শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন আসছে– কিয়েভে!
বড় সাধ ছিল ওয়াশিংটনের। ভেবেছিল যুদ্ধের প্যাঁচে রাশিয়াকে নাকাল করে– মস্কোয় শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করা দেশগুলোয় 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসকগোষ্ঠী বদলের ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু, এবার হতে চলেছে কি উল্টোটাই? কেননা অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাশিয়ায় নয়, বরং কিয়েভেই তখত পাল্টানোর সম্ভাবনা এখন বেশি।
কিয়েভে এই 'রেজিম চেঞ্জ' এর প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে সদ্য সমাপ্ত রক্তক্ষয়ী আভদিভকার লড়াই।
ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের রাজধানী দনেয়স্ক শহরের খুবই সন্নিকটে আভদিভকা। আবার আজভ সাগরতীরের মারিওপোল ও উত্তরের লুহানস্কের প্রায় মাঝামাঝি অবস্থান দনেয়স্কের।
দনেয়স্ক ও লুহানস্ক উভয় অঞ্চলই পূর্ব ইউক্রেনে। যেখানে রুশ ভাষাভাষী জনসংখ্যাই বেশি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে খেরসন ও ঝাপোরিঝিয়া-সহ এ দুটি অঞ্চলকেও রাশিয়ান ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আভদিভকা নিয়ে সাম্প্রতিকতম লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল মাস চারেক আগে। এরপর গত জানুয়ারি থেকে শহরটি প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের নাকাল করতে থাকে রুশ বাহিনী। তারা উত্তর দিক থেকে যেমন হামলা চালায়, তেমনি মূল বাহিনীর একটি অংশ কোক প্ল্যান্টের দখল নেওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। সমানতালে দক্ষিণদিক থেকেও বারবার আক্রমণ আসতে থাকে।
ফলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের শেষ নাগাদ, রুশ বাহিনী শহরটিকে দুইভাগে বিভাজিত করে ফেলে। এসময় কামানের ব্যাপক গোলাবর্ষণ এবং বিমান থেকে এফএবি বোমা হামলা চালানো হয়, যার আড়ালে অগ্রসর হয় রুশ সেনারা। ৫০০ ও ১৫০০ কেজি ওজনের এই বোমাগুলো শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইউক্রেনীয়দের কচুকাটা করেছে একপ্রকার।
আভদিভকার প্রতিরোধ কাঠামো খুবই দৃঢ়ভাবে তৈরি করা হয়েছিল, ফলে রুশ সেনাবাহিনীর পক্ষে এর দখল নেওয়াও বেশ কঠিনই ছিল। তাই সম্মুখসারির পেছন ও পাশ থেকে হামলার ওপরে তারা জোর দেয়। এতে আভদিভকায় ইউক্রেনীয় সেনাদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করা, বা নতুন সেনা পাঠানো দুরূহ হয়ে পড়ে। এমনকী লড়াইয়ের শেষ সপ্তাহ নাগাদ শহরের ভেতর ও বাইরের সড়কগুলোও রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এলে– পুরোপুরি ঘেরাওয়ের ঝুঁকিতে পড়ে ইউক্রেনীয় যোদ্ধারা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি এই আভদিভকাকে রক্ষার ওপরই তাঁর মান বাজি ধরেছিলেন, এবং যেকোনো মূল্যে এই শহর রক্ষা করতে চেয়েছেন। আভদিভকার লড়াইকে বৃথা মনে করা ইউক্রেনের সর্বোচ্চ কমান্ডার জেনারেল ভ্যালেরি ঝালুজনিকেও বরখাস্ত করতে দ্বিধা করেননি।
