অন্য গ্রহের প্রাণ: সাহিত্য আর চলচ্চিত্রে
১
তিন ভাগ জল নিয়ে পৃথিবী ছুটে চলেছে নিজের কক্ষপথে। এই ছুটে চলার গতি খানিকটা করে মন্থর হয়ে আসছে বলে শোনা যায়। অনেক সময় আমরা জানতে পারি, চলবার গতিপথ কয়েক ডিগ্রি হেলে পড়ছে। সূর্যের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলে অথবা সূর্য থেকে খানিকটা পিছিয়ে গেলে পৃথিবীর তাপমাত্রার বিপুল তারতম্য ঘটবে।
অল্প বয়সে বিজ্ঞান বইতে আমরা পড়তাম ওজোন স্তর ফুটো হয়ে অতিবেগুনি রশ্মি প্রবেশ করার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বড় হতে হতে রীতিমতো শারীরিকভাবে টের পেলাম বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব কত দূর পর্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। যে ঋতুতে যা হয়ে এসেছে আবহমান কালজুড়ে, সেসব আর ঘটে না। বেশ কয়েক দশক জুড়েই মানুষ ভালো নেই।
আমাদের মনের অবস্থা যখন দুর্বল থাকে, তখন আমরা ভাবি, কেউ একজন পাশে থাকুক। সেই পাশে থাকা কখনো ঈশ্বরের নামে আসে আবার কখনো আসে ভিনগ্রহীদের চেহারায়। আমরা সব সময় চাই আমাদের খারাপ সময়ে কেউ না কেউ পাশে বসুক। উড়ন্ত সসার বা ইউএফও এই একান্ত বাসনার পালে হাওয়া দিয়েছে। ইউএফও-সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ অথবা গুজব আমরা গোগ্রাসে গিলেছি।
বাংলা ভাষায় এলিয়েনদের নিয়ে নেই নেই করেও কিছু কাজ হয়েছে। সরাসরি এলিয়েনরাই আমাদের উপমহাদেশে এসেছে। আবার আমাদের চেনাজানা গল্প উপন্যাসের চরিত্ররাও ঘটনাচক্রে পৃথিবীর বাইরে বেড়াতে গেছে। বিজ্ঞানীরা যখন বুঝতে পেরে গেছেন, পৃথিবী ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, তখন প্রতিনিয়ত ভেবে চলেছেন চাঁদে বা মঙ্গলে মানুষের বসবাসের কথা।
কথাসাহিত্যের কথায় যদি আসি, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা অনেক দিন আগেই মঙ্গল গ্রহ থেকে বেড়িয়ে এসেছেন। ওই গ্রহের অধিবাসীদের সঙ্গে তার দেখাও হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের অবিস্মরণীয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির চরিত্র প্রফেসর শঙ্কুর গল্পে আমরা দেখি, রীতিমতো একটা গ্রহই কোনো এক আশ্চর্য কারণে পৃথিবীতে চলে এসেছে। ছোট্ট বলের মতো একটা গ্রহ।
আমাদের ছেলেবেলার প্রিয়তম কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় অন্য রকম সব অদ্ভুতুড়ে উপন্যাস লিখতেন। পঞ্চাশ বছরের পুরোনো পাক্ষিক আনন্দমেলার শারদীয় আয়োজনে। শীর্ষেন্দু রচিত উপন্যাসগুলোতে মজার সব ভিনগ্রহী চরিত্র ছিল। ভিনগ্রহের এসব সংবেদনশীল অধিবাসীরা পৃথিবীর মানুষদের জীবনের গতিপথ ভালোর পথে বদলে দিয়েছে। কোনো কোনো ভীরু-ভিতু মানুষকে সাহস জুগিয়ে দিয়েছে, সরবরাহ করেছে, মানুষ তখন নিজের শক্তিতেই শক্তিমান হয়ে উঠেছে। তিনি অদ্ভুতুড়ে সিরিজের উপন্যাসে একধরনের যুদ্ধ বিরোধিতার কথা বলেছেন, শান্তির কথা বলেছেন। অল্প বয়সীদের মনে শান্তিময় পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষার বীজ পুঁতে দিতে চেয়েছেন। কয়েক দিন আগে হলিউডের পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ মানুষকে বেশ জ্ঞান দিলেন সততা নিয়ে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আমার হাসি পেল। হলিউড কেমন করে তৃতীয় বিশ্বের কিছু জিনিস আত্মসাৎ করতে পারে, সে বিষয়ে জানা ছিল বলেই হাসি পেল।
২
