বগুড়ার এই হাটে এখনও ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি হয়; কী এই পদ্ধতি?
বগুড়ার কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল মালেকের বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। তবে তিনি নিয়মিত দুর্গাপুর হাটে আসেন। খোঁজ নেন বিভিন্ন পণ্যের দাম সম্পর্কে। প্রতিটি মৌসুমেই তিনি কৃষি পণ্য এই হাটেই বিক্রি করেন।
এলাকায় ৭ বিঘা কৃষি জমি রয়েছেন। অধিকাংশ জমিতেই ধান চাষ করেন এই কৃষক। জানালেন, লোকসানের মধ্যেও তাদের উপায়হীনভাবে ধান চাষ করতে। এবারে ধানের ফলন মোটামুটি। তবে দাম কম।
গত ১৯ মে সকালে দুর্গাপুর হাটে ১০ ভার (ধান বিক্রির পুরাতন পদ্ধতি) ধান নিয়ে এসেছিলেন আব্দুল মালেক। প্রতি ভার ধান বিক্রি করেছেন ১,৪০০ টাকা দরে। ওইদিন এক মণ ধান বিক্রি হয়েছে ১,২৪৫ টাকায়।
মালেক জানালেন, "গাড়ি-ঘোড়া চলাচলের আগে এই অঞ্চলের মানুষ নিজে কাঁধে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পণ্য সামগ্রী একস্থান থেকে অন্যস্থানে আনা-নেওয়া করতেন। কিছু মানুষ ভারে (সাধারণত কাঁধে বাঁশ জাতীয় বস্তু রেখে দুই প্রান্তে পণ্য ঝুলিয়ে বহন করা) করে প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বহন করতেন। তখন এক ভারে ৯ ধারা পণ্য থাকতো। প্রতি ধারার ওজন ৫ সের (আগের ওজন পদ্ধতি)। এই হিসেবে এক ভারের ওজন হয় ৪৫ সের। এই হাটে ভার পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রির বিধান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি।"
এবারেও এই ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি হচ্ছে দুর্গাপুর হাটে। কিন্তু যুগ আধুনিক হওয়ার কারণে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা এখন কেজিতে রূপান্তর করে দাম দেন চাষীদের। এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ৪০ কেজিতে এক মণ হিসেবে ধান কেনাবেচার ঘোষণা দেয় উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু চাষীরা এখনো স্বতঃস্ফুর্তভাবেই ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি করছেন।
এলাকার প্রবীণ মানুষ, ব্যবসায়ী, চাষীসহ আরও অনেকের সাথে কথা বলে ভার পদ্ধতি চালুর সঠিক কোনো সময় জানা গেলো না। তবে অনেক পুরাতন ব্যবসায়ী ও চাষীরা বলছেন, ঐতিহাসিক কাল থেকেই এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। মানুষের সুবিধার জন্যই করা হয়েছিল। এর যথাযথ কারণও আছে।
তারা বিষয়টির ব্যাখ্যা করে বলেন, আগের দিনের মানুষ ভারে করে ধান বহন করতেন। সেই ধান সেদ্ধ করার পর শুকিয়ে চল করতেন। ধানের রেশিও হলো, তিন ভাগের ২ ভাগ চাল হবে। এক ভাগ গুড়োসহ অন্যান্য কিছু হয়। সেই নিয়মে ৯ ধারা ধান থেকে ৬ ধারা চাল হতো। এই হিসেবে দুই ভার ধান কিনলে দেড় মন চাল হবে। এই চাল ব্যবসায়ীরা যেকোনো জায়গাতে ভারে করে নিয়ে চলাচল করবেন (আগে মানুষ এভাবেই ব্যবসা করতেন)। অর্থাৎ ব্যবসায়ীক সুবিধার জন্যই এই পদ্ধতি তৈরি হয়েছিল। কারণ দেড় মণ চালও ভারে করে বাজারে বা অন্য কোথায় নিয়ে বিক্রি করাও সহজ হতো। এই হিসাব থেকেই ৯ ধারায় এক ভার পদ্ধতির প্রচলন।
দুর্গাপুরে হাট বসে সপ্তাহে মঙ্গল ও শুক্রবার। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলে সকাল ১০টা পর্যন্ত। তবে ভরা মৌসুমে দিনের অন্য সময়ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ধান কেনেন।