আভদিভকায় শত্রুর সাথে সবচেয়ে কাছের সংঘাতরেখা থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের সরিয়ে এনে, পেছনদিকের দৃঢ় প্রতিরক্ষা কাঠামোগুলোয় রাখতে চেয়েছিলেন ঝালুজনি, যাতে কিয়েভসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহর রক্ষায় তা কাজ করে।
ইউক্রেনের নয়া সেনাপ্রধান আলেক্সান্ডার সিরস্কি, যিনি ঝালুজনির অধীনে এর আগে একজন কমান্ডার ছিলেন। এখন তাঁকেই করা হয়েছে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সর্বাধিনায়ক। এই সিরস্কিই সেই ব্যক্তি যার কৌশলের কারণে বিপুল সেনা হারানোর পরেও বাখমুতের যুদ্ধে হারে ইউক্রেন। সিরস্কির ভুল কৌশলে 'মিট গ্রাইন্ডার' এর মতোন কুখ্যাত আখ্যা পায় এই লড়াই।
আভদিভকার পতন ঠেকাতেও জরুরি ভিত্তিতে তিন থেকে চার ব্রিগেড সেনা জড়ো করেন সিরস্কি। কিন্তু, শুরুর সঙ্গেসঙ্গেই চরম সংকটে পড়ে এই উদ্ধার পরিকল্পনা।
আভদিভকায় পাঠানোর জন্য উল্লেখিত ব্রিগেডগুলোকে এর প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের সেলিদভ নামক মফস্বলে সমবেত ও সংগঠিত করা হয়। সেলিদভে ইউক্রেনীয়দের কর্মকাণ্ড আবিষ্কার করে ফেলে রুশ বাহিনী। তারপর ওই অবস্থানে বহু ইস্কান্দার ব্যালেস্টিক মিসাইল, ক্লাস্টার বোমা আর রকেট ছোড়ে।
রুশ সেনাবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত যেসব ব্যক্তি বা সংগঠন টেলিগ্রাম বা 'এক্স' এর মতো সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে, তারা জানায়, রুশ আক্রমণে অন্তত একটি ব্রিগেড নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, অন্য ব্রিগেডগুলোরও অনেক সেনা নিহত হয়।
বিপর্যয়ের এই সংবাদ চাপা দিতে এগিয়ে আসে ইউক্রেনের প্রোপাগান্ডা যন্ত্র। তারা অভিযোগ করে, সেলিদভে একটি হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে রাশিয়া। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, লক্ষ্য ছিল সামরিক। এবং তাতে ইউক্রেন এক থেকে দেড় হাজার সেনা হারায়।
ইউক্রেনের মিথ্যাকেই গ্রহণ করে বেশিরভাগ পশ্চিমা গণমাধ্যম। এভাবেই এই বিপর্যয় তারা বিশ্বের থেকে গোপন করে।
ওই সময়ে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যাচ্ছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। কিয়েভ ত্যাগের আগে সিরস্কিকে আভদিভকার পতন ঠেকানোর নির্দেশ দেন তিনি।
একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে তখন শহরটিকে রক্ষা করার জন্য থার্ড ব্রিগেডকে পাঠান সিরস্কি। মূলত আজভ ব্রিগেডকে পুনর্গঠিত করে তৈরি করা হয়ে এই থার্ড ব্রিগেড। আর ইউক্রেনে কট্টর-জাতীয়তাবাদী সমর্থনের মেরুদণ্ড হচ্ছে এই আজভ ব্রিগেড। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনীয় নাৎসী যাদের বলেন, সেই আখ্যার ন্যায্য দাবিদার ইউক্রেনের কোনো সংগঠন যদি হয়– তবে সেটি এই আজভ ব্রিগেড।
ভলোদমির জেলেনস্কির রাজনৈতিক ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর সমর্থন এবং বিশেষত তাঁদের মধ্যেকার উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু, যতোটা ঢেরা পেটানো হয়েছে থার্ড ব্রিগেড নিয়ে, কার্যত তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এই ব্রিগেডের ইউনিটগুলো যখন আভদিভকায় আসে, তখন তাঁরা এসেছিল উত্তর দিক থেকে। পরিস্থিতি কতোটা সঙ্গিন অচিরেই সেটা তাঁরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে।
