বেশি দামে জ্বালানি ক্রয়ে বাড়বে সরকারের ভর্তুকির বোঝা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এর জেরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা অনেকটা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশকে প্রায় দ্বিগুণ দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজার থেকে বাড়তি দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগও নিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে বেড়ে গেছে কয়লার দামও। এতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাবে।
তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ অনেক বেশি বাড়বে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এই মুহূর্তে হঠাৎ দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোরও সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার স্বার্থে বাড়তি দামে হলেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে থমকে যেতে পারে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অন্য দেশগুলোও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, তা পরে পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে।
ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ মোকাবিলায় করের হার না বাড়িয়ে কর আদায়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যারা কর ফাঁকিবাজদের থেকে কর আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলে ভর্তুকির এই বড় ধাক্কা কিছুটা সামলানো সম্ভব হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজিতে ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা।
তবে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে না হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া ২,৬৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল ও পায়রা কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়ার পরিমাণ ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
কোম্পানিগুলোর বকেয়া পরিশোধ করা না হলে চলতি সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়কে যুদ্ধ শুরুর আগেই জানিয়ে রেখেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৬২ হাজার কোটি টাকা ও এলএনজিতে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
তবে সরকার জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি দেয় না, বরং গত কয়েক বছর এ খাত থেকে মুনাফা করেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি প্রশাসনকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে পারছে না বাংলাদেশ।
অন্য কোনো উৎস থেকে কিনে ক্রুড তেল পরিশোধন করার সক্ষমতা বাংলাদেশের না থাকায় এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
ইরানের আক্রমণের মুখে কাতার ও ওমানও এলএনজি রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। এ দুটি দেশ থেকে বাংলাদেশ জিটুজি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে থাকে। এই ঘাটতি মেটাতে সিঙ্গাপুর থেকে আড়াইগুণ বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, এলএনজির দাম ইতিমধ্যেই ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। এলপিজির দামও চুক্তিবদ্ধ মূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি চড়া।
তিনি বলেন, আমদানিকারক দেশগুলোর মজুত কমতে শুরু করলে এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় সরবরাহ সংকুচিত হলে দাম আরও বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ টিবিএসকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে ভর্তুকির চাপ অনেক বাড়বে।
'বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী দেশ থেকে আমদানি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েই সংকট দেখা দিতে পারে,' বলেন তিনি।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাড়তি দামে যে পরিমাণ তেল-গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে, সেটুকুর ক্ষেত্রে সরকার দাম কিছুটা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরবরাহের রুট বিঘ্নিত হওয়ায় চড়া দামে তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানি করতে হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে ভর্তুকির পরিমাণ অনেকটা বাড়বে।
তবে আর্থিক চাপ থাকলেও শিল্পোৎপাদন সচল রাখতে আমদানির বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন।
ভর্তুকির বোঝা সামলাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপচয় রোধ এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন তিনি।
পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংতহন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খানে বলেন, জ্বালানি আমদানির বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করলে খরচ কিছুটা কমানো যেতে পারে।
