ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করল হিজবুল্লাহ
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লেবাননের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, বুধবার ইসরায়েল ও লেবানন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে এর শর্ত হলো, হিজবুল্লাহকে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাদের সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে।
কিন্তু হিজবুল্লাহ বৃহস্পতিবার এই শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে, যদিও শুরুতে শিয়া সশস্ত্র সংগঠনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা জানিয়েছিল।
হিজবুল্লাহর সম্মতি ছাড়া যুদ্ধবিরতির এই চুক্তি কেবল 'কাগজে-কলমে' সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি, যা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের কর্মকর্তারা বারবার তুলে ধরেছেন।
গত সোমবার বৈরুতে ব্যাপক হামলা চালানোর ইসরায়েলের পরিকল্পনা থামিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল হিজবুল্লাহর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ হিসেবে।
ট্রাম্প এক টেলিফোন আলাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অশালীন ভাষাও ব্যবহার করেন।
ওই ফোনালাপের পর ট্রাম্প লেবাননে একটি নতুন আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এতে ইসরায়েল বৈরুতে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, আর এর বিনিময়ে হিজবুল্লাহ সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি শহরগুলোতে হামলা বন্ধ করবে বলে বলা হয়।
তবে এই ঘোষণা সত্ত্বেও গত ৪৮ ঘণ্টায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের অভ্যন্তরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর একাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাংবাদিকদের বলেন, লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনকে অবহিত করবে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা পাওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে 'লেবাননের জনগণের একটি অংশকে নিশ্চিহ্ন করার রূপরেখা' বলে অভিহিত করেন।
কাসেম বলেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দেশের কোনো অংশে ইসরায়েলি সেনা অবস্থান করলে হামলা অব্যাহত থাকবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, 'যতদিন আমাদের গ্রামগুলোতে বোমা হামলা চলবে এবং আমাদের মানুষ নিহত হবে, ততদিন উত্তর ইসরায়েল নিরাপদ থাকবে না।'
হিজবুল্লাহ যদি সত্যিই এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এবং উত্তর ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার জন্য 'সবুজ সংকেত' দিতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতায় দুই দিনব্যাপী আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবাননের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই নতুন চুক্তি সম্পন্ন হয়।
এই সমঝোতার অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ দক্ষিণ লেবাননে কিছু 'পাইলট অঞ্চল' গঠনে সম্মত হয়েছে।
এসব এলাকায় কেবল লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং সেখানে হিজবুল্লাহর কোনো উপস্থিতি থাকবে না—তা নিশ্চিত করবে।
এর বিনিময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ওই অঞ্চলগুলো থেকে সরে যাবে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'এই পদক্ষেপগুলো একটি বিস্তৃত শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির দিকে অগ্রগতির পথ তৈরি করবে।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'সব দেশ পুনর্ব্যক্ত করেছে যে ইসরায়েল ও লেবাননের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দুই সার্বভৌম সরকারের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে।'
তারা আরও বলেছে, 'কোনো রাষ্ট্র বা অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ যেন লেবাননের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করতে না পারে—সে ধরনের যেকোনো প্রচেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।'
যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েল ও লেবানন পুনর্ব্যক্ত করেছে যে একে অপরের বিরুদ্ধে তাদের কোনো বৈরী উদ্দেশ্য নেই।
তারা আস্থা তৈরির লক্ষ্যে, বাকি থাকা সব বিরোধপূর্ণ বিষয় সমাধানের জন্য এবং দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া, উভয় পক্ষ একটি বিস্তৃত চুক্তি নিয়ে পরবর্তী দফা আলোচনা করতে ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছে।