থার্ড ব্রিগেড যখন আভদিভকায় আসে, ততোদিনে একেবারে কোণঠাসা সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা ইউক্রেনীয় সেনারা। যাদের একটি অংশ, প্রায় সাড়ে চার হাজার জন শহরের উত্তরে অবস্থিত একটি কোক কারাখানায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আর শহরের দক্ষিণাঞ্চলীয় মহল্লাগুলোর কাছাকাছি অবস্থান করছিল আরও সাড়ে তিন হাজার সেনা।
অবস্থা বেগটিক দেখে নির্দেশ অমান্য করে শহর ছেড়ে পালায় থার্ড ব্রিগেড। এমনকী সিরস্কি ও জেলেনস্কির সুষ্পষ্ট নির্দেশকে তাঁরা গ্রাহ্য করেনি।
মিউনিখে জেলেনস্কি এসেছিলেন আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ চাইতে, এই অবস্থায় সঠিক সংবাদটি প্রচারিত হলে তাঁকে চূড়ান্ত বিব্রত হতে হতো।
এদিকে থার্ড ব্রিগেডের অনেক সেনা আবার রুশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে থাকে। মূলত এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আভদিভকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন সিরস্কি।
এই পিছু হটার ফলে পশ্চিমা মিত্রদের কাছে মান হারিয়েছেন জেলেনস্কি। সিরস্কি ওই সময় মিউনিখ থেকে ক্ষুদ্ধ জেলেনস্কির ফোনকল পাচ্ছিলেন বলেও জানা যায়। কিন্তু, তিনি ছিলেন নিরুপায়। বিকল্প ছিল কেবল প্রকাশ্য আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেওয়া, যা হতো আরও মারাত্মক বিপর্যয়ের। তাঁর বদলে তিনি সেনা প্রত্যাহার করে 'নতুন' কৌশলের ঘোষণা দেন, যেটি এর আগে সুপারিশ করেছিলেন ঝালুজনি।
আভদিভকা হারানোর পর খুবই বাজে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন জেলেনস্কি। সেনাবাহিনীতে তিনি নিজের সবচেয়ে কট্টর সমর্থকদের হারিয়েছেন, সাবেক সেনাপ্রধান ঝালুজনিকে অপমান করেছেন এবং তাঁর জায়গায় এনেছেন সিরস্কিকে। সেনাদের কাছে যার পরিচিতি বিজয়ী হিসেবে নয়। একইসময়, ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে মুখ দেখানোর জো নেই, হয়তো সেটা যুক্তরাষ্ট্রের বেলাতেও প্রযোজ্য হবে। তবে শেষোক্ত কথাটা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ইউক্রেন আভদিভকা একদিন অবশ্যই উদ্ধার করবে, মুখরক্ষার জন্য নিরুপায় হয়ে জেলেনস্কি এটুকুই বলতে পেরেছেন আপাতত।
ইউক্রেনের জয় নয়, যুক্তরাষ্ট্র চায় একের পর এক লড়াইয়ে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষতি। আর্থিকভাবে দেশটিকে নিঃশেষ করারও উদ্যোগ নেয় ওয়াশিংটন, ধরে নেয় এক পর্যায়ে পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হবেন। কিন্তু, সবখানেই চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, জেলেনস্কির সামরিক বাহিনীর ওপর ভর করে সরকার চালাচ্ছেন। সামরিক আইনে চলছে জনজীবন। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ নেই এ অবস্থায়।
এই অবস্থায়, ঝালুজনির অপসারণ এবং আভদিভকার পতন সেনাবাহিনীর অনেককেই ক্ষুদ্ধ করেছে, এবং দিন দিন পুঞ্জিভূত এই ক্ষোভ আরও বাড়ছে। ফলে সামরিক বাহিনীই হয়তো দেশের পরবর্তী প্রধান কে হবেন তা ঠিক করবে, হয়তো তারা ঝালুজনিকেও ক্ষমতায় আনতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
