ইরানে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর কথা ভাবছিলেন ট্রাম্প, শেষ পর্যন্ত কূটনীতিতেই জোর: প্রতিবেদন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ১৮ আগস্টের ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি না হলেও সেটিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন না ট্রাম্প। তিনি এ কথা তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা থেকে সরে আসা উচিত কি না এবং তার পরিবর্তে সামরিক হামলা চালানো হবে কি না— সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পথে হাঁটতে চান না। যদিও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনাকে 'কাজটি শেষ করে ফেলা' হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা লঙ্ঘনের ঘটনায় সীমিত সামরিক জবাবের বাইরে যেতে অনাগ্রহী ট্রাম্প। তার আশঙ্কা, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে কূটনৈতিক সমাধান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় ট্রাম্প কিছুটা হতাশ। তবে ১৮ আগস্ট শেষ হওয়া ৬০ দিনের সময়সীমা পেরিয়েও আলোচনা চালিয়ে যেতে তিনি আগ্রহী।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তেজনা এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে যোগাযোগব্যবস্থা (ডি-কনফ্লিকশন চ্যানেল) চালু করেছে, তা ইতোমধ্যে দুই পক্ষই ব্যবহার করেছে। এই ব্যবস্থায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। তবে কাতার ও ইরান জানিয়ে দেয়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়নি। এতে সোমবার ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়।
এদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়, তবে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমরা সংলাপের পথেই আছি। কিন্তু আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে আমরাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং সে অনুযায়ী জবাব দেব।'
গালিবাফ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলাকালে ইরান এক ব্যারেল তেলও রপ্তানি করতে পারেনি। তবে অবরোধ শিথিল হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করেছে দেশটি।
তিনি বলেন, 'অবরোধ তুলে নেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা ৪ কোটির বেশি ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছি। অথচ তার আগের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিনে আমরা এক ব্যারেল তেলও রপ্তানি করতে পারিনি।'
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে গালিবাফ বলেন, 'হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্ব ইরান ও ওমানের। এই প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিয়মও ইরান নির্ধারণ করবে।'
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ইরানকে কোনো ধরনের টোল আদায় করতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, 'হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ইরান টোল আদায় করবে— এমন পরিস্থিতিতে কোনোকিছু শেষ হবে না।'
এসব বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কথা। একই সঙ্গে স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের রয়েছে। ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হলে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি থেকে তারা টোল আরোপ করবে।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার অন্তর্বর্তী সমঝোতা অনুযায়ী, দুই দেশের ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে সমাধানে পৌঁছানোর কথা।
অন্যদিকে, এই সমঝোতা আলোচনায় ইসরায়েল অংশ নেয়নি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এ চুক্তি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। ইসরায়েলের কর্মকর্তারা মনে করেন, চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ বা দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল করার মতো তাদের মূল লক্ষ্যগুলোর কোনো সমাধান হয়নি।
