দীর্ঘ বিরতির পর স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ওয়্যারেবল ডিভাইস নিয়ে বাংলাদেশে ফিরছে হুয়াওয়ে
দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর আবারও বাংলাদেশের কনজ্যুউমার ইলেকট্রনিকস ও আইসিটি বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে আসতে প্রস্তুত হচ্ছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে। কোম্পানিটির লক্ষ্য দেশের ক্রমবর্ধমান প্রিমিয়াম স্মার্টফোন ও স্মার্ট ডিভাইসের বাজারে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করা।
চীনা এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আগামী ৮ জুন বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ভোক্তা ব্যবসা ফের চালু করবে। অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি ও আসল যন্ত্রাংশের সুবিধাসহ ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, অডিও পণ্য ও ওয়্যারেবল ডিভাইসের বড় পোর্টফোলিও বাজারে নিয়ে আসছে তারা।
স্থানীয় পরিবেশক ডিএক্স গ্রুপের মাধ্যমে এই পুনর্যাত্রা শুরু হবে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর বড় খুচরা বিক্রেতা ও শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হুয়াওয়ের পণ্য বিপণনের পরিকল্পনা করেছে।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা জানান, হুয়াওয়ে এবং তার স্থানীয় অংশীদার ইতিমধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনসহ সব ধরনের নিয়মকানুন-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন করেছে।
হুয়াওয়ে একসময় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ছিল। তবে ২০১৯ সালে মার্কিন সরকার কোম্পানিটিকে তাদের 'এনটিটি লিস্ট'-এ অন্তর্ভুক্ত করার পর হুয়াওয়ের অফিশিয়াল স্মার্টফোন ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে। এর ফলে মার্কিন প্রযুক্তিতে কোম্পানিটির প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ে।
এই বিধিনিষেধের কারণে গুগল হুয়াওয়ের নতুন স্মার্টফোনগুলোর জন্য তাদের সহায়তা স্থগিত করে। ফলে হুয়াওয়ে ডিভাইসগুলো গুগল প্লে স্টোর ও বহুল ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি গুগল অ্যাপ্লিকেশনসহ গুগল মোবাইল সার্ভিসেস ব্যবহারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
গুগলের সেবাগুলো না থাকায় বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারে হুয়াওয়ের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব দেশের গ্রাহকেরা গুগলের ইকোসিস্টেমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন।
পরে ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি জায়ান্টের অফিশিয়াল স্মার্টফোন কার্যক্রম ধীরে ধীরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
হুয়াওয়ে বাংলাদেশের একাধিক সূত্র টিবিএসকে জানিয়েছে, পুনর্যাযাত্রা শুরুর অনুষ্ঠানে কোম্পানিটি তাদের কনজ্যুমার ডিভাইসের বিস্তৃত লাইনআপ উন্মোচন করবে।
মূল আকর্ষণীয় পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাগশিপ হুয়াওয়ে মেট ৮০ প্রো, আল্ট্রা-প্রিমিয়াম ফোল্ডেবল হুয়াওয়ে মেট এক্স৭ ও লাইফস্টাইল-কেন্দ্রিক হুয়াওয়ে নোভা ১৫ ম্যাক্স। এগুলো মূলত প্রিমিয়াম ব্যবহারকারী ও তরুণ গ্রাহকদের লক্ষ্য করে বাজারে আনা হচ্ছে।
স্মার্টফোনের পাশাপাশি কোম্পানিটি তাদের জনপ্রিয় মেটপ্যাড ট্যাবলেট, স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ট্র্যাকার ও অডিও অ্যাকসেসরিজসহ আরও বেশ কিছু পণ্য বাজারে আনবে।
প্রাথমিক প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওতে হুয়াওয়ে মেট ৮০ প্রো, হুয়াওয়ে মেট এক্স৭ ফোল্ডেবল স্মার্টফোন, হুয়াওয়ে নোভা ১৫ ম্যাক্স, হুয়াওয়ে মেটপ্যাড ১১.৫ ট্যাবলেট, হুয়াওয়ে ওয়াচ ফিট ৫ সিরিজ, হুয়াওয়ে ফ্রিবাডস ওয়্যারলেস ইয়ারবাডস ও হুয়াওয়ে ফ্রিক্লিপ ওপেন-ইয়ার অডিও ডিভাইস থাকার কথা রয়েছে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রিমিয়াম ও মাঝারি বাজেটের (মিড-রেঞ্জ) স্মার্টফোন বাজার ধরা। এখানকার গ্রাহকেরা এখন দিন দিন উন্নত ক্যামেরা প্রযুক্তি, প্রোডাক্টিভিটি ফিচার ও এআই-চালিত কার্যক্ষমতার দিকে ঝুঁকছেন।
