ড্রোন যুদ্ধের রূপকার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভকে বরখাস্ত করলেন জেলেনস্কি
ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধ কর্মসূচির তরুণ ও জনপ্রিয় মুখ এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে গতকাল বুধবার বরখাস্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর এই হঠাৎ বিদায় ইউক্রেন সরকারের বড় ধরনের রদবদলের অংশ। তবে প্রযুক্তি-ভিত্তিক এবং ড্রোন ও রোবটের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছিল, ফেদোরভের বিদায়ের পর তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মাত্র ছয় মাস দায়িত্ব পালনের পর এই বিদায়ের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ। নিজের যুদ্ধকৌশলকে তিনি 'উদ্ভাবনের গতিতে যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ফেদোরভ বা প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি যে সরকারের অন্য কোনো পদে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হবে কি না।
ফেদোরভের এই বিদায় ইউক্রেন সরকারের একটি বড় ধরনের রদবদলের অংশ, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকেও বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদচ্যুতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
ফেদোরভের পদচ্যুতির এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইউক্রেন ও তার বাইরে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ঐতিহ্যবাহী সামরিক জেনারেলদের সঙ্গে ফেদোরভের তীব্র নীতিগত বিরোধ ছিল, যারা তাঁর 'রোবট যুদ্ধ' বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির যুদ্ধকৌশলকে অবাস্তব বা কল্পনাপ্রসূত হিসেবে দেখতেন। অন্যদিকে, ফেদোরভের কিছু সংস্কার উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত অস্ত্র সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুব্ধ করেছিল। কারণ এসব পদক্ষেপ তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল 'ব্রেভওয়ান' নামের একটি ওয়েবসাইট—যা সেনাদের নিজেদের অস্ত্র সরাসরি কেনার সুবিধা দিত এবং পরিচিতি পেয়েছিল 'অস্ত্রের অ্যামাজন' হিসেবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ফেদোরভের মেয়াদে ইউক্রেনীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তাঁর সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ড্রোন প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত সাফল্য পায়, যার ফলে রাশিয়ার ভেতরে গিয়ে ধারাবাহিক হামলা চালানো এবং অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ করে রাখা সম্ভব হয়।
তবে গত জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইউক্রেনের সর্বকনিষ্ঠ এই মন্ত্রী সেনাবাহিনীর জেনারেলদের সঙ্গে বিরোধে জড়ান। জেনারেলদের যুক্তি ছিল, প্রযুক্তির চেয়েও যুদ্ধের মাঠে পদাতিক বাহিনীর সরাসরি ও বিপজ্জনক মোতায়েনই এখনো সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
এ ছাড়া সামরিক কেনাকাটার পদ্ধতিতে সংস্কার আনার কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা শিল্পের শক্তিশালী ঠিকাদারদেরও শত্রুতে পরিণত হন ফেদোরভ। সেনাবাহিনীর ভেতরেও তাঁর অনেক সমালোচক ছিলেন, যারা তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতার অভাবের কথা তুলে ধরতেন এবং তিনি কেবল চমৎকার উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) তৈরিতে দক্ষ বলে কটাক্ষ করতেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ড্রোন কর্মসূচির মূল মুখপাত্র হয়ে ওঠাও—ফেদোরভের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ ইউক্রেনের ক্ষমতা কাঠামো সম্পূর্ণভাবে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির নিয়ন্ত্রণে।
কিয়েভ-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক পেন্টা সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজ-এর প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো বলেন, "জেলেনস্কি চান কেবল তিনিই একমাত্র 'তারকা' হয়ে থাকবেন।" ফেদোরভ রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছ থেকেও সমর্থন পাচ্ছিলেন, যাকে জেলেনস্কি নিজের জন্য একটি হুমকি হিসেবে দেখে থাকতে পারেন বলে ফেসেনকো মন্তব্য করেন।
ইউক্রেনের প্রধান বিরোধী দল ইউরোপিয়ান সলিডারিটি-র সংসদ সদস্য ভলোদিমির আরিভ বলেন, ফেদোরভকে আবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হলে তিনি তাঁর পক্ষেই ভোট দিতেন। তাঁর মতে, ফেদোরভকে মূলত সেই সব "দুর্নীতিবাজ চক্র" কোণঠাসা করেছে, যারা প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো থেকে নিজেদের বড় মুনাফা বজায় রাখতে চায়।
প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি ও রক্ষণশীল জেনারেলদের প্রভাবে, একজন তরুণ ও উদ্ভাবনী নেতাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার কারণে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ক্ষোভের জেরে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে রাজপথে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ফেদোরভ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বিদায়ের ঘোষণা দেন। সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, জেলেনস্কি নতুন মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ফেদোরভের নাম প্রস্তাব করেননি।
ফেদোরভ লিখেছেন, "ইউক্রেনের জনগণের সেবা করতে পারা ছিল আমার জন্য এক মহান সম্মান।" সেই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অর্জন এবং কী কী কাজ এখনো বাকি রয়েছে তার একটি বিস্তারিত তালিকাও তুলে ধরেন।
