চীনের মুনশট আনলো নতুন এআই মডেল, প্রযুক্তিখাতের শেয়ারদরে বড় ধস
যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণাগারগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো—এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের নতুন এআই মডেল উন্মোচন করেছে দেশটির এআই স্টার্টআপ- মুনশট। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তাদের এই নতুন মডেলটি ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিক পিবিসি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে সক্ষম।
গত শুক্রবার মুনশট তাদের নতুন মডেল 'কিমি কে৩' উন্মুক্ত করেছে এবং এর পারফরম্যান্স মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বাধুনিক মডেলগুলোর সঙ্গে তুলনীয় বলেও জানিয়েছে। মডেলটি একটি 'ওপেন ওয়েট' প্ল্যাটফর্ম, যার অর্থ হলো ব্যবহারকারীরা এর প্যারামিটার ডাউনলোড ও কাস্টমাইজ করতে পারবেন। মুনশট জানিয়েছে, সার্বিক ক্ষমতার বিচারে অ্যানথ্রোপিকের 'ক্লড ফেবল ৫' এবং ওপেনএআই-এর 'জিপিটি-৫.৬' ছাড়া অন্যান্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলেছে কে৩।
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় কত দ্রুত কেবল মূল্যমানের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষে এগিয়ে যাচ্ছে, মুনশটের এই নতুন প্ল্যাটফর্মটি সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে। মুনশট তাদের কিমি কে৩ মডেলের ব্যবহারের মূল্য অ্যানথ্রোপিকের 'সনেট'-এর কাছাকাছি নির্ধারণ করেছে। এতে আরও ইঙ্গিত মিলেছে যে, নিজস্ব সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তারা অন্যান্য চীনা মডেলের তুলনায় বাড়তি দাম চাইতেও প্রস্তুত।
মুনশট দাবি করেছে, তাদের মডেলটি কোডিং বা প্রোগ্রামিংয়ের কাজে অপর চীনা প্রতিদ্বন্দ্বী 'জেড.এআই'-এর সর্বাধুনিক মডেলকেও ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত এআই মডেল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে লাভজনক সেবার মধ্যে অন্যতম হলো কোডিং। এই কোডিং সক্ষমতা পুঁজিবাজারে তাদের আইপিও ছাড়ার পরিকল্পনার আগে অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই-এর রাজস্ব বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। কিমি কে৩ যদি একই রকম গুণগত মান বজায় রেখে কম দামে সেবা দিতে পারে, তবে তা এর মার্কিন ও চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যবসার মূল ভিত্তিকেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
পুঁজিবাজারে দরপতন ও তীব্র প্রতিযোগিতা
এই ঘোষণার পরপরই পুঁজিবাজারে মুনশটের চীনা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এক দিনে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যা তাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর সবচেয়ে বড় পতন। পাশাপাশি মিনিম্যাক্স গ্রুপ ইনকর্পোরেটেডের শেয়ারে ১৬ শতাংশ পতন দেখা গেছে। এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার সার্বিক প্রবণতার মধ্যেই এই ধস নেমেছে, যা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দুশ্চিন্তায় আছেন যে, গত কয়েক বছর ধরে এআই-নির্ভর পুঁজিবাজারের উত্থান অতিমাত্রায় পৌঁছেছে কি না।
মার্কিন পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিখাতের কোম্পানিগুলোর প্রধান বেঞ্চমার্ক– নাসডাক-১০০ সূচকও ১.৫ শতাংশ কমে প্রায় এক মাসের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহে দিন শেষ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গ্যাভেকাল ক্যাপিটাল লিমিটেডের পোর্টফোলিও ম্যানেজার লিওনিড মিরনভ 'কে৩' মডেলটিকে "চমৎকার" বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, "আমার ব্যবহারের ভিত্তিতে এটি নিঃসন্দেহে এপর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে সেরা চীনা এআই মডেল।"
কিমি কে৩-এর এই পারফরম্যান্স বাজারকে চমকে দিয়েছে এবং জেড.এআই-এর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মুনশট জানিয়েছে, মডেলটিতে ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার রয়েছে এবং এতে ১ মিলিয়ন টোকেন কনটেক্সট উইন্ডো সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা এর উচ্চ সক্ষমতার প্রমাণ। বেঞ্চমার্কিং প্রতিষ্ঠান আর্টিফিসিয়াল অ্যানালাইসিস কিছু ফ্রন্টিয়ার বেঞ্চমার্কে কিমি কে৩-কে অ্যানথ্রোপিকের অপাস ৪.৮-এর উপরে স্থান দিয়েছে, যা কোনো চীনা ওপেন-ওয়েট মডেলের জন্য প্রথম মাইলফলক।
তবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া-ভিত্তিক বহুজাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ইউওবি কাই হিয়ান-এর নির্বাহী পরিচালক স্টিভেন লিউং বলেন, "যখনই কোনো নতুন এআই মডেল বাজারে আসে, তখনই প্রতিযোগিতার শঙ্কায় বিদ্যমান মডেল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক ধাক্কা খায়।"
কম খরচের এআই ও বৈশ্বিক বাজারের মেরুকরণ
বেইজিং যখন অভ্যন্তরীণ এআই গবেষণায় সরকারি সহায়তা বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই এই অগ্রগতি সামনে এল। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সস্তা বা সুলভ মূল্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে আরও উন্মুক্ত একটি প্রযুক্তিগত কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনা মডেলগুলো এর মধ্যেই ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম খরচে সেবা দিয়ে মার্কিন ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। এআই বেঞ্চমার্কিং সাইট 'আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস'-এর তথ্য অনুযায়ী, চীনের ডিপসিক-এর ভি৪ ফ্ল্যাশ মডেল ব্যবহার করে যেখানে কাজ সম্পন্ন করতে গড়ে খরচ পড়ে মাত্র ২ সেন্ট, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানথ্রোপিকের ক্লড ফেবল ৫-এ একই কাজের জন্য খরচ হয় ২.৭৫ ডলার।
ডিপসিক সম্প্রতি রেকর্ড ৭.৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। কোম্পানিটি ২০২৭ সালে তাদের আইপিও ছাড়ার পরিকল্পনাও করছে। এই বিপুল মূলধন তাদের বৈশ্বিক বাজারে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম দামে এআই সেবা প্রদান ও উদ্ভাবন অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে। মূলত ডিপসিক ও অন্যান্য চীনা মডেলগুলো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের খরচের সামান্য অংশেই সমমানের ফ্রন্টিয়ার পারফরম্যান্স নিশ্চিত করছে।
এদিকে, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এআই খাতের অন্যতম শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠান জেড.এআই বর্তমানে বার্ষিক ১০০ কোটি ডলারের রাজস্ব অর্জনের পথে রয়েছে।
