ইসরায়েলি হামলার শঙ্কায় যুদ্ধবিমানের পাহারায় ইরানি প্রতিনিধিদের দেশে পৌঁছে দিয়েছিল পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অমীমাংসিত শান্তি আলোচনা শেষে ফেরার পথে ইরানি প্রতিনিধিদলকে নিরাপত্তা দিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল পাকিস্তান। ইসরায়েল তাদের হত্যা করতে পারে—ইরানি আলোচকদের এমন আশঙ্কার পর পাকিস্তান বিমানবাহিনী এই অভিযান পরিচালনা করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অভিযানের বিষয়ে অবগত দুটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, প্রতিনিধিদলকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে প্রায় দুই ডজন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল পাকিস্তান। এর পাশাপাশি আকাশপথে নজরদারির জন্য 'এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম' ব্যবহার করা হয়।
একটি সূত্র জানায়, ইরানিরা চাইলে পরবর্তী আলোচনাগুলোতেও একই ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত তৃতীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই আলোচনার পরবর্তী ধাপ অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং তার আগে থেকেই এমন নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ চলছে।
তবে তেহরানের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানি প্রতিনিধিরা হুমকির সম্ভাবনার কথা বলার পর পাকিস্তানই নিরাপত্তার ব্যাপারে জোর দিয়েছিল।
ইরানি প্রতিনিধিদলের ভ্রমণকালীন সম্ভাব্য হুমকি এবং ইরানের আকাশসীমায় পাকিস্তানি বিমানের পাহারার বিষয়টি এর আগে কখনো প্রকাশ পায়নি।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেনেভায় ইরানের স্থায়ী মিশন, পাকিস্তানের সামরিক ও বিমানবাহিনী এবং ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
একজন সূত্র জানান, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানিরা বুঝতে পারছিল যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। তাদের সন্দেহ ছিল, তাদের লক্ষ্য করে হামলা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, 'একজন পাইলটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি ছিল একটি বিশাল অভিযান। আপনি আলোচনার জন্য আসা একটি প্রতিনিধিদলের দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং তাদের আকাশপথে নিরাপত্তা দিচ্ছেন।'
ওই সূত্র আরও বলেন, 'আমরা তাদের একেবারে তেহরান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। তারা এখানে (পাকিস্তানে) যতক্ষণ ছিলেন, তার বাইরেও তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদেরই ছিল।'
একজন কর্মকর্তা জানান, ইরানে যাওয়া এই বহরে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সবচেয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান—চীন নির্মিত 'জে-১০' এয়ারক্রাফটও ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ (যিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও পাইলট) এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। দুটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তারাই এই নিরাপত্তা পাহারার অনুরোধ করেছিলেন, যা সাধারণ প্রটোকলের আওতাও পড়ে না।
তবে ইরানের কূটনৈতিক সূত্র জানান, ইরানিরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনুরোধ করেনি। কিন্তু 'ইসরায়েল উড়োজাহাজেও হামলা করতে পারে'—এমন আশঙ্কা তারা উড়িয়ে দেয়নি। এর পরই পাকিস্তান পাহারার বিষয়ে জোর দেয়।
ওই কূটনীতিক আরও জানান, প্রতিনিধিদলটি শেষ পর্যন্ত তেহরানে অবতরণ করেনি। তবে তাদের কোথায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি প্রকাশ করতে রাজি হননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর ইসরায়েলের 'হিট লিস্টে' বা হামলার তালিকায় আরাগচি ও গালিবাফের নাম ছিল। পরে ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের কারণে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। কারণ তারা নিহত হলে আলোচনা করার মতো আর কেউ থাকবে না।
গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, 'আমি এই সন্ত্রাসী সংগঠনের (ইরান) কোনো নেতার নামে জীবন বিমা করব না। আমরা কী পরিকল্পনা করছি বা কী করতে যাচ্ছি, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখানে দেওয়ার ইচ্ছা আমার নেই।'
অন্যদিকে, গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, 'আজ রাতে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফেরানো যাবে না। আমি এটা চাই না, তবে সম্ভবত এমনটাই হতে যাচ্ছে।'
