১০% শেয়ার ছাড়লেই ডাইরেক্ট লিস্টিং: ইউনিলিভার-ইনসেপটার মতো বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে চায় বিএসইসি
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং বড় ও সুশাসিত কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিলিভার বাংলাদেশ ও ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠিত ও বড় মূলধনী বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বিনিময়ে 'ডাইরেক্ট লিস্টিং' বা সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর পল্টনে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত 'সিএমজেএফ টক' অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান এই কর্মপরিকল্পনার কথা জানান।
বর্তমানে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির জন্য সীমাবদ্ধ এবং সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মাসুদ খান বলেন, 'আগামী তিন মাসের মধ্যে এই নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হবে। এর ফলে যোগ্য ও সুশাসিত যেকোনো বেসরকারি কোম্পানি মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করে বাজারে আসতে পারবে।'
আইপিও প্রক্রিয়ার জটিলতা তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, 'বর্তমানে আইপিও প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। এক বস্তা কাগজপত্র জমা দিয়ে আইপিওর অনুমোদনের জন্য উদ্যোক্তাদের দেড়-দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারের পরিবর্তে ব্যাংক ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই জটিলতা দূর করতে আইপিও এবং পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সহজ করা হচ্ছে।'
বাজারের স্বচ্ছতা ফেরাতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন থেকে কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি বা কারসাজি রোধে ডিএসই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে, যার জন্য কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে না। এমনকি সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণের ক্ষমতাও স্টক এক্সচেঞ্জের হাতে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর গুরুত্বারোপ করে চেয়ারম্যান বলেন, 'সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে সব সময় ভালো শেয়ার বাছাই করা সম্ভব হয় না। তাই বিদেশের আদলে আমরা 'ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার' বা আর্থিক পরামর্শক সনদ চালুর পরিকল্পনা করছি। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে যাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আরও সক্রিয় হতে পারে।'
বাজারে কারসাজিকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি সংস্কারের বিষয়ে তিনি জানান, বিগত কমিশন ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আইনি জটিলতায় আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। এই পরিস্থিতি বদলাতে আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন এবং পুঁজিবাজার সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শেয়ার লেনদেনের পর অর্থ ও শেয়ার নিষ্পত্তির সময় বর্তমানের দুই দিন (টি প্লাস টু) থেকে কমিয়ে এক দিনে (টি প্লাস ওয়ান) এ আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বিএসইসি কাজ করছে বলে জানান মাসুদ খান। এছাড়া বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডের পরিবর্তে মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত করা এবং দ্রুত ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতি চলছে।
মাসুদ খান আরও জানান, লভ্যাংশের ওপর করের বোঝা কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং জিরো কুপন বন্ডে কর অব্যাহতি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। ডিএসইর জনবল ছাঁটাই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এটি ডিএসইর নিজস্ব প্রশাসনিক বিষয়, সেখানে কমিশনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিএসইসি থেকে চাকরি হারানো ব্যক্তিদের বিষয়টি চলতি মাসেই সমাধান করা হবে।
বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাসুদ খান বলেন, 'আমি পরিকল্পনায় ৮০ শতাংশ এবং বাস্তবায়নে ২০ শতাংশ সময় দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। বর্তমান সরকারকে পুঁজিবাজারবান্ধব মনে হওয়া এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই আমি এই চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব নিয়েছি। একটি প্রাণবন্ত পুঁজিবাজার ছাড়া দেশের অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না, তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।'
সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।
