আগে যন্ত্রাংশ একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সীমান্ত অতিক্রম করে।
মেক্সিকোর সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, উত্তর আমেরিকায় তৈরি প্রতিটি গাড়িতে অন্তত ৫০ শতাংশ মার্কিন উপাদান থাকতে হবে। এ ছাড়া উৎপত্তি-সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে সমঝোতা হলে মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর কম শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
মেক্সিকোর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসএমসিএর লক্ষ্য নিয়ে দুই দেশ একমত। এখন সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় নিয়েই আলোচনা চলছে।