অ্যাপ ইকোসিস্টেমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
হুয়াওয়ে বাংলাদেশের মার্কেটিং ম্যানেজার ফারুক রহমান জানান, কোম্পানিটি তাদের নিজস্ব অ্যাপগ্যালারি প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম নিয়ে বাজারে ফিরছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের অ্যাপগ্যালারিতে এখন হোয়াটসঅ্যাপ, বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন, ইমেইল সার্ভিসসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা আছে। এছাড়া আমাদের নিজস্ব ব্রাউজার আছে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা আগে গুগল প্লে স্টোর থেকে যেসব অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করতেন, সেগুলো ব্যবহারের জন্য আমাদের বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।'
ফারুক আরও বলেন, গুগলের প্রথাগত ইকোসিস্টেমের ওপর নির্ভর না করেই গ্রাহকদের নির্বিঘ্ন সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে হুয়াওয়ের সর্বাধুনিক ডিভাইসগুলো তৈরি করা হয়েছে।
কোম্পানিটির তথ্যমতে, অ্যাপগ্যালারি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অ্যাপ মার্কেটপ্লেসে পরিণত হয়েছে। একইসঙ্গে হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস (এইচএমএস) বিশ্বজুড়ে গ্রাহকদের ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট করে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন এবং যেগুলো এখনো অ্যাপগ্যালারিতে পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলো বিকল্প অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে ডাউনলোড করা যাবে।
টিবিএসের সঙ্গে আলাপকালে ফারুক বলেন, হুয়াওয়ের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের প্রিমিয়াম ও আপার মিড-রেঞ্জ স্মার্টফোন বাজার।
ডিএক্স গ্রুপের লিড মার্কেটার মো. জান্নাতুল নাঈম জানান, কোম্পানিটি পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে হুয়াওয়ের খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো দেশব্যাপী ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা বড় শহর এবং গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, সুমাশ টেক, দারাজ ও পিকাবুসহ আমাদের প্রধান রিটেইল অংশীদারদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।'
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হুয়াওয়ের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এখন দেশের এই বাজারতি স্যামসাং, শাওমি, অপো, ভিভো ও অনার-এর দখলে রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে সংযোজনের পরিকল্পনা
কোম্পানির কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুধু আমদানি ও বিপণে সীমাবদ্ধ না থেকে হুয়াওয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে।
আপাতত অফিশিয়াল বিক্রয় চ্যানেলের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ডিভাইস সংযোজন করার সম্ভাবনা যাচাই করছে কোম্পানিটি।
এ ধরনের পদক্ষেপ দেশীয় ইলেকট্রনিকস উৎপাদন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। এর ফলে হুয়াওয়ে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারবে।
গত কয়েক বছর ধরে কনজ্যুমার ডিভাইস ব্যবসা মূলত নিষ্ক্রিয় থাকলেও হুয়াওয়ে তাদের এন্টারপ্রাইজ ও টেলিকমিউনিকেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশে শক্তিশালী উপস্থিতি ধরে রেখেছে।
টেলিকম নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল রূপান্তর প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোম্পানিটি এখনো দেশের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
