বছরে ৮ সপ্তাহ বিদেশের সৈকত থেকে কাজ করতে পারবেন জার্মানির সরকারি চাকরিজীবীরা
জার্মানির সরকারি চাকরিজীবীরা এখন দেশের বাইরে ইউরোপের যেকোনো সমুদ্র সৈকতে বসেই বছরের সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ বা দুই মাস পর্যন্ত অফিসের কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। 'মায়োর্কা নিয়ম' নামে পরিচিত এই বিশেষ সুবিধার আওতায় কর্মীরা বিদেশে বসেই নিজ দপ্তরের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। তবে জার্মানির প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড 'বিল্ড'-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য ফাঁসের পর দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জার্মানির ফেডারেল মোটর ট্রান্সপোর্ট অথরিটি এই নিয়মে সবচেয়ে বেশি ছাড় দিচ্ছে। এই বিভাগের কর্মীরা বিদেশে থেকে সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত দূর থেকে বসে কাজ (রিমোট ওয়ার্কিং) করতে পারেন। এর ফলে সরকারি পরিবহন কর্মকর্তারা স্পেন, ইতালি বা গ্রিসের সৈকত থেকে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ সারছেন।
এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে থেকেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে তাদের। এর মানে হলো, কানাডা, থাইল্যান্ড বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সফরের পাশাপাশি অফিসের কাজও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তথ্য নিরাপত্তা অফিসের মতো অন্যান্য বিভাগগুলোতেও 'পারস্পরিক সমঝোতার' ভিত্তিতে ১০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত বিদেশ থেকে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে কিছু বিভাগে এই নিয়ম বেশ কড়া; যেমন মার্কেট কম্পিটিশন রেগুলেশন বিভাগে বিদেশ থেকে কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিল্ড-এর এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর জার্মানির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই 'মায়োর্কা নিয়ম' বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গৃহমুখী কাজের (হোম অফিস) নিয়মগুলো পর্যালোচনা করছে।
সরকারি কর্মীদের এই 'বিদেশে বসে কাজের' (ওয়ার্ক-কেশন) সুযোগের তীব্র সমালোচনা করেছে জার্মানির পুলিশ ইউনিয়ন। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাইকো টেগাটজ বিল্ড-কে বলেন, 'এটি অত্যন্ত অন্যায্য এবং অবিলম্বে এর পরিবর্তন প্রয়োজন।' তিনি মনে করেন, কিছু কর্মকর্তা সৈকতে বসে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন আর অন্যরা পাচ্ছেন না—এটি চরম বৈষম্যমূলক।
তবে সরকারি চাকুরিজীবী ইউনিয়ন এই নিয়মের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, মোবাইল ওয়ার্কিংয়ের এই নিয়মগুলো আরও শিথিল করা উচিত।
করোনা মহামারির সময়ে জার্মানির সরকারি অফিসগুলোতে দূরবর্তী কাজের (রিমোট ওয়ার্কিং) জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে, যার ধারাবাহিকতা এখনও রয়ে গেছে।
তবে জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সতর্ক করে বলেছেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও পেনশন ব্যবস্থা সচল রাখতে জার্মানদের এই শিথিল কর্মসংস্কৃতি বদলাতে হবে। চ্যান্সেলর মের্ৎস ২০৯০-এর দশকের মধ্যে অবসরের বয়স বাড়িয়ে ৭০ বছর করতে চান এবং তিনি চান জার্মানরা আরও কঠোর ও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করুক।
এক সময় ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি এখন জ্বালানির উচ্চ মূল্য, মোটরগাড়ি শিল্পের মন্দা এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দ্রুত বয়স বেড়ে যাওয়ার মতো সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধুঁকছে।
কেবল জার্মানি নয়, চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের বিতর্ক সামনে এসেছে। 'ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্স' (টিপিএ) নামের একটি সংস্থার অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের শত শত সরকারি কর্মকর্তা গ্রিস বা স্পেনের মতো দেশ থেকে বসে অফিসের কাজ করছেন।
যদিও যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিস জানিয়েছে, কেবল পরিবারের কারও অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো বিশেষ কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই বিদেশ থেকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে টিপিএ-এর তদন্ত প্রচার ব্যবস্থাপক ক্যালাম ম্যাকগোল্ডরিক বলেন, 'যুক্তরাজ্যে নাগরিক সেবা যখন থমকে আছে, তখন শত শত সরকারি কর্মকর্তাকে স্পেন, অস্ট্রেলিয়া বা ব্রাজিলের মতো দূরবর্তী দেশ থেকে লগ-ইন করার অনুমতি দেওয়া নমনীয় কাজের সীমানা ছাড়িয়ে করদাতাদের টাকায় বিশ্বভ্রমণের শামিল।'
