পশ্চিমবঙ্গে স্কুলের দুপুরের খাবারে ডিম বাদ দিয়ে নিরামিষ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিতর্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্কুলের দুপুরের খাবারের (মিড-ডে মিল) মেনু থেকে ডিম বাদ দিয়ে নিরামিষ বিকল্প চালুর সিদ্ধান্তের পর বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যটির নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় কিছু স্কুলে ডিমের বদলে প্রোটিনযুক্ত নিরামিষ খাবার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ভারতের সরকারি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলোতে বিনামূল্যে রান্না করা খাবার দেওয়ার এই কর্মসূচি 'মিড-ডে মিল' হিসেবে পরিচিত। লক্ষ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কাছে এটিই সারাদিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার। অনেক ক্ষেত্রে এটিই তাদের সারাদিনের একমাত্র আহার। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ক্ষুধা নিবারণ এবং শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে এই কর্মসূচির বড় ভূমিকা রয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত
বিতর্কের শুরু হয় যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করে যে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন পরিচালিত স্কুলগুলোর খাবার তৈরির দায়িত্ব 'ইসকন'-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
ইসকনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের 'অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন' কেবল নিরামিষ খাবার পরিবেশন করে। ফলে ডিমের বদলে প্রোটিনের অন্য উৎস ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পটি এখনও শুরু হয়নি এবং এটি অন্য স্কুলগুলোতে চালু হবে কি না তা নিশ্চিত নয়। ইসকন জানিয়েছে, আলোচনা এখনও চলছে এবং চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
পুষ্টিবিদদের মতে, বাড়ন্ত শিশুদের জন্য ডিম প্রোটিনের সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর উৎস। ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে এর আগেও ডিম বাতিলের চেষ্টা করে বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে রাজ্য সরকারকে। সমালোচকদের মতে, সরকার পুষ্টি নীতির ওপর ধর্মীয় বা আদর্শগত বিশ্বাস চাপিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, পরিকল্পিত নিরামিষ খাবারও সমান পুষ্টি দিতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
গত মে মাস পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) অভিযোগ করেছে যে বিজেপি সরকার শিশুদের ওপর 'নিরামিষভোজী' হওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। অনেকে বলছেন, ইসকন প্রস্তাবিত সয়াবিন বা রাজমা এই রাজ্যে খুব একটা জনপ্রিয় নয়, যা শিক্ষার্থীরা গ্রহণ নাও করতে পারে। রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের অনেকে শিক্ষার্থীকে ডিম বা নিরামিষের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
ডিম দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মানের প্রোটিনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে বিবেচিত। একটি ডিমের দাম সাধারণত আট রুপি। এটি কয়েক প্রজন্ম ধরে বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির অংশ।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও ইসকনের অবস্থান
এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের 'ভালো ও শুদ্ধ খাবার' দেওয়া। সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, 'আপনাকে হরে কৃষ্ণ বলতে হবে না। কেউ আপনাকে বাধ্য করবে না।' এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রভাব—এমন অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
ইসকন দাবি করেছে যে তাদের নিয়ে করা সমালোচনা সঠিক নয়। সংস্থাটি ভারতের ১৬টি রাজ্যে প্রায় ১০ লক্ষ শিশুকে খাবার সরবরাহ করে। কলকাতা ইসকনের সাবেক সহ-সভাপতি রাধারমণ দাস জানিয়েছিলেন যে নিরামিষ মেনুতে ডিমের সমান প্রোটিন ও ভিটামিন থাকবে। খাবারের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিও ইসকন নজরে রাখবে বলে জানান তিনি। তবে এরই মধ্যে রাধারমণ দাসকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে প্রত্যাহারের বিষয়ে ইসকন এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
জাতীয় প্রেক্ষাপট ও কর্মসূচির চিত্র
১৯৯৫ সালে ভারতজুড়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম খাদ্য সহায়তা প্রকল্প। বর্তমানে এর আওতায় প্রায় ১১ কোটি শিশু রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার পুষ্টির মান নির্ধারণ করলেও রাজ্যগুলো মেনু ঠিক করে।
বিহারের স্কুলগুলোতে শিশুদের সাধারণত ডাল বা ছোলার সাথে ভাত এবং সপ্তাহে একটি করে ডিম দেওয়া হয়। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে প্রায়শই ভাত, সাম্বার (সবজি দিয়ে তৈরি ডাল), শাকসবজি ও ডিম অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অনেক রাজ্যে আবার কেবল নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়। গুজরাট, উত্তর প্রদেশ এবং দিল্লিতে মেনুতে সাধারণত ডাল ও সবজির সাথে ভাত বা গমজাতীয় খাবার থাকে; যার সাথে মাঝে মাঝে দুধ, পনির বা ফল দেওয়া হয়।
কলকাতার সরকারি স্কুলে প্রায় এক দশক ধরে সপ্তাহে কিছু দিন ভাতের সঙ্গে ডিম দেওয়া হতো। এর সঙ্গে থাকত ডাল ও সবজি। এখন সেই মেনু বদলে যাওয়ার খবরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো শিশু মেনু বদলকে ইতিবাচকভাবে নিলেও অনেকে ডিম না পাওয়ায় হতাশ। চৈতালি মিত্র নামের এক অভিভাবক বলেন, 'ডিম থাকলে আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম যে আমার শিশুর প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হচ্ছে।'
পুষ্টিবিদদের মত
দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ফারেহা শানাম বলেন, 'ডিম হলো প্রোটিনের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও সাশ্রয়ী উৎস। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অ্যামিনো অ্যাসিডই থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'ডিম ভিটামিন ডি এবং বি১২-এ সমৃদ্ধ, যা বাড়ন্ত শিশুদের জন্য পুষ্টির একটি অন্যতম কার্যকর উৎস।'
পনিরের মতো খাবার একই মানের পুষ্টি দিলেও তা ডিমের তুলনায় অনেক দামি। হায়দরাবাদের চিকিৎসক ভামশি ভি বলেন, ডিমের সঠিক বিকল্প নিশ্চিত না করে তা বাতিল করলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দিল্লির একজন প্রাথমিক শিক্ষক জানান, স্কুলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে মিড-ডে মিল বড় একটি কারণ। অনেক শিশু ক্ষুধার্ত অবস্থায় স্কুলে আসে এবং দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা করে। বিহারের শিক্ষক বিমলা সিং (ছদ্মনাম) বলেন, সিদ্ধান্তটি শিশুদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার স্কুলে যারা ডিম খায় না, তাদের বিকল্প হিসেবে কলা দেওয়া হয়। বিমলা বলেন, 'কাউকে একটি খাওয়ার জন্য বা অন্যটি বাদ দেওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় না।'
