নতুন সর্বোচ্চ নেতা এখনও জনসমক্ষে আসেনি, ইরানের শাসন কাঠামোয় হয়তো এর প্রয়োজনও নেই
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মোজতবা খামেনি এখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার নামে একটি দীর্ঘ বিবৃতি পাঠ করা হয়। এর মাধ্যমেই ইরানিরা প্রথমবারের মতো তার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পায়।
পরের দিনটি ছিল নেতা হিসেবে তার প্রথম শুক্রবার এবং একই সঙ্গে আল কুদস দিবস। সাধারণত এসব দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জনসমক্ষে আসেন। কিন্তু মোজতবা আসেননি।
তাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করার পর আজ নিয়ে ছয় দিন পার হলো। কিন্তু ইরানের জনগণ এখনো তাকে দেখেনি, এমনকি তার কণ্ঠও শোনেনি।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার প্রথম দিনেই মোজতবা আহত হন।
তার পায়ে চিড় ধরেছে, বাঁ চোখে কালশিটে পড়েছে এবং মুখে সামান্য কেটে গেছে। উল্লেখ্য, ওই একই হামলায় তার বাবা এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে এবং সরকারের একজন উপদেষ্টা পরে লিখেছিলেন যে, মোজতবা আহত হলেও তিনি নিরাপদ স্থানে আছেন এবং ভালো আছেন।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছেন যে, মোজতবার চেহারা সম্ভবত 'বিকৃত' হয়ে গেছে। এদিকে ইসরায়েল আগেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিল যে, নতুন যেকোনো সর্বোচ্চ নেতাই তাদের লক্ষ্যবস্তু হবেন।
তার এই অনুপস্থিতি অবশ্য সরকার সমর্থকদের উৎসাহে মোটেও ভাটা ফেলতে পারেনি। হাজার হাজার মানুষ তার প্রতি আনুগত্য জানাতে রাস্তায় নেমেছে।
বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিনগুলোতে গণজমায়েতের মাধ্যমে সমর্থন সুসংহত করার চেষ্টা করছে সরকার। আর এই আনুগত্যের শপথই এখন তাদের মূল স্লোগান হয়ে উঠেছে।
তবুও, নতুন নেতার এই টানা অনুপস্থিতি একটি গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়: যুদ্ধের এই ডামাডোলে আসলেই কে দেশ চালাচ্ছে?
বাবার শাসনামলের প্রায় চার দশক ধরে মোজতবা খামেনি মূলত পর্দার আড়ালেই কাজ করেছেন। তার যথেষ্ট প্রভাব থাকলেও জনসমক্ষে তাকে খুব কমই দেখা যেত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে এই সামরিক সংঘাতের সময় তিনি হঠাৎ করেই ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদে আসীন হলেন। কিন্তু তার এই অদৃশ্য থাকাটা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার ধরনে এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে হয়তো শীর্ষ ব্যক্তির চেয়ে দেশের প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আড়ালে থাকা এক নেতা
রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ধর্মীয় বক্তারা তাদের মঞ্চ ব্যবহার করে অনুসারীদের নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহ্বান জানাচ্ছেন।
প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মাহমুদ করিমি তো একধাপ এগিয়ে বলেছেন, 'কেউ তাকে কখনো দেখেনি, এটাই তার চরিত্র সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা দেয়।' অর্থাৎ খামেনির এই আড়ালে থাকাকে তারা দুর্বলতা নয়, বরং একটি গুণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
তবে সরকার বিরোধীদের কাছে নতুন নেতার এই অনুপস্থিতি, তা আক্ষরিক হোক বা রূপক অর্থে—হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মোজতবা খামেনির কার্ডবোর্ডের কাটআউটকে ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়ে নানা এডিটেড ছবি ছড়ানো হচ্ছে। তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হচ্ছে মিম।
নতুন নেতার সত্যতা যাচাই করা যায় এমন ভিডিও এতই কম যে, সরকারি সংবাদমাধ্যম এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলো এখন সমর্থন বাড়াতে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি ভিডিও ছড়াচ্ছে।
এসব ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে, নতুন নেতা বিশাল জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, যা বাস্তবে কখনোই ঘটেনি।
