বৈশ্বিক তেল সংকট মোকাবিলায় চীনের সহায়তা চান ট্রাম্প, তবে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কম
আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু, তার আগে ওই আলোচনায় বসার নতুন একটি শর্ত দিয়েছেন ট্রাম্প। আর তা হলো– হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে চীনকে সহায়তা করতে হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য এই দাবি মেনে নেওয়ার তেমন কোনো প্রণোদনা নেই।
ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ায়, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কার্যত আটকে গেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সংকটের মুখে পড়ে ট্রাম্প এখন ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য-সহ অন্যান্য দেশকে একসঙ্গে কাজ করে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনকে রাজি করাতে ট্রাম্প বাড়তি চাপও দিচ্ছেন। ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই মাসের শেষে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে তিনি জানতে চান চীন সহায়তা দেবে কি না। এর উত্তর না পেলে তিনি বেইজিং সফর স্থগিত করার কথাও ভাবতে পারেন।
ট্রাম্প বলেন, "যারা এই প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদেরই উচিত সেখানে কোনো সমস্যা না হয়—তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করা। আমার মনে হয় চীনেরও সাহায্য করা উচিত।"
তবে অনেকের মতে এই অনুরোধ অস্বাভাবিক। কারণ এতে ট্রাম্প মূলত চীনকে এমন একটি যুদ্ধে নিজের সামরিক সরঞ্জাম ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে বলছেন, যা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধের লক্ষ্য আবার ইরান—যে দেশটির সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সম্ভাব্য তেল সংকট মোকাবিলার জন্য আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। দেশটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুদ গড়ে তুলেছে, আমদানি উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে এবং বায়ু, সৌর ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের লেনদেন চীনের মুদ্রা ইউয়ানে করলে—কিছু ট্যাংকারকে নিরাপদে হরমুজ অতিক্রম করার অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে ইরান।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইস্ট এশিয়ান ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক বার্ট হফম্যান বলেন, "চীনারা হয়তো বলবে—ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করি। কৌশলগতভাবে তারা বেশ নিরাপদ অবস্থানে আছে, তাই তাদের কিছুটা কৌশলগত সুযোগ রয়েছে।"
প্রাধান্য কার হাতে
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। এতে করে আগে ঘোষণা দেওয়া বেইজিংয়ের শীর্ষ বৈঠক এখন আলোচনার কেন্দ্র থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। একই সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
চীনের ভেতরে এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক আনন্দের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বেইজিংভিত্তিক গবেষণা সংস্থা–সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন-এর সভাপতি হেনরি হুইয়াও ওয়াং বলেন, "ট্রাম্প এখন বিশ্বে অনেকটা একা। কেউ সত্যিকার অর্থে তাকে সমর্থন করছে না। ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছেন এবং নিজেই এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন।"
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সহযোগিতার আহ্বান জানানো হলেও—জাতীয়তাবাদী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছে।
পত্রিকাটির এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, "এটা কি সত্যিই 'দায়িত্ব ভাগাভাগি'—নাকি ওয়াশিংটনের শুরু করা, কিন্তু শেষ করতে না পারা একটি যুদ্ধের ঝুঁকি ভাগাভাগি করার চেষ্টা?"
আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ট্রাম্পের আহ্বানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তবে তিনি আসন্ন বৈঠকের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ট্রাম্পের চীন সফর নিয়ে দুই দেশ যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
এরই মধ্যে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ফ্রান্সের প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা কৃষিপণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা করেছেন।
চীনের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে এ বছরের শুরুতে, যখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে রায় দেন। সর্বোচ্চ আদালত বলেন, সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন।
এখন তার প্রশাসন একই পরিমাণ শুল্ক আরোপের বিকল্প পথ খুঁজছে।
ওয়াং বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের যতোটা চীনকে প্রয়োজন, সেটা চীনের যতোটা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন–তার চেয়ে বেশি।"
চীনের প্রভাব
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ন্যাটো জোটকে সতর্ক করেছেন যে, তারা যদি (হরমুজে) যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান না মানে, তাহলে এই জোটের ভবিষ্যৎ "খুব খারাপ" হতে পারে। তবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া-সহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশ এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
অন্যদিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং দেশটির তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে চীনের ট্রাম্পের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম।
চীনা কর্মকর্তারা ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো—যেমন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরানের হামলারও সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং সম্ভবত হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চীনের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জা ইয়ান চং বলেন, "এটা এখনো চীনের জন্য বেদনাদায়ক পরিস্থিতি। তারা অবশ্যই চায় তাদের অর্থনীতি সচল থাকুক।"
২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে চীন ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
চং বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিং অনেক রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। তারা অবশ্যই পরিস্থিতি স্থিতিশীল দেখতে চায় এবং এই অঞ্চলে নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরতে চায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রচেষ্টার ওপর ছায়া ফেলছে।"
