বাঘ, চা–বাগান, সমুদ্রসৈকত—সবই আছে, তবু বাংলাদেশ কেন পর্যটক টানতে হিমশিম খাচ্ছে ?
বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, টিলাজুড়ে সাজানো সবুজ চায়ের বাগান কিংবা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত—প্রকৃতি দুহাত ভরে দিয়েছে বাংলাদেশকে। তবুও বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এ দেশ যেন মানচিত্রের এক অচেনা জনপদ।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সাড়ে ৬ লাখ বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে পা রেখেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কার পর্যটক সংখ্যার তুলনায় যা অতি নগণ্য। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে নাগরিক জীবনের কোলাহল আর প্রকৃতির ঐশ্বর্য—সবই আছে। তবুও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দেশটি এখনো মূলধারায় উঠে আসতে সংগ্রাম করছে।
কিন্তু কেন এই পিছিয়ে পড়া? নেটিভ আই ট্রাভেলের পরিচালক জিম ও'ব্রায়েন ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ট্যুর পরিচালনা করছেন। তার মতে, সমস্যাটা মূলত মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বলেন, 'মানুষের অবচেতন মনে দেশটির সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটা যোগসূত্র তৈরি হয়ে আছে। আমরা দেশটির ব্যাপারে কেবল নেতিবাচক খবর বা ভুল কারণেই বেশি আলোচনা শুনি।'
তবে স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা মনে করেন, পুরোনো এই ধারণা বা বাংলাদেশের বৈচিত্র্য আর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলোকে আড়াল করে রাখছে। পর্যটকরা এখন যা খুঁজছেন, তা এ দেশেই আছে।
বেঙ্গল এক্সপিডিশন ট্যুরসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহাদ আহমেদ চান, পর্যটকরা ঢাকাকে চিনুক। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই শহরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জীবনসংগ্রাম দেখার মতো বিষয়। একই সঙ্গে তিনি পর্যটকদের দেখাতে চান শ্রীমঙ্গলের উুঁচু-নিচু টিলা, যেখান থেকে চায়ের বাগান মিশে গেছে হিমালয়ের পাদদেশে। আর কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সৈকত তো আছেই।
ফাহাদ বলেন, 'পর্যটকরা এখন কেবল দর্শনীয় স্থান নয়, স্থানীয় অভিজ্ঞতা পেতে চান। তারা বাংলাদেশের সত্যিকারের জনজীবন দেখতে চান। এখানে পর্যটন খাত এখনো বিকশিত হচ্ছে, তবে সম্ভাবনা প্রচুর।'
বেশির ভাগ দেশের নাগরিকদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা, ঢাকায় নতুন নতুন হোটেলের যাত্রা এবং আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটরদের তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়া—সব মিলিয়ে এ দেশে ভ্রমণের পথ এখন আগের চেয়ে সহজ। ফাহাদ আহমেদ মনে করেন, ভ্রমণ সহজ হলেও পর্যটনের বাজারে দেশটিকে 'ব্র্যান্ড' হিসেবে তুলে ধরা এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং।
নেতিবাচক ধারণা বনাম মুগ্ধতার যত গল্প
ব্রিটিশ পর্যটক আনন্দ প্যাটেল। ভুটান ভ্রমণের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর কোম্পানি 'লুপাইন ট্রাভেল'-এর সঙ্গে বাংলাদেশে আসেন তিনি। তার ঘুরে বেড়ানোর তালিকার ওপরের দিকে কখনোই বাংলাদেশের নাম ছিল না। তবু নতুন একটি দেশ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।
বাংলাদেশে আসার কথা যখন তিনি পরিচিতজনদের জানালেন, তখন বেশ অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন। সিএনএন ট্রাভেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আনন্দ বলেন, 'একজন তো আমাকে সোজা জিজ্ঞেসই করে বসল—কেন যাচ্ছ ওখানে? ওখানকার মানুষই তো দেশ ছেড়ে আমাদের এখানে চলে আসে!'
পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি মূলত একটি 'উৎপাদনকারী' দেশ হিসেবে—বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের সুবাদে। আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে দেশটির নাম আসে কেবল বন্যা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। আনন্দের ভাষায়, 'দেশটি নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ নেতিবাচক। আর ঠিক এ কারণেই পর্যটকদের রাডারের বাইরে থেকে যায় বাংলাদেশ।'
তবে ঢাকায় নামার পর সেই ধারণা বদলাতে সময় লাগেনি। ঢাকা থেকে ছয় ঘণ্টার বাস জার্নি করে আনন্দ যান বরিশালে। গঙ্গা অববাহিকার নদীমাতৃক এই জনপদ তাকে মুগ্ধ করে। সেখানকার ভাসমান বাজারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আনন্দ বলেন, 'অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের মতো এটি পর্যটক ভোলাতে সাজানো কোনো নাটকীয় দৃশ্য ছিল না; বরং এটি ছিল একেবারে খাঁটি স্থানীয় বাজার। ছোট ছোট নৌকায় ফলমূল আর ফসল নিয়ে বসেছেন কৃষকেরা, হকাররা বিক্রি করছেন টাটকা খাবার।'
নদীপথে সেই ভ্রমণের স্মৃতিচারণা করে তিনি আরও বলেন, 'নৌকাভ্রমণটা ছিল চমৎকার। দুপাশে ফসলের খেত আর বন, পাড় থেকে স্থানীয় মানুষ হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছে—সব মিলিয়ে দারুণ একটা দিন ছিল।'
'এ শহর কখনো ঘুমায় না'
আনন্দ প্যাটেলের মতোই লুপাইন ট্যুরের হয়ে একই সময়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন আইরিশ পর্যটক গ্যারি জয়েস। প্রতিবেশী দেশ ভারতে থাকার সুবাদে অনেক দিন ধরেই তার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশটা একবার স্বচক্ষে দেখার।
ঢাকায় পা রেখেই তিনি উঠেছিলেন পুরান ঢাকায়। জয়েস বলেন, 'শুরুতেই আমাদের পরিচয় হলো ঢাকার রাস্তার জ্যাম আর জঞ্জালের সঙ্গে। আমার প্রথম মনে হয়েছিল, এ শহর যেন কখনো ঘুমায় না। চারদিকের দৃশ্য আর বিচিত্র সব শব্দ আপনাকে ঘিরে ধরবে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছিল তখন।'
নদীপথে তিনি ঘুরে দেখেছেন জাহাজ ভাঙা শিল্প ও মেরামতের ইয়ার্ড। চলে গিয়েছিলেন একসময়ের ঐশ্বর্যমণ্ডিত পরিত্যক্ত নগরী পানামে। লঞ্চে চড়ে বদ্বীপের জনপদ ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার।
জয়েস বলেন, 'পুরো ট্যুরের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল দারুণ অভিজ্ঞতায় ঠাসা। বিশেষ করে ছবি তোলার জন্য ভাসমান বাজার আর পুরান ঢাকা অসাধারণ।'
আনন্দের মতোই জয়েসও বিশ্বাস করেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে ভুলভাবে দেখা হয়। তার কথায়, 'অতীতে এ দেশ নিয়ে গণমাধ্যমে হয়তো নেতিবাচক খবরই বেশি এসেছে। কিন্তু এখানকার খাবার চমৎকার, মানুষজন দারুণ আন্তরিক, আর ঘোরার জায়গাও অনেক। যারা ভ্রমণে গিয়ে কেবল সমুদ্রসৈকতে অলস শুয়েবসে থাকতে চান না, বরং নতুন কিছু দেখতে চান, তাঁদের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।'
'ঢাকা ট্যুর গাইডস'-এর কর্ণধার কাওসার আহমেদ মিলন। তিনি জানালেন, দেশটির ভাবমূর্তি সংকটই পর্যটনের পথে এখনো বড় বাধা।
তিনি বলেন, 'মানুষ বাংলাদেশকে তৃতীয় বিশ্বের একটি বিশৃঙ্খল দেশ হিসেবে দেখে। তারা ভাবে, এখানে বেড়াতে আসা মোটেও ভালো কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। কিন্তু পর্যটকরা যখন বাস্তবে এ দেশে আসেন, তখন তাদের সেই ভুল ধারণা ভেঙে যায়। তারা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়েই ফেরেন। এখানকার মানুষ গরিব হতে পারে, কিন্তু তাদের মনটা বড়। পর্যটকদের বরণ করে নিতে তাদের জুড়ি নেই।'
বাংলাদেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের। ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গত ৫০ বছরে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৭ লাখ মানুষের প্রাণহানি—সব মিলিয়ে এ জনপদ বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীদূষণ আর দারিদ্র্যের মতো নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ।
মিলন আক্ষেপ করে বলেন, ইদানীং কিছু পর্যটক অনলাইনে দেশটির এই 'অন্ধকারাচ্ছন্ন' বা নেতিবাচক চিত্র দেখেই আকৃষ্ট হচ্ছেন। তার মতে, 'অনেক ব্লগার ও ইউটিউবার কেবল ভিউ বাড়ানোর নেশায় বাংলাদেশের নেতিবাচক দিকগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তারা ঢাকার আবর্জনার স্তূপ বা 'গার্বেজ সিটি' দেখতে চান, আবার কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে ভিডিও বানাতে চান।'
ইন্টারনেটের এই জমানায় বাংলাদেশের গণপরিবহনে ভিড় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণের (ট্রেন সার্ফিং) ভিডিও খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। তবে 'ঢাকা ট্যুর গাইডস'-এর কাওসার আহমেদ মিলন পর্যটকদের দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পরামর্শ দেন সব সময়। তিনি চান, পর্যটকরা আবর্জনা বা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এ দেশের প্রকৃতি, গ্রামীণ আতিথেয়তা আর ইকো-ট্যুরিজমের সৌন্দর্য উপভোগ করুক।
তবে বেঙ্গল এক্সপিডিশন ট্যুরসের ফাহাদ আহমেদ বিষয়টিকে দেখেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি মনে করেন, বিদেশিরা যদি সত্যিই বাংলাদেশকে চিনতে চান, তবে তথাকথিত দর্শনীয় স্থানের বাইরেও তাদের যাওয়া উচিত। তিনি ট্রেনের ছাদে চড়া সমর্থন করেন না ঠিকই, তবে পর্যটকদের নিয়ে যান ঢাকার জমজমাট কাপড়ের বাজার কিংবা চট্টগ্রাম ও ঢাকার জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকায়। বাংলাদেশ যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, সেই কর্মযজ্ঞ তিনি বিদেশিদের দেখাতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো কায়িক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, যার বড় একটি অংশ কাজ করে পোশাকশিল্প খাতে। ফাহাদ স্বীকার করেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পে কাজ করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সেখানে শ্রমিকদের পারিশ্রমিকও অপ্রতুল।
তবে তিনি বিশ্বাস করেন, পর্যটন খাত এই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তার কথায়, 'পর্যটন বিকশিত হলে আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তখন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বদলে পর্যটন খাতে সম্মানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবে। যত বেশি পর্যটক আসবে, স্থানীয় মানুষ তত বেশি উপকৃত হবে।'
ঢাকার যান্ত্রিকতা ছাড়িয়ে পর্যটকদের গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নিতে উৎসাহিত করেন গাইডরা। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনের গহিনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের খোঁজ বা নৌভ্রমণ পর্যটকদের রোমাঞ্চিত করে। আশার কথা হলো, এসব এলাকায় এখন গড়ে উঠছে 'কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম'। ফলে স্থানীয়রা এখন কেবল কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল না থেকে গাইড হিসেবে কাজ করছেন, ইকো-রিসোর্ট চালিয়ে আয়ের নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন।
চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল। দেশের এই অঞ্চলে পর্যটন এখন আর শুধু নিছক ঘোরাঘুরিতে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির সহায়তায় এখানে গড়ে উঠেছে 'কমিউনিটি ট্যুরিজম' বা স্থানীয়দের সম্পৃক্ততায় পর্যটন ব্যবস্থা। স্থানীয়রা এখন নিজেদের বাড়িকেই বানিয়ে ফেলছেন পর্যটকদের জন্য 'হোমস্টে', আবার কেউ কেউ গাইড হিসেবে পর্যটকদের নিয়ে যাচ্ছেন পাহাড়ি ট্রেইলে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও ঘুরছে নতুন গতিতে।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর নিরাপত্তার শঙ্কা পর্যটন খাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রায়ই। লুপাইন ট্রাভেলের প্রতিষ্ঠাতা ডিলান হ্যারিস মনে করেন, দেশের অস্থির পরিস্থিতি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে।
