৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার ছায়া বাজেট ঘোষণা এনসিপির: শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জোর
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার 'বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি' শীর্ষক একটি ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে।
দলটির পক্ষ থেকে বাজেট কমিটি জানিয়েছে, এটি সরকারি দলের বাজেটের বিপরীতে কেবল একটি বিকল্প বাজেট নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা। এর মূল লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই বাজেট তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, 'বর্তমান সরকার মূলত উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি সংকটকালীন ও সংকটাপূর্ণ অর্থনীতি। এই সরকার আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দীর্ঘ ১৭ বছরের লুটপাটের ভগ্ন একটি অর্থনীতি হাতে পেয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি। এছাড়া, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত অনেকটাই আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর দেড় লক্ষ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'জনকল্যাণমূলক ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা একই সঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব। দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের বোঝা চাপানো ছাড়াই অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব।'
এনসিপির পক্ষ থেকে বাজেট উপস্থাপন করেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ।
এসময় তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের রাজনীতিতে গতানুগতিকভাবে বাজেট আসার পর সমালোচনা হয়। সেখানে এমন বলা হয় যে, এই বাজেট জনবিরোধী, জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেনি। আমরা গতানুগতিক ধারায় না গিয়ে অগ্রিম একটি ছায়া বাজেট প্রণয়ন করেছি যেখানে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের বাজেট কেমন হওয়া উচিত। এই ছায়া বাজেট শুধু একটি বাজেটই নয়, এটি হলো বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক দর্শন। আমাদের দল বিশ্বাস করে উন্নয়ন অর্থবহ করতে হলে মুদ্রাস্ফীতির আগুন থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেওয়া, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা অত্যাবশ্যক।'
বাজেটের আকার ও সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রা
এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭.৮৭ শতাংশ বেশি। তবে দলটি বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.০৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং পরবর্তী অর্থবছরে তা ৬ শতাংশে স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনসিপি।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে ছয়টি প্রধান খাত থেকে অতিরিক্ত ৭৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে এনসিপি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যেসব বিদ্যুৎ গ্রাহক প্রতি মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, তাদের করের আওতায় আনা হবে।
মধ্যবিত্তের জন্য কর ছাড়
প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নারীদের জন্য করমুক্ত সীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
এছাড়া যাকাতকে আয়কর রেয়াত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, উত্তরাধিকার কর চালু এবং করপোরেট কর ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় আটটি খাদ্যপণ্য— চাল, গম, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি, ডাল, আলু ও পেঁয়াজের ওপর আগামী পাঁচ বছর ভ্যাটমুক্ত রাখার পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর কর কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
এনসিপির ছায়া বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৪.৬ শতাংশ।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক উন্নয়ন তহবিল গঠন, ৫ হাজার বেসরকারি স্কুল জাতীয়করণ এবং প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং প্রথম বছরেই ২০ লাখ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনসিপি।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বড় উদ্যোগ
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। একইসঙ্গে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষকবান্ধব পরিকল্পনা
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আধুনিক শস্য বিপণন কেন্দ্র স্থাপন, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে ১৫ শতাংশ লাভ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ
জ্বালানি খাতে 'সোলার এনার্জি সভারেন্টি অ্যাক্ট' প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে এনসিপি। এই আইনের মাধ্যমে প্রতিটি সৌর পণ্য আগামী ৫ বছরের জন্য করমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে এক বছরে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী উন্নয়ন
সরকারি খাতে নারী কর্মচারীদের জন্য এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে ৬ মাস পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নারীরা যাতে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতমুক্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহিতা
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোতে গ্রেড ২০-এ ৩৪.৫ শতাংশ, গ্রেড ১৬-এ ৩১.২ শতাংশ এবং গ্রেড ১০-এ ১২.৫৬ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্বাধীন পদোন্নতি কমিশন গঠন এবং প্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে এনসিপি।
ব্যাংকিং ও মূলধন বাজার
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ রোধে কঠোর আইন, 'ব্যাড ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ ৫ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১২টি ভাগে বিভক্ত ৭১ দফার এই ছায়া বাজেটকে দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, বিনিয়োগবান্ধব ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ হিসেবে ঘোষণা করেছে দলটি। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই প্রস্তাবনাগুলো ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছে এনসিপি।
