যেভাবে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করল
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন সেখান দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তার জন্য একটি নতুন মিশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কমান্ডাররা জানিয়েছিলেন, একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী সেখানে ইরানের যেকোনো হামলা প্রতিহত করবে।
এই মিশনকে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' নাম দেয় পেন্টাগন। তবে সৌদি আরবের এ সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তে বেশ অবাক হয় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন বাহিনী এই মিশনের জন্য দেশটির আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। এ বিষয়ে মার্কিনিরা আগে থেকে সৌদির সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি।
উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপ ও কূটনৈতিক চাপ
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং সৌদি আরবের নেতা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপ শুরু হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প এই অভিযানের প্রথম দিন অর্থাৎ ৪ মে এবং পরবর্তী দুই দিনও যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলাদা একটি ফোনালাপে যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও কথা বলেন।
তবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে আমেরিকার এই পরিকল্পনা পুনরায় যুদ্ধকে উসকে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
ওয়াশিংটনের 'আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট'-এর গবেষক হুসেইন ইবিশ বলেন, 'তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিলে ইরান তাদের ওপর আরও ভয়াবহ হামলা চালাবে।'
নিরাপত্তা ও কৌশলগত মতবিরোধ
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রভাবিত করার জন্য হোয়াইট হাউসের এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টার খবর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এই ঘটনা এবং যুদ্ধ চলাকালীন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো থেকে স্পষ্ট যে ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে মার্কিন ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। সৌদি আরব এখন মার্কিন সরকারকে অনির্ভরযোগ্য এবং কখনো কখনো উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করার পর থেকে সৌদি আরব নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একটি মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং এ কারণে ইরানের হামলার শিকারও হয়েছে। তবে যখনই তারা আমেরিকান ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে বড় ধরনের বিপদ অনুভব করেছে, তখনই তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছে।
ট্রাম্প যখন তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালানোর চেষ্টা করছেন, তখন সৌদি আরব আমেরিকার অগ্রাধিকারের বাইরে গিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান ও চীন। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতাতেই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হয়েছিল। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সপ্তাহেই চীন সফর করছেন।
এই কূটনৈতিক সুযোগের কারণে সৌদি কর্মকর্তারা এখন সরাসরি তাদের ইরানি সমকক্ষদের সঙ্গে কথা বলছেন। তারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীদের প্রতি সমর্থন নিয়ে আলোচনা করছেন। সৌদি নেতৃত্ব এই বিষয়গুলোকে পারমাণবিক ইস্যুর চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
সৌদি যুবরাজের ভারসাম্য রক্ষার নীতি
মোহাম্মদ বিন সালমান সারা বছর ধরেই একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়ে জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরান সরকারকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধও করেছিলেন। তবে সৌদি আরব এই তথ্য অস্বীকার করেছে। ইরানের শক্তি অপরিবর্তিত থাকায় পরবর্তীতে মোহাম্মদ বিন সালমান একটি সমঝোতার জন্য চাপ দেন।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলে ইরানের বিরুদ্ধে গোপন প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। তবে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমিরাত নেতার মতো মোহাম্মদ বিন সালমান যুদ্ধ পরিস্থিতি খুব একটা বাড়াতে চাননি। একই সাথে মোহাম্মদ বিন সালমান কাতার ও ওমানের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাইরে ইরানের সঙ্গে আরও বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি ফলাফল চাইছে যা ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে তাদের সুরক্ষা দেবে।
যুদ্ধ চলাকালীন ট্রাম্পের দোদুল্যমান অবস্থানের কারণে রিয়াদ এখন প্রশ্ন তুলছে যে ভবিষ্যতে কোনো দ্বন্দ্বে আমেরিকানরা তাদের সুরক্ষা দেবে কি না। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তখন থেকেই তার ওপর রিয়াদের সন্দেহ তৈরি হয়।
তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্পের 'চমৎকার সম্পর্ক' রয়েছে। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো ইস্যুতে বিভিন্ন ধরনের মতামত শোনেন এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে নেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আমেরিকান জনগণ ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।' এ বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
অটুট দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
মার্কিন-সৌদি অংশীদারত্বের কিছু দিক এখনো শক্তিশালী রয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের একটি চুক্তির পর সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার বিষয়ে দুই দেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসন শীঘ্রই এই পরিকল্পনা কংগ্রেসে উপস্থাপন করতে পারে, যদিও কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে সৌদি যুবরাজ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারেন।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথ তৈরির বিষয়েও আলোচনা করছে। এছাড়া সৌদি আরব এখনো মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ট্রাম্পের দুটি মেয়াদেই তার প্রথম বড় বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরবে। জ্যারেড কুশনার সরকারি পদে না থাকলেও মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং নিয়মিত রিয়াদ সফর করেন। চার বছর আগে কুশনারের একটি ফান্ডে সৌদি যুবরাজের নেতৃত্বাধীন তহবিল থেকে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য উপহাস ও নতুন উত্তেজনা
সম্পর্ক ভালো থাকলেও যুদ্ধের সময় ট্রাম্প প্রকাশ্যে মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়ে উপহাস করেছেন। গত মার্চে ট্রাম্প অবজ্ঞার সুরে বলেছিলেন যে, যুবরাজ তাকে ও তার প্রশাসনকে অবমূল্যায়ন করেছেন। মিয়ামিতে সৌদি আরবের আয়োজিত এক বিনিয়োগ ফোরামে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'তিনি ভাবেননি যে তাকে আমার তোষামোদ করতে হবে।'
উত্তেজনার আরও চিহ্ন দেখা গেছে যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহে পারস্য উপসাগর সফর করেন। তিনি বাহরাইন, কুয়েত এবং আমিরাত সফর করলেও সৌদি আরব যাননি। তবে বাহরাইনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান তার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন।
অমীমাংসিত সংকট
সৌদি আরব যুদ্ধবিরতিতে স্বস্তি পেলেও যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো মিটে যায়নি। প্রাথমিক চুক্তিতে এটি স্বীকৃত হয়েছে যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এমনকি ইরান ও ওমান দীর্ঘমেয়াদে সেখানে টোল বা ফি আদায়ের বিষয়ে একমত হতে পারে।
প্রাথমিক নথিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সমর্থনের বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পুনরায় পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প ওবামা আমলের চুক্তি থেকে সরে এসেছিলেন, যার ফলে ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে।
সৌদি আরব প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এই সমঝোতা স্মারকের প্রশংসা করেছে। গত ১৮ জুন ভিয়েনায় এক ফোরামে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বলেন, 'এই সমঝোতা স্মারকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। আশা করি এটি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের পথ খুলে দেবে, যার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুটি প্রধান।'
তবে সৌদি কর্মকর্তারা এই সমঝোতা স্মারকের ফলাফল বিষয়ে এখনো 'ধীরে চলো' নীতি অবলম্বন করছেন। ইরান পুনর্গঠনের জন্য চুক্তিতে যে তহবিলের কথা বলা হয়েছে, তাতে সৌদি আরব এখনো কোনো অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