রায় পরিবারের পারিবারিক পত্রিকা 'সন্দেশ'-এ সত্যজিৎ রায়ের 'বঙ্কুবাবুর বন্ধু' শিরোনামের একটি কল্পবিজ্ঞান গল্প প্রকাশিত হয়, ১৯৬২ সালে। এই গল্পটিই 'দ্য এলিয়েন' ধারণার সূচনাপর্ব। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, সত্যজিৎ রায়ের সাথে সিলনের একজন পেশাদার ডুবুরি মাইক উইলসনের দেখা হয়। তিনি কিংবদন্তি কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের বন্ধু ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে 'দ্য এলিয়েন'-এর সংক্ষিপ্ত গল্পটি শোনার পর ক্লার্ক এই গল্পের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন।
১৯৬৬ সালে সত্যজিৎ রায় লন্ডন সফরে যান। সেখানে ক্লার্কের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সন্দীপ রায় স্মৃতিচারণা করে বলেন, 'বাবাকে স্ট্যানলি কুব্রিক "২০০১: এ স্পেস ওডিসি"র শুটিং দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি এলস্ট্রি স্টুডিওর সেট ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং সত্যিই অভিভূত হন। ফিরে আসার পর তিনি ইংরেজিতে "অবতার" শিরোনামে এক চিত্রনাট্য লেখেন।'
সত্যজিৎ রায়ের হলিউড-যাত্রার বছর ১৯৬৭। মাইক উইলসনের সাথে তিনি কলম্বিয়া পিকচার্সের অফিসে যান। রায় তাদের কাছে চিত্রনাট্যের বেশ কয়েকটি কপি জমা দেন। সন্দীপ রায় মনে করিয়ে দেন, 'বাবা প্রথমে মার্লন ব্র্যান্ডো এবং স্টিভ ম্যাককুইনের সাথে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন। তারা গল্পটি দেখে মুগ্ধ হলেও অন্যান্য প্রজেক্টে ব্যস্ততা ছিল তাদের। পরে রবার্ট রেডফোর্ডের কথা ভাবা হলেও বিভিন্ন কারণে এই প্রায় নতুন অভিনেতার সাথে আর যোগাযোগ করা হয়নি।'
পিটার সেলার্স ১৯৬৮ সালে সত্যজিৎ রায়কে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিতে তিনি রায় বাবুর 'দ্য এলিয়েন' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য থেকে একটি বাক্যাংশ ব্যবহার করার জন্য তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। 'অবতার'-এ একজন মারওয়াড়ি ব্যবসায়ীর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য পিটার সেলার্স অত্যন্ত উপযুক্ত ছিলেন। সেলার্স শুরুতে চরিত্রটিতে অভিনয় করতে রাজি হলেও পরে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিচালক ও সম্ভাব্য অভিনেতার মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেলার্স তার চরিত্রটি পরিবর্তন করার দাবি জানিয়েছিলেন। এই পরিবর্তনের দাবিটিই মতবিরোধের কারণ।
স্ট্যানলি কুব্রিক ১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ রায়কে একটি চিঠি লিখে তার আইনজীবী লুই ব্লকের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান। সন্দীপ রায় বলেন, 'কলম্বিয়া পিকচার্স "অবতার" নামটির ইংরেজি পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। তাই তার নাম রাখা হয়েছিল "দ্য এলিয়েন"। এ ছাড়া বাবাকে মাইক উইলসনের থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল; কারণ, তিনি খুবই সন্দেহজনক চরিত্রের মানুষ ছিলেন।'
সত্যজিৎ রায় আর কোনো উপায় না পেয়ে 'দ্য এলিয়েন' প্রকল্পটি বাতিল করে দেন। 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি'র তরুণ প্রযোজক সুরেশ জিন্দালের লেখা 'মাই অ্যাডভেঞ্চার্স উইথ সত্যজিৎ রায়' বইটিতে এ বিষয়ে কয়েকটি কথা জানা যায়। ভারতীয় পুরাণে 'কর্ম' বলে একটি জিনিস আছে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা পুরাণকে এক বাক্যে সংক্ষিপ্ত করেছে, 'কর্ম ইজ আ বিচ'।
ব্রিটিশ ফিল্ম ফেস্ট, ১৯৭৭ সালে প্রযোজক-পরিচালক একত্রে স্পিলবার্গের 'ক্লোজ এনকাউন্টার অব দ্য থার্ড কাইন্ড' দেখেন। সত্যজিৎ আর সুরেশ দুজনেই স্তব্ধ; কেননা, এটা প্রায় ফটোকপি ষাটেরও বহু আগে লেখা এলিয়েনের। সত্যজিতের গল্প অবলম্বনে কলম্বিয়া পিকচার্সের সাথে ছবিটি করার কথা ছিল। কলম্বিয়ার নিয়মানুযায়ী সত্যজিৎ ছিলেন প্রযোজক। পরে সহপ্রযোজক হন মাইক উইলসন। মাইক পরে শ্রীলঙ্কায় এসে বৌদ্ধ শ্রমণ হন। অনুশোচনা তাকে দগ্ধ করেছিল।
