অর্থবিল পাস: করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, থাকছে না কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
সংসদ সদস্যদের নানামুখী সমালোচনা, জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর পর জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি 'অর্থবিল ২০২৬'।
সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা পাস হয়।
এবারের অর্থবিলে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিপর্যায়ে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং বহুল আলোচিত কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ বাতিল। এছাড়া সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন (TIN) বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা ও অন্যান্য সংশোধনী
পাস হওয়া অর্থবিলে ব্যক্তিপর্যায়ে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা সংসদ গ্রহণ করে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য বিক্রির ওপর আরোপিত অগ্রিম করও বাতিল করা হয়েছে।
আরেকটি স্বস্তির খবর হলো, এখন থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে আর টিআইএন নম্বরের প্রয়োজন হবে না। মূলত করযোগ্য আয় নেই এমন ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সেবায় বিড়ম্বনা কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল
প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে নির্ধারিত কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সংস্থা প্রশ্ন করতে পারবে না বলে বিধান ছিল। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করেছিল।
শেষ পর্যন্ত সরকার এই 'ইনডেমনিটি' বা দায়মুক্তির সুবিধা বাতিল করেছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এখন থেকে যে কেউ চাইলে নিয়মিত করের সঙ্গে আরও ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবেন। তবে ওই অর্থের উৎস নিয়ে যেকোনো সংস্থা প্রশ্ন তোলার আইনি অধিকার রাখবে। ফলে 'কালো টাকা' সাদা করার বিশেষ সুবিধাটি কার্যত আর থাকছে না।
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিশেষ কর সুবিধা
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে বসবাসকারী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য কর অব্যাহতির পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বিলে তাদের বেতন ও সম্পদ থেকে অর্জিত আয় করের আওতায় আনার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে তা বাতিল হয়। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, পার্বত্য ও সমতলের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বেতন, ব্যবসা এবং কৃষি আয়ও সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত থাকবে। এর আগে ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশ ও ২০২৩ সালের আইনেও এই সুবিধা ছিল, যা এখন আরও বিস্তৃত হলো।
সংসদে আলোচনা ও সমালোচনা
বিলটি পাসের আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ বেশ কয়েকজন সদস্য এটি জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। সংসদ সদস্যরা বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ঋণের আশ্বাসের বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত আলোচনার পর এসব সংশোধনী যুক্ত করে বিলটি পাস হয়।
অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও আর্থিক অপরাধ দমন
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।' তিনি জানান, সরকার এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি পেয়েছে। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, আর্থিক অপরাধ দমনে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে-বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে এবং ৬টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।
সবশেষে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি রূপরেখা।
