তুরস্ককে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশের
বাংলাদেশ সফররত তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বৈঠকে তুরস্ককে বাংলাদেশে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ড. খলিলুর রহমান এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনার বিষয়ে আলোকপাত করেছি। আমরা একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছি। আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আমি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা সম্পর্কে অবহিত করেছি এবং তুরস্কের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। বাংলাদেশে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় তুরস্কের প্রতি আমরা আমাদের পূর্ণ সমর্থন জানাই।"
বিনিয়োগের সম্ভাব্য খাত হিসেবে তিনি টেক্সটাইল ও অ্যাপারেলস, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আইসিটি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহনের কথা উল্লেখ করেন।
ড. খলিলুর রহমান বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন তুলে ধরে বলেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন আমাদের এই সরকার 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' দর্শনে পরিচালিত। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং আমাদের জনগণের কল্যাণ রক্ষায় আমাদের আপসহীন অঙ্গীকার। একই সাথে এটি আমাদের এই বিশ্বাসকেও প্রতিফলিত করে যে— আমাদের সীমান্তের বাইরে আমাদের বন্ধু এবং অংশীদার রয়েছে, কোনো প্রভু নয়।"
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশ সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে কূটনীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আমরা একমত হয়েছি যে বাংলাদেশ তুরস্কের মতো বন্ধুদের সঙ্গে সহযোগিতা, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রচারের জন্য কাজ চালিয়ে যাবে।"
তুরস্কের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আমরা তুরস্ককে ধন্যবাদ জানাই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য। বিশেষ করে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আপনাদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানোর জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।"
এছাড়াও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় তুরস্কের অমূল্য সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্ককে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ বা বৃত্তি বাড়ানোর অনুরোধ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। তিনি দুই দেশের মধ্যে ছাত্র বিনিময়সহ জনগণের মধ্যে যোগাযোগঅ্যা উন্নত করার ওপর জোর দেন।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, "৯ বছর পেরিয়ে গেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই সংকট সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনই আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা কৃতজ্ঞ যে তুরস্ক এই সংকট সমাধানে মানবিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।"
পরিশেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে। তুরস্কের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে এবং অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় ও কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এবং বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