হ্যারিস বলেন, 'মাঝেমধ্যে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে-পরে একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। যদিও আমাদের দিক থেকে আমরা মনে করি, এসব সময়েও ট্যুর চালানো সম্ভব। কারণ, সমস্যাগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং তা পর্যটন রুট থেকে বেশ দূরেই থাকে। তবুও পর্যটকদের মনে একধরনের ভীতি বা শঙ্কা কাজ করে, যা খুবই স্বাভাবিক।'
হ্যারিস সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়টিও পর্যটকদের মনে নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে নির্বাসিত থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—এমন সব ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ভাবিয়ে তোলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত ডিসেম্বরের সহিংস বিক্ষোভ এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া উদ্বেগ। সব মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বারবার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে।
'আসল' বাংলাদেশের খোঁজ
বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা বা 'ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি' নিয়ে বিভ্রান্তি কম নয়। ডিলান হ্যারিস বলছিলেন, একেক দেশের সতর্কতা একেক রকম হওয়ায় পর্যটকরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে যান।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশকে 'লেভেল-৩' বা ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রেখেছে। তাদের পরামর্শ—রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপরাধের শঙ্কা থাকায় এ দেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা যেন পর্যটকরা পুনর্বিবেচনা করেন।
তবে নেটিভ আই ট্রাভেলের জিম ও'ব্রায়েন জানালেন ভিন্ন কথা। এসব লাল লাল সতর্কতা তার রোমাঞ্চপ্রিয় ক্লায়েন্টদের খুব একটা দমাতে পারে না। তিনি বলেন, 'আমার সঙ্গে যারা আসেন, তারা বেশ অভিজ্ঞ পর্যটক এবং বয়সে কিছুটা প্রবীণ। তারা ইতিমধ্যে এশিয়ার জনপ্রিয় দেশগুলো চষে ফেলেছেন। এখন তারা এমন জায়গা খুঁজছেন, যেখানে পর্যটকদের ভিড় নেই, যা এখনো অচেনা। তারা এ দেশের সাধারণ অবকাঠামো মেনেই রোমাঞ্চের খোঁজে আসছেন।'
ও'ব্রায়েন আরও বলেন, 'আমরা আশা করি মানুষ বাংলাদেশের রূপ দেখুক। তবে ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশ হয়তো কখনোই 'মেইনস্ট্রিম' বা সবার গন্তব্য হয়ে উঠবে না। তবে যারা সত্যিকার অর্থেই পর্যটনের বাণিজ্যিক ভিড়ে হারিয়ে না যাওয়া কোনো দেশ দেখতে চান, তাদের তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে আসছে। তাঁরা নেতিবাচক খবরগুলোকে পাশ কাটিয়ে এ দেশের অকৃত্রিম সৌন্দর্য দেখতে প্রস্তুত।'
ট্যুর অপারেটর ফাহাদ আহমেদও ও'ব্রায়েনের সঙ্গে একমত। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তিনি নিজেও 'মাস ট্যুরিজম' বা দলে দলে পর্যটক আসাটা সমর্থন করেন না।
ফাহাদ বলেন, 'সত্যি বলতে কী, আমরা চাই না পর্যটকের ঢল নামুক। আমরা চাই তারাই আসুক, যারা মন থেকে বাংলাদেশকে দেখতে চায়, এ দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে চায়। যদি শ্রীলঙ্কার মতো লাখে লাখে পর্যটক এখানে আসতে শুরু করে, তবে আমরা আমাদের স্বকীয়তা হারাব। তখন আর সেই 'আসল বাংলাদেশ'কে খুঁজে পাওয়া যাবে না।'