এআই দিয়ে তৈরি অন্য কিছু ছবিতে দেখা যায়, বয়োজ্যেষ্ঠ খামেনি তার ছেলের হাতে বিপ্লবের দায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন, অথবা মোজতবা খামেনি নিহত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে জড়িয়ে ধরে আছেন।
তেহরানের এক ব্যক্তি ব্যঙ্গ করে বলেন, 'তারা তাকে এআই সুপ্রিম লিডার ডাকছে।'
মিথ আর ইতিহাসে গড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি
মোজতবা খামেনি বছরের পর বছর ধরে ইরানের বিশাল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর নেপথ্যে কাজ করেছেন। বাবার প্রায় চার দশকের শাসনামলে তাকে খুব একটা দেখা বা শোনা যায়নি।
যুদ্ধের সময় হঠাৎ তার এই উত্থান এবং তার অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মিথ এবং শিয়া ধর্মতত্ত্বের এক গভীর চিত্রকল্প তৈরি করেছে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও ইতিহাসবিদ আরাশ আজিজি বলেন, প্রয়াত খামেনির এই 'আইকনিক হত্যাকাণ্ড' সরকারের জন্য শিয়া বয়ান ব্যবহারের দারুণ এক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'তারা স্বাভাবিকভাবেই মোজতবাকে নিয়েও একই থিম ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। মোজতবা একজন 'শহীদ ইমাম'-এর সন্তান, যিনি নিজেও আহত হয়েছেন। তার এই অবস্থা কারবালার যুদ্ধের শিয়া সাধুদের মতোই।'
ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ ও সংকটের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঠিক এক বছর পর, ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ইরানে আক্রমণ করেন। আট বছর ধরে চলা সেই ভয়াবহ যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয় এবং দেশের রাজনীতি নতুন রূপ পায়।
এখন পর্যন্ত সরকারের অনুগতরা নতুন নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে খুব একটা উদ্বেগ দেখাননি।
তারা তার প্রকাশ্যে আসার অপেক্ষায় আছেন বলেই মনে হচ্ছে। অতীতের সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনেক সরকার সমর্থককে যুদ্ধকালীন সীমাবদ্ধতা বুঝতে শিখিয়েছে।
সিংহাসনের পেছনের আসল শক্তি
লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, 'সরকার কিছুদিন নেতার প্রকাশ্যে আসা ছাড়াই টিকে থাকতে পারবে।'
তিনি বলেন, 'নেতাকে না দেখলেই যে স্বল্পমেয়াদে বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে, তা নয়। বিশেষ করে যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক কাজ করে এবং সিদ্ধান্তগুলোতে সমন্বয়ের ছাপ থাকে।'
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, তেহরানে এখন সর্বোচ্চ নেতার দৃশ্যমানতার চেয়ে তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐক্য বেশি জরুরি।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মোজতবার উপস্থিতি ছাড়াই সম্ভবত যুদ্ধকালীন কৌশল পরিচালনা করছে।
রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষে তার নিয়োগই হয়তো সামরিক নেতৃত্বকে (আইআরজিসির নেতৃত্বে) সেই রাজনৈতিক বৈধতা বা ঢাল দিচ্ছে, যা তাদের 'রমজান যুদ্ধ' চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন। আগে থেকে তৈরি করা পরিকল্পনা অনুযায়ীই এই যুদ্ধ চলছে।
ইতিহাসবিদ আজিজি বলেন, 'ইরানের আসল ক্ষমতা সম্ভবত এই উপাদানগুলোর হাতেই থাকবে, মোজতবার হাতে নয়। এমনকি তিনি যদি সুস্থ হয়ে জনসমক্ষে আসেন, তবুও দৃশ্যপট খুব একটা বদলাবে না।'
আপাতত নতুন নেতাকে ক্যামেরার সামনে আনার খুব একটা তাড়া নেই। সরকার তার কাছ থেকে যা চায়, তিনি ইতিমধ্যেই তা পূরণ করছেন।
তবে যুদ্ধ শেষ হলে কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ভাকিল বলেন, 'যুদ্ধের পর অথবা আরও কঠিন পরিস্থিতিতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিক অভিজাতদেরও স্পষ্ট সংকেত লাগবে যে তিনি সত্যিই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সক্ষম।'
আপাতত তার অবস্থান গোপনই থাকছে। আর তার অনুসারীদের খুব কম মানুষই এর কারণ জানতে চাইছে। কারণ নতুন নেতার পিঠেও যে লক্ষ্যবস্তুর নিশানা আঁকা আছে।
