টিটিই বরখাস্তসহ ৪ দাবি পূরণের আশ্বাস: ৯ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের রেল অবরোধ প্রত্যাহার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে চলন্ত ট্রেনে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় চার দফা দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনের আশ্বাসে ৯ ঘণ্টা পর রেলপথ অবরোধ তুলে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটায় এই ঘোষণা দেওয়ার পর রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ পুনরায় সচল হয়েছে।
এর আগে, চলন্ত ট্রেনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা পয়েন্টে রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
ফলপ্রসূ আলোচনা ও ৫ সিদ্ধান্ত
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রশাসন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবির প্রেক্ষিতে ৫টি মূল সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
১. রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ৩ সদস্যের এবং বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন।
২. গভীর রাতে রাজশাহীতে প্রবেশ করা ৩টি ট্রেনের বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা।
৩. ট্রেনের সূচীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শাটল বাস সেবা চালু।
৪. আহত শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসা ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৫. আগামী ৬ আগস্ট সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় পুনরায় সভা আহ্বান।
সভায় অভিযুক্ত টিটিই সুমন আলী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। এরপর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার ঘোষণা দেয়। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ও রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার সভার রেজুলেশন নিয়ে সাড়ে ৩টায় অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, 'আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা ক্ষমা চাইছি। আশা করি, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে।'
বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা শিক্ষার্থীদের ৪টি দাবিই মেনে নিয়েছি। আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে রাতে ট্রেনের যাত্রাবিরতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই না এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, 'রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় প্রশাসন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে আমাদের দাবিগুলো গ্রহণ করেছেন। অভিযুক্ত টিটিই-কে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত স্থায়ী সমাধান আসবে।'
উচ্চপর্যায়ের এই সভায় উপস্থিত ছিলেন রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ, প্রধান প্রকৌশলী আহম্মদ হোসেন মাসুম, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া, চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, চিফ কমান্ড্যান্ট মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। এছাড়াও পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাইদ, আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশীদ, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান, সহকারী প্রক্টর ড. আব্দুস সালাম এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
তীব্র শিডিউল বিপর্যয় ও ভোগান্তি
শিক্ষার্থীদের ৯ ঘণ্টার এই অবরোধে অন্তত ১০টি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে এবং আরও কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, অবরোধের কারণে পদ্মা এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, মহানন্দা এক্সপ্রেস, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস, কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ও ঢালারচর এক্সপ্রেসের সূচি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এছাড়াও ঢাকা ও অন্যান্য এলাকা থেকে রাজশাহী অভিমুখী ধুমকেতু এক্সপ্রেস ও সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস আটকা পড়ে। মধুমতী, তিতুমীর ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসও সূচি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, যা সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে।
প্রসঙ্গত, ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই টাকা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে দুই টিটিইর বিরুদ্ধে।
সোমবার দিবাগত রাতে সিরাজগঞ্জ এলাকায় চলন্ত ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা গেটসংলগ্ন রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।
