রপ্তানি বাড়াতে ও ব্যবসা বহুমুখীকরণে ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে যাচ্ছে শেলটেক গ্রুপ
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন শিল্প, টেক্সটাইল ও আবাসন খাতে ১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে শেলটেক গ্রুপ। এর মাধ্যমে গ্রুপটি রপ্তানি সম্প্রসারণ, কার্যক্রম বহুমুখীকরণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক টার্নওভার ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে ৩৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
নতুন এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও রয়েছে এ শিল্পগোষ্ঠীর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির মন্থর গতির মধ্যেও দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী—যেমন মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের ও বসুন্ধরা গ্রুপ—উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এই সময়ই প্রায় নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করল শেলটেক।
শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, 'দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমরা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি। এসব প্রকল্প নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।'
সবচেয়ে বড় বাজি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে
শেলটেকের সবচেয়ে বড় প্রকল্প স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। এতে একটি স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে নির্মিত কারখানাটিতে ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানিও শুরু হয়েছে। এখানে ভুট্টা, আনারস, আম, মাল্টা, কাঁঠাল, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
২০২৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালু হলে প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৩৬ হাজার বিঘা জমিতে ৪০ হাজার কৃষক চুক্তিভিত্তিক কৃষিকাজের আওতায় আসবেন। এছাড়া সরাসরি প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তানভীর আহমেদ বলেন, 'আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনকে টেকসই করতে ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
উৎপাদন ও টেক্সটাইল খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি
সিলেটে গ্রাইন্ড টেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে শেলটেক। এটি দেশের একমাত্র অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনভয় টেক্সটাইলস ব্লেন্ডেড সুতা উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ২৫ টন বাড়াতে ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) টিবিএসকে বলেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারের চাহিদায় এখন দ্রুত পরিবর্তন আসছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা ক্রমেই কৃত্রিম তন্তু বা ম্যানমেইড ফাইবার, ফিলামেন্ট ইয়ার্ন ও সিন্থেটিক ফ্যাব্রিকের পোশাকের দিকে ঝুঁকছে। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের চাহিদা ও মূল্য সংযোজন তুলনামূলক বেশি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনও এ ধরনের ফিলামেন্ট ইয়ার্ন উৎপাদন খুবই সীমিত। ফলে স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকদের চাহিদার বড় একটি অংশ এখনও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দেশে আরও ফিলামেন্ট ইয়ার্ন উৎপাদনকারী কারখানা গড়ে উঠলে তৈরি পোশাক শিল্পের লিড টাইম (সরবরাহের সময়) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, স্থানীয়ভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত কাঁচামাল সংগ্রহ করা যাবে এবং বিদেশ থেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে বড় চালান আমদানির প্রয়োজন কমবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে ফিলামেন্ট ইয়ার্ন আমদানি করতে একসঙ্গে ১৫-২০টি কনটেইনার অর্ডার দিতে হয়, যা উদ্যোক্তাদের কার্যকর মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও রিয়েল এস্টেট খাত
কার্বন নিঃসরণ ও বিদ্যুৎ খরচ কমাতে ২০২৭ সালের মধ্যে নিজেদের শিল্পকারখানাগুলোতে ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে শেলটেকের।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ৩০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো ও একটি আধুনিক স্পিনিং ইউনিটে অর্থায়ন করা হবে। বাকি বিনিয়োগ আসবে দেশীয় ব্যাংকের ঋণ ও কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে।
রিয়েল এস্টেট খাতে শেলটেক ৫৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে রাজধানীর বনশ্রীর ৫৩ কাঠা নিজস্ব জমিতে একটি ১৭-তলা আধুনিক শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করবে। প্রায় দুই লাখ বর্গফুট জায়গা নিয়ে নির্মিতব্য প্রকল্পটির কাজ চলতি মাসে শুরু হবে এবং ২০৩০ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। শপিং কমপ্লেক্সটি হবে লিড সার্টিফাইড, অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব।
এই বাইরে জলসিঁড়ি আবাসনে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রকল্পে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যেখানে মোট ১৬৮টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণ করা হবে। কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, জলসিঁড়ি প্রকল্পের হস্তান্তর কার্যক্রম ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে শুরু হবে। সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প হস্তান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোম্পানিটি আশা করছে, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য রপ্তানি, বনশ্রী শপিং কমপ্লেক্স, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প ও টেক্সটাইল খাতের বর্ধিত উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