তিনি এই বিষয়ে আর্থার সি ক্লার্ককে চিঠি লেখেন। কিন্তু ক্লার্ক তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তিনি যদি আইনি পদক্ষেপ নেন, তবে তার পুরো সময়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত এবং আদালতের শুনানিতে অংশ নিতেই খরচ হবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। নিজের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের কারণে সত্যজিৎ রায় শেষ পর্যন্ত 'দ্য এলিয়েন' তৈরির পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
খুব কম মানুষই জানেন, সত্যজিৎ রায়কে অস্কারের আজীবন সম্মাননা দেওয়ার জন্য যারা সুপারিশ করেছিলেন, স্পিলবার্গ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। হয়তো হলিউডের পরিচালকের দিক থেকে এটি তার অনুশোচনারই অন্যতম প্রকাশ। প্রায় ষাট বছর পর, 'বঙ্কুবাবুর বন্ধু' থেকে হলিউডের এসব ঘটনার পর, সন্দীপ রায়ের পরামর্শে ভারতীয় কথাসাহিত্যিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য 'অবতার' চিত্রনাট্যটিকে নাতিদীর্ঘ একটি উপন্যাস হিসেবে লেখেন।
৩
হরিপদ কি বঙ্কুবাবুর বন্ধু?
তিনি একজন ছা-পোষা চাকরিজীবী। তার বাড়ির ছাদে ভিনগ্রহী নেমে আসে, যার গোল গোল চোখ। ফিতার ক্যাসেটের দিনগুলোতে অঞ্জন দত্তের অডিও অ্যালবামে হরিপদর সাথে পরিচয় ঘটেছিল। প্রথম লাইনেই অঞ্জন জানান, 'হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটখাটো লোক।'
দিনযাপনের গ্লানিতে হরিপদ যখন ক্লান্ত হতে থাকে, তখনই তাকে সঙ্গ দিতে ছাদে নেমে আসে কেউ একজন, যার গোল গোল চোখ। ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং বঙ্কু বাবুকে ভেতর থেকে বদলে দিয়ে চলে যায়। হরিপদ জীবনের একটা মানে খুঁজে পান ছাদে নেমে আসা বন্ধুর কল্যাণে। আমেরিকান ঔপন্যাসিক অ্যান্ডি উইয়ারের
২০২১ সালে প্রকাশিত উপন্যাস 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে একই নামে এই বছর। অভিনেতা রায়ান গসলিং অসামান্য অভিনয় করেছেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকের ভূমিকায়। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, চলচ্চিত্রটি একাধিক অস্কার পাবে। তিনি এক মহাকাশযানে মহাবিশ্বে উদ্ভূত এক জটিল সমস্যার সমাধানে অভিযানে যান। অন্য গ্রহের এক আশ্চর্য প্রাণীর সাথে তার দেখা হয়, তাদের বন্ধুত্ব হয়।
এক দিক থেকে দেখতে গেলে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির আদলে প্রজেক্ট হেইল মেরি নিঃসঙ্গ মানুষের বন্ধু খুঁজে পাওয়ার অভিযান। অ্যান্ডি উইয়ারের প্রায় সব কাজেই বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ। আরেকটু বেশি করে মানুষ হয়ে ওঠা বা উঠতে চাওয়া।
এমনকি আমাদের ঘরের ছেলে মাসুদ রানাও 'প্রলয় সংকেত' দুই খণ্ডের রানা সিরিজের উপন্যাসে অন্য গ্রহের প্রাণের সাথে বন্ধুত্ব করেছিল। মাসুদ রানার একমাত্র বই, যেখানে পৃথিবীর বাইরের প্রাণের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। ভিনগ্রহের প্রাণীরা ধ্বংসাত্মক রূপে এসেছে এইচ জি ওয়েলসের 'দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড' উপন্যাসে। মঙ্গল গ্রহের প্রাণীদের সাথে যুদ্ধ লাগে পৃথিবীবাসীর।
কখনো সত্যিকার অর্থে অন্য গ্রহের প্রাণীদের সাথে মানুষের বন্ধুত্ব হবে কি না, আমরা এখনো জানি না। কিন্তু আমাদের কল্পনায়, সাহিত্যে আর চলচ্চিত্রে এই ভাবনা বারবার ঘুরেফিরে আসতেই থাকবে।