মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন ফের দৈনিক দেড় কোটি ব্যারেলে পৌঁছাল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির পটভূমিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ১৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন (১ কোটি ৪৬ লাখ) থেকে ১৫ মিলিয়ন (১ কোটি ৫০ লাখ) ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস'-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলের তেল উৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'রিস্টাড এনার্জি' এই নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে। দুই দিন আগে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, দুপক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনায় অভাবনীয় অগ্রগতির কারণে পূর্বের ধারণার চেয়ে অন্তত তিন মাস আগেই তেল উৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে আসতে পারে। অবশ্য এই পূর্বাভাসের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কিছু পাল্টা হামলার খবর সামনে এসেছে। তা সত্ত্বেও বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের মনোভাব এখনো বেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক।
তবে রিস্টাড এনার্জি সতর্ক করে বলেছে, তেল উৎপাদন গত ফেব্রুয়ারি মাসের (যুদ্ধ শুরুর আগের) অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো 'হরমুজ প্রণালী' এবং এই আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখা।
রিস্টাড এনার্জি আশা করছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ বন্ধ থাকা বা স্থগিত তেল উৎপাদনের (শাট-ইন প্রোডাকশন) পরিমাণ দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসবে। চার মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে বন্ধ থাকা তেল উৎপাদনের পরিমাণ দৈনিক আনুমানিক ৯৬ লাখ ব্যারেল, যা থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ এই পতন হবে। এটি বিশ্ববাজারের জন্য একটি বড় স্বস্তি। উল্লেখ্য, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও বন্ধ থাকা তেল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ব্যারেল; অর্থাৎ ইতিমধ্যেই বড় অঙ্কের উৎপাদন সচল হতে শুরু করেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে রিস্টাড এনার্জির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনো) অঞ্চলের গবেষণা পরিচালক আদিত্য সারস্বতকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে:
"মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন আবার সচল হয়েছে এবং এই পুনরুদ্ধারের ধারা পুরো অঞ্চল জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ইরান সবচেয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, কারণ তাদের উৎপাদন বন্ধ থাকার মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত এবং তেল খনিগুলোর মূল অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও ছিল বেশ সীমিত। কুয়েত ইতিমধ্যে তাদের সব ধরনের 'ফোর্স ম্যাজুর' (অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত বাণিজ্যিক স্থগিতাদেশ) নোটিশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে জুলাই মাসের জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিচ্ছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব চলতি মাসে ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে রেকর্ড দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের পথে রয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতির স্পষ্ট উন্নতি হচ্ছে।"
আঞ্চলিক এই পুনরুদ্ধারের জোয়ারে ইরানের নিজস্ব অপরিশোধিত তেল উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। যুদ্ধকালীন ধকল কাটিয়ে বর্তমানে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ব্যারেলে। রিস্টাড এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, আগামী আগস্ট নাগাদ এই উৎপাদন ৩১ লাখ ব্যারেলে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা ৩৩ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই উৎপাদন বৃদ্ধি পুরোপুরি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল বিক্রির ওপর বর্তমানে বলবৎ থাকা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ আগামী আগস্টের পরেও বর্ধিত করে, তবেই কেবল ইরান এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে।
