সম্পদের ওপর কর ও কালো টাকা বিনিয়োগে দায়মুক্তির পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে সরকার
বহুল আলোচিত সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে সরকার। একই সঙ্গে আবাসনসহ কয়েকটি খাতে দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) দিয়ে কালো টাকা সাদা করার যে পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকেও সরে আসতে পারে সরকার।
অন্যদিকে মোটরসাইকেল মালিক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর যে পদ্ধতিতে কর আরোপের চিন্তা করা হয়েছিল, তাও বাতিল হতে পারে। এর পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি সিসির মোটরসাইকেলের ওপর এককালীন কর আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং বিতর্ক তৈরি হতে পারে, এমন কোনো নীতি না নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে দায়মুক্তি দেওয়া এবং মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর ঢালাও কর আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।"
তিনি বলেন, "ওয়েলথ ট্যাক্স নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রভাব বিশ্লেষণ (ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস) করে প্রস্তাব তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে আগামী বাজেটে এটি আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং সমাজে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমানোর একটি উপায় হিসেবে আমরা এ প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ওয়েলথ ট্যাক্স পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু এ খাত থেকেই বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো।"
তিনি আরও বলেন, "সাধারণ মানুষের ওপর করের ভার যাতে না পড়ে, সে কারণে সব ধরনের মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপ করা হবে না। অন্যদিকে সমালোচনার আশঙ্কায় সরকার দায়মুক্তি দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিতে চাচ্ছে না।"
এর আগে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, চলতি বাজেটে সম্পদের ওপর কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স চালু করা হবে। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে গতি আনতে আবাসনসহ কয়েকটি খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলেও সূত্র জানিয়েছে।
তবে মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর বাইকারদের একটি গ্রুপ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকেও দায়মুক্তি দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করা হয়।
এরপর সরকার এ বিষয়ে পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
সাবেক এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম মনে করেন, ওয়েলথ ট্যাক্স চালুর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা যৌক্তিক হবে না।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে ওয়েলথ ট্যাক্স একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারত। সরকার হয়তো ভয়ের কারণে এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে চাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থকে সহজ উপায়ে বিনিয়োগে আনার ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্তও যৌক্তিক ছিল বলে মনে করেন তিনি।
তবে আয়কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, ওয়েলথ ট্যাক্স চালু করলে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। কারণ যারা তাদের সম্পদ ঘোষণা করেন, তারাই করের আওতায় আসবেন; অন্যদিকে যারা সম্পদ গোপন রাখেন, তারা করের বাইরে থেকে যেতে পারেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "ওয়েলথ ট্যাক্সের জন্য সম্পদের মূল্য নির্ধারণ একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এতে বিপুলসংখ্যক আইনি বিরোধ ও মামলার সৃষ্টি হতে পারে।"
তিনি বলেন, "সে কারণে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এ ধরনের কর চালু করা সমীচীন হবে না।"
স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, ভারতসহ যেসব দেশ ওয়েলথ ট্যাক্স চালুর পর তা প্রত্যাহার করেছে, সরকারকে সেসব দেশের অভিজ্ঞতা এবং নীতি পরিবর্তনের কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, "কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব দেশের অভিজ্ঞতা ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণগুলো গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা উচিত।"
প্রসঙ্গত, বর্তমানে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ব্যক্তিদের প্রদেয় আয়করের ওপর নির্দিষ্ট হারে সারচার্জ আরোপের বিধান রয়েছে। তবে এনবিআরের পরিকল্পনা ছিল সম্পদের মূল্যের ওপর সরাসরি সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হারে কর আরোপ করা।
অন্যদিকে বর্তমানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও দায়মুক্তির (ইনডেমনিটি) ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ প্রযোজ্য কর এবং ওই করের ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা পরিশোধ করে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থা ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে। সরকার প্রাথমিকভাবে এমন একটি ব্যবস্থা বিবেচনা করেছিল, যাতে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সংস্থাই প্রশ্ন করতে না পারে।
২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে যেকোনো খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছিল এবং সে ক্ষেত্রে দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। এতে ওই অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ সাদা হয়, যার মাধ্যমে সরকার দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি কর আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল তখন।