হাটবার ছাড়াই গত ১৮ মে কাহালু উপজেলার নলঘড়িয়ার বাসিন্দা আব্দুর রহিম দুর্ঘাপুর হাটে ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন। ৩৮ বছর ধরে বোরো চাষ করছেন তিনি। এবারে ৩ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছেন।
জানালেন, "উপজেলার অন্য কোনো হাটে ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রির প্রথা নেই। কিন্তু এই হাটে এখনো ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি হয়। এখানে দামে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বা হয় না। কারণ চাষীরা ৮ ধারা নিয়ে আসলে ৪০ কেজির দাম পান। এক ভার (বর্তমান এক ভার সমান ৪৫ কেজি) নিয়ে আসলে পান ৪৫ কেজির দাম। আমার দাদাকে এই হাটে এভাবে ধান বিক্রি করতে দেখেছি।"
ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রির সুবিধা আছে উল্লেখ করে কাহালু উপজেলার সাবানপুর এলাকার চাষী সজিব মিয়া বলেন, "এখন মানুষ কেউ আর ভারে ধান নিয়ে আসেন না। সবাই ভ্যান কিংবা বেশি হলে ভটভটি কিংবা ট্রাকে করে ধান বিক্রি করতে হাটে নিয়ে আসেন। ছোট ছোট চাষীরা সাধারণত ভ্যানের মাধ্যমে ধান বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। সেখানে ৪৫ কেজি, অর্থাৎ এক ভার ধানের জন্য ভ্যানের ভাড়া দিতে হয় ২০ টাকা। আবার ৪০ কেজি নিয়ে আসলেও ২০ টাকাই ভাড়া দিতে হয়। এখানে ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসলে চাষীরা লাভবান হন। এটিও ভার পদ্ধতি এখনো টিকে থাকার একটি কারণ।"
গত ১৯ মে কাহালুর পাতাঞ্জ এলাকার চাষী বুলু মণ্ডল ভ্যানে করে ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন দুর্গাপুর হাটে। এই হাটে সাধারণত অন্য উপজেলার লোকজন ধান বিক্রি করতে আসেন না বলে জানান তিনি।
বললেন, "আশপাশের সব হাটেই ৪০ কেজি মণ ধান বিক্রি হয়। এখানে এখনো ভারে বিক্রি হচ্ছে; কারণ চাষীরা ৪৫ কেজির দাম পায়। ঐতিহাসিক কারণেই এই হাটে এমন পদ্ধতি এতোদিন টিকে ছিল। তবে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪০ কেজিতে একমণ ধান বিক্রির জন্য মাইকিং করা হয়েছে। ভার পদ্ধতিতে ধান বিক্রি নিষেধ করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে এখনো ভার পদ্ধতিতেই ধান বিক্রি করছেন।"
বিক্রির পদ্ধতি যেমনই হোক, কৃষক সঠিক মূল্য পান বলে জানালেন এই হাটে ৪০ বছর ধরে ধানের ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক। "এখানে শুধু এক ভার নয়, অনেকে কম পরিমাণ ধানও নিয়ে আসেন কৃষকরা। তখন কেজি অনুযায়ী দাম পান।"
মালেক আরও বলেন, "সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে; ৪০ কেজিতে একমণ ধরে ধান কিনতে হবে। কিন্তু চাষীরা এখনো অভ্যস্ত হয়নি। তবে আমরা কেজি অনুযায়ী হিসাব করে তাদের পাওনা পরিশোধ করছি।"
কাহালু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মলিহা খানম বলেন, "দুর্গাপুর হাটে প্রাচীন পদ্ধতিতে (ভার) ধান বিক্রি হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এই পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ছিল। সাধারণ মানুষের দাবি ছিল, আধুনিক পরিমাপ পদ্ধতিতে ধান বিক্রির। এ কারণেই সরকার নির্ধারিত আদর্শ পরিমাপ পদ্ধতিতে ধান বিক্রির জন্য প্রচার চালানো হয়েছে। এতে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে বলে আমরা আশা করি।"
