সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিদ্যুৎহীন বেশিরভাগ এলাকা
সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বেড়েছে নদনদীর পানি। ফলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে অনেক এলাকা। জেলার প্রায় সবকটি উপজেলায়ই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, বন্যায় সাবস্টেশন ডুবে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছে জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা। এতে পানিবন্দিদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
ঢলে সৃষ্ট এই বন্যা ফের আঘাত হেনেছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। করোনার ধকল কাটিয়ে না উঠতেই বন্যার কারণে বন্ধ হয়েছে গেছে জেলার সাত শতাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।
বুধবার দুপুরে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সাংসদ ড. একে আব্দুল মোমেন এবং দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুল হক। তারা দুজনই আশ্বাস দিয়েছেন, তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া সিলেটের প্রধান দুটি নদী সুরমা ও কুশিয়ারা দ্রুত খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, খাবার পানির সংকট
বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। দক্ষিণ সুরমা, উপশহরসহ কয়েকটি এলাকার বিদ্যুতের সাবস্টেশন পানিতে তলিতে গেছে। ফলে এসব এলাকায় মঙ্গলবার থেকে বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ।
এছাড়া বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, সদর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বেশিরভাগ এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির।
তিনি বলেন, কিছু জায়গায় সাব স্টেশনের যন্ত্রপাতি পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার অনেক জায়গার বাসাবাড়ির মিটার পর্যন্ত ডুবে গেছে। এ কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। পানি না কমলে এটি স্বাভাবিক হবে না।
পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎহীনতা পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎহীনতার সাথে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবায়ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সিলেটে। সব মিলিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে চতুর্থ দিনের মতো সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার কানাইঘাটের পানির উচ্চতা ৬ সেন্টিমিটার কমলেও সিলেটে বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার। নগরে ও গ্রামে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
বন্যায় আগেই প্লাবিত হয়ে পড়া ছয় উপজেলা সদর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা।
সিলেট নগরের মাছিমপুর এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'তিনদিন ধরে ঘরে পানি। পানির কারণে ঘর থেকেও বের হওয়া যাচ্ছে না।'
তিনি বলেন, খাবারের কোন সংকট না থাকলেও সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে খাবারের পানির ও বাথরুম ব্যবহারে। বিশেষত নারী ও শিশুরা সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যার্তদের জন্য সিলেট জেলায় ১৯৯টি ও নগরে ২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলেন, উজানে বৃষ্টি না থামলে পানি কমার কোন সম্ভাবনা নেই।
বন্যার প্রকোপ শিক্ষায়
কারোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরপর কিছুদিন ক্লাস হওয়ার পরই শুরু হয় ঈদের ছুটি। সেই ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতেই এবার সিলেটে বন্যার কারণে ব্যাহত শিক্ষাকার্যক্রম।
সিলেটের অন্তত সাড়ে ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে সিলেট জেলার প্রায় সাড়ে ৭০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম। এতে শিক্ষার্থীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ৪৭৭টি। এর মধ্যে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৪০০টি বিদ্যালয় পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান। গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়ই সবচেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাখাওয়াত এরশেদ বলেন, যেসব বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে সেগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানি বাড়ার কারণে নতুন করে আরও বিদ্যালয় প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় দেড়শটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পানি উঠে গেছে। এগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
প্লাবিত হয়েছে কানাইঘাটে ৪২টির মধ্যে ৩৭টি, বিশ্বনাথে ৫১টির মধ্যে ৫টি, জৈন্তাপুরে ৩২টির মধ্যে ১২টি, সদরে ৯৫টির মধ্যে ১৮টি, গোয়াইনঘাটে ৪৮টির মধ্যে ১৮টি ও কোম্পানীগঞ্জে ২৬টির মধ্যে ১৫টি, দক্ষিণ সুরমা ও নগরে আরও প্রায় ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
এখনও পানি না ওঠা অনেক বিদ্যালয়েও বন্ধ রয়েছে পাঠদান। এরমধ্যে সিলেট জেলায় ১৯৯টি ও নগরে ১৭টি বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ২০টি কলেজ প্লাবিত হয়ে পড়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, জেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ায় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, সেগুলোর শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, 'পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদেও ক্ষতি তো হবেই। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তো আমাদের কিছু করার নেই। পানি কমলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।'
নদী খননের আশ্বাস
বুধবার দুপুরে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবুল মোমেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক।
নগরের চালিবন্দর এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবুল মোমেন বলেছেন, 'সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এই দুই নদী খনন করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক। আমরা নদী খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী বর্ষার আগেই নদীগুলো খনন করতে হবে।'
মন্ত্রী বলেন, 'সিলেটে এই মৌসুমে সবসময়ই ঢল নামে। আমাদের ছেলেবেলায়ই এমনটি দেখেছি। কিন্তু পানি আটকে থাকত না। চলে যেতো। কারণ আমাদের শহরে অনেক পুকুর ও দিঘী ছিলো। প্রত্যেক বাড়ির সামনে পুকুর ছিল। আর সিলেটকে বলা হতো দিঘীর শহর। কিন্তু এখন আমরা নগরের ভেতরের সব পুকুর, দিঘী ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং করেছি। হাওরগুলো ভরাট করে ফেলেছি। এছাড়া প্রধান নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। খালি মাঠগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে পানি নামতে পারছে না। যেকোনো দুর্যোগেই সিলেটের জন্য এটা একটা ভয়ের কারণ।'
মন্ত্রী নগরের ভেতরের পুকুর-দিঘীসহ জলাশয়গুলো রক্ষায় সবাইকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া ড্রেনগুলো খনন করা ও আরও বড় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সিস্টেমটাকে নষ্ট করা যাবে না।
এ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক বলেন, সিলেটের বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লক্ষ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও বরাদ্ধ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, 'দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত আছে। আমরা আজকে সিলেটের দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখব। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করব। সবার সাথে আলাপ করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে জানব। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
বন্যা মোকাবেলায় আগামীতে এই অঞ্চলের নদনদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রীও। তিনি বলেন, 'নদীর পানিধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এই নদীগুলো ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
প্রসঙ্গত, গত ১০ জুন থেকে সিলেটে ভারী বর্ষণ শুরু হয়, যা এখনও চলমান রয়েছে। একইসঙ্গে উজান থেকে নামছে ঢল। এতে গত ১১ জুন থেকেই সিলেটের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যেতে শুরু করে। আর গত সোমবার থেকে পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে সিলেট নগর। এখন বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
