প্রশান্ত মহাসাগরে সাবমেরিন থেকে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চীনের, ৩ দেশের উদ্বেগ
প্রশান্ত মহাসাগরে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে সফলভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে চীনের সামরিক বাহিনী। গত সোমবার চালানো এই পরীক্ষার পর প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে সোমবার বেলা ১২টা ১ মিনিটে ডামি ওয়ারহেডসহ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে নিক্ষেপ করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্বনির্ধারিত জলসীমায় পড়েছে বলে জানালেও সেটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি সিনহুয়া।
সিনহুয়া এই উৎক্ষেপণকে চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের একটি 'নিয়মিত আয়োজন' হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা আরও বলেছে, এই পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেছেন, চীন এই পরিকল্পিত পরীক্ষার বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারকে আগে থেকেই অবহিত করেছিল। তবে এই পরীক্ষা অঞ্চলটিকে 'অস্থিতিশীল' করে তুলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফিজি-র রাজধানী সুভায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের পেনি ওং বলেন, 'অস্ট্রেলিয়া বরাবরই স্পষ্ট করে বলেছে, এই পরীক্ষা চীনের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ। তারা অঞ্চলটির প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বচ্ছতা রক্ষা করছে না এবং নিজেদের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো আশ্বাস দিচ্ছে না।'
জাপানের সরকার জানিয়েছে, তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের তথ্য পেয়েছে এবং চীনকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
টোকিও বলেছে, 'আমরা চীনা সামরিক বাহিনীর এই ক্রমবর্ধমান কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।' তারা আরও জানায়, মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পড়তে পারে বলে গত রবিবার জাপানের কোস্ট গার্ডকে সতর্ক করেছিল চীনা কর্তৃপক্ষ।
জাপানি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে সোমবার কিয়োডো নিউজ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (ইইজেড) বাইরে পড়েছে।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেছেন, এই পরীক্ষা নিয়ে তার দেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। উৎক্ষেপণের 'কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই' নিউজিল্যান্ডকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল।
এক বিবৃতিতে পিটার্স বলেন, 'নিউজিল্যান্ড এটিকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক ঘটনা বলে মনে করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিবেশীদের মতো আমাদেরও কোনো আগ্রহ নেই যে চীন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করুক।'
এর আগে গত ২০২৪ সালে চীন একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল।
ভার্মন্টের মিডলবারি কলেজের গবেষক জেফরি লুইস, যিনি চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণ নিয়ে গবেষণা করেন, তিনি মনে করছেন যে চীনা সামরিক বাহিনী সম্ভবত নতুন প্রজন্মের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) 'জেএল-৩'-এর পরীক্ষা চালিয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
চীন গত বছর বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি সামরিক প্যারেডে জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রদর্শন করেছিল, যা দেশটির ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্রের অন্যতম বড় অংশ।
জেফরি লুইস বলেন, এই সাম্প্রতিক পরীক্ষাটি ইঙ্গিত দেয় যে আগামী বছরগুলোতে চীনের পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ আরও ত্বরান্বিত হবে।
চীনের নতুন পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান তালিকার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'এটি পরীক্ষার একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থারই ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ আসবে।'
লুইস আরও বলেন, 'ঐতিহাসিকভাবে চীন অন্য দেশের তুলনায় তাদের আইসিবিএম বা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা কম চালিয়েছে। আমার মনে হয় এটি এত দিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ ছিল। তবে এখন সেই রাজনীতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং আমার মনে হয় তারা এখন আরও বেশি পরীক্ষা চালানোর পদ্ধতি গ্রহণ করছে। অতীতে তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে রাজি ছিল না, এখন তারা তা দিতেও প্রস্তুত।'
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পরীক্ষাটিতে সম্ভবত একটি 'ডিএফ-৩১' রোড-মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র জড়িত ছিল, যা দক্ষিণ চীনের দ্বীপ প্রদেশ হাইনান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
