যুদ্ধ অবসান নিয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনার ‘কোনো অর্থ নেই’: পুতিন
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসার 'কোনো অর্থ নেই' বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে জেলেনস্কি সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার পরই পুতিন এই প্রতিক্রিয়া জানালেন।
গত বৃহস্পতিবার পুতিনকে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন জেলেনস্কি। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, এই যুদ্ধ আবার যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ পাবে—শুধু এই ভরসায় 'বসে থাকাটা ভুল হবে'।
চিঠিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতিরও দাবি জানান। তবে একই সঙ্গে তার চিঠির সুরে কিছুটা আক্রমণাত্মক ও উপহাসের ছাপও ছিল।
পুতিন এই চিঠিকে 'অভদ্র' বলে উল্লেখ করেন এবং বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
জেলেনস্কির প্রস্তাবের বিষয়ে শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার বার্ষিক ইকোনমিক ফোরামে পুতিন বলেন, 'আমি আপাতত এর কোনো অর্থ দেখছি না।'
তিনি বলেন, 'এটি কি সামনাসামনি বৈঠকের পরিবেশ তৈরির কোনো উপায় ছিল, নাকি বৈঠক এড়ানোর কোনো কৌশল? আমার মনে হয়, এটি দ্বিতীয়টিই ছিল।'
জেলেনস্কির চিঠির জবাব দিতে গিয়ে পুতিন আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি দিলে ইউক্রেন শুধু নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। অথচ কিয়েভের কাছে মস্কো যেসব দাবি জানিয়েছে, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
পুতিন বলেন, 'যুদ্ধবিরতির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো—আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রগতি থামানো। কিন্তু আমাদের এমন চুক্তি দরকার, যা ছয় বা তিন মাসের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আগে বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করুন এবং কিছু সমাধানে পৌঁছান। এরপর আমরা বৈঠকে বসতে পারি।'
পুতিন স্পষ্ট করে দেন যে রাশিয়ার লক্ষ্য অর্জিত হলেই তিনি যুদ্ধ শেষ করবেন। তিনি বলেন, 'আমরা ধরে নিচ্ছি, সামরিক অভিযান একদিন শেষ হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হলেই তা শেষ হবে।'
পুতিনের এমন প্রতিক্রিয়ার পর জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া 'আবারও যুদ্ধ বেছে নিচ্ছে'।
টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, 'তিনি (পুতিন) যুদ্ধ শেষ করতে চান না। আমার মনে হয়, তার এই উত্তরে বিশ্বের অনেকেই হতাশ হয়েছেন।'
রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবি হলো—ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা ত্যাগ করতে হবে।
কিন্তু কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি নয়। তাদের যুক্তি হলো, মস্কোকে কোনো ছাড় দিলে ভবিষ্যতে তারা আবারও আক্রমণের সাহস পাবে। ইউক্রেন মনে করিয়ে দেয়, ক্রিমিয়া দখলের আট বছর পরই রাশিয়া এই সর্বাত্মক আগ্রাসন চালিয়েছে।
চিঠিতে কী লিখেছিলেন জেলেনস্কি?
জেলেনস্কি তার চিঠিতে লিখেছিলেন, '২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে' পুতিনের ওপর। এ ছাড়া তিনি রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর দিকেও ইঙ্গিত করেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে চালানো একটি হামলাকে তিনি 'সাক্ষাৎ করতে যাওয়া' বলে উপহাস করেন।
পুতিন বলেন, ওই চিঠিতে 'বেশ কিছু অভদ্র মন্তব্য' ছিল।
তবে জেলেনস্কির ওই চিঠি হোয়াইট হাউসসহ কিছু মহলে শান্তির আশা জাগিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, 'দুই নেতার মধ্যে বৈঠক হলে খুব ভালো হবে'।
যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি
ইউক্রেন জানিয়েছে, শুক্রবার আজভ সাগর এবং রাশিয়ার দখলে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ পণ্যবাহী পাঁচটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তারা।
ইউক্রেনের ড্রোন কমান্ডার রবার্ট ব্রভডি বলেন, ওই জাহাজগুলো ইউক্রেনের শস্য 'চুরির' পাশাপাশি জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ছিল।
আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজভ সাগরে দুটি জাহাজে হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তবে কারা এই হামলা চালিয়েছে তা তারা জানায়নি এবং জাহাজগুলো আজারবাইজানের নয় বলেও জানিয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতদিন ইউক্রেনে রাশিয়ার একাধিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৭০ জন আহত হয়েছেন।
কিয়েভের বাইরে একটি ডেইরি ফ্যাক্টরিতে হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে খেরসনে একটি পেট্রলপাম্পে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী প্রাণ হারিয়েছেন।
